তেল চুরির মহোৎসব

দৈনিক ইত্তেফাক হতে নেওয়া || ০৯:১৩ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০১৯ বৃহস্পতিবার

তেল চুরির মহোৎসব

রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তেলবাহী জাহাজ থেকে চুরি হচ্ছে হাজার হাজার লিটার জ্বালানি তেল। প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই নারায়ণগঞ্জে পদ্মা ও মেঘনা অয়েল কোম্পানির ডিপোতে শীতলক্ষ্যা নদীর বুকে নোঙ্গর করা তেলের জাহাজের দিকে ধেয়ে আসে চোরাকারবারিরা। গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাদের তেল চুরি। এই তেল চুরিতে ডিপো কর্মকর্তা ও জাহাজের লোকজনের জড়িত থাকার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, নদীর দুই পাড়ে চোরাকারবারি চক্রগুলোর গড়ে তোলা অনেকগুলো অবৈধ দোকান হয়ে এ চোরাই তেল পৌঁছে যায় পাইকারি ও খুচরা গ্রাহকদের কাছে। ছোট দোকান, অয়েল ফিলিং স্টেশন, গাড়ির গ্যারেজ, বড় শিল্পকারখানাÍ সব জায়গাতেই যায় এ চোরাই তেল। এ তেলের লাভ পায় সবাই। শুধু লোকসান গুনে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসি।

বিপিসি সূত্র জানায়, বিদেশ থেকে আমদানি করা পরিশোধিত এবং অপরিশোধিত তেল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা ও খুলনায় ছোট জাহাজযোগে বিতরণ কোম্পানির ডিপোতে সরবরাহ করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। চট্টগ্রাম থেকে যে পরিমাণ তেল জাহাজে ভরা (লোড) হয়, একই পরিমাণ তেল গন্তব্য ডিপোতে খালাস (আনলোড) করতে হয় জাহাজগুলোকে। কিন্তু ডিপোর এক শ্রেণির কর্মকর্তা এবং জাহাজের লোকজনের যোগসাজশে নিয়মিত তেল চুরি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে পদ্মা ও মেঘনা অয়েল কোম্পানির ডিপোতে। চুরি করা তেলে ওই এলাকায় গড়ে উঠেছে তেলের কালোবাজারি ব্যবসা। সম্প্রতি এই তেল চুরির প্রমাণ পেয়েছে বিপিসির নিজস্ব তদন্ত দলও।

সূত্র জানায়, গত ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম থেকে তেল নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের (এমপিএল) ডিপোতে পৌঁছে এমিউস মেরিন সার্ভিসের মালিকানাধীন জাহাজ এমটি আবু সাদিক। লোডিং পয়েন্টের তেলের পরিমাণ এবং আনলোডিং পয়েন্টের তেলের পরিমাণে ১৫ হাজার লিটারের গড়মিল পান এমপিএলের এক কর্মকর্তা। চুরির কারণে ওই গরমিল হয়েছে জানিয়ে তা খতিয়ে দেখার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) চিঠি দেন ওই কর্মকর্তা। দুদক বিষয়টির সত্যতা প্রমাণের জন্য বিপিসির কাছে পাল্টা চিঠি দেয়। দুদকের চিঠির ভিত্তিতে ঘটনা যাচাইয়ে বিপিসি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত ১৪ মার্চ তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে চুরির সত্যতা পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে তেল চুরি প্রতিরোধে ১১টি সুপারিশ বাস্তবায়নের আহবান জানিয়েছে কমিটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এম টি আবু সাদিক জাহাজের সুপারভাইজার সৈয়দ আবুল আজাদ সিল ভেঙে ওই তেল ডিপোর বাইরে বিক্রি করেন। এর সঙ্গে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ডিপো ইনচার্জ খান নিজামুলও জড়িত ছিলেন। কমিটি ডিপো ইনচার্জকে সাসপেন্ড করার সুপারিশ করেছে। একইসঙ্গে ওই জাহাজের সুপারভাইজারকে আগামী ছয় মাসের জন্য মেঘনা পেট্রোলিয়ামসহ অন্যান্য তেল বিপণন কোম্পানির পরিবহন বহরে যে কোনো ধরনের কাজ করা থেকে বিরত রাখার জন্য জাহাজ মালিককে ব্যবস্থা নিতে বলেছে।

এ প্রসঙ্গে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ডিপো ইনচার্জকে তাত্ক্ষণিক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়েছে। বাকি সব ডিপোকেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জে শীতলক্ষ্যার পাড়ে নামে-বেনামে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান খুঁজে পেয়েছে তদন্ত দল। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অবৈধ ট্রেডার্সগুলোকে উচ্ছেদের জন্য জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে গত সপ্তাহে এ প্রতিবেদক ওই এলাকায় সরেজমিনে দেখতে পান, অবৈধ দোকানপাটগুলো উচ্ছেদ হয়নি। বহাল-তবিয়তেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এমনকি তদন্তে যেসব চোরাকারবারির নাম এসেছে তারা এবং তাদের অনুসারীরা ডিপো এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, উপজেলা নির্বাচনসহ নানা কাজে তারা ব্যস্ত ছিলেন তাই এদিকে নজর দেওয়া হয়নি।

তেল চুরিতে জড়িত প্রভাবশালীরা!
গোদনাইলে বছরের পর বছর ধরে তেলের চোরাকারবার চলছে। কিন্তু কোনো প্রতিকারমূলক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সরেজমিনে চিটাগং রোড থেকে ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ সড়কের বার্মাস্ট্যান্ডে গোদনাইলে রাস্তার দুপাশে নামে-বেনামে অসংখ্য ট্রেডিং সাইনবোর্ড সাটানো তেলের দোকান চোখে পড়েছে। এসব ট্রেডার্সের অধিকাংশেরই পদ্মা কিংবা মেঘনা তেল কোম্পানির সঙ্গে কোনো চুক্তি নেই। এই এলাকা দুই নম্বর গেট নামে পরিচিত। এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এই তেল কালোবাজারির সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচিত-অনির্বাচিত অনেক নেতা ও তাদের কর্মী-অনুসারীরা জড়িত। চাইলেও সবসময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। আবার বিপিসি বা পেট্রোলিয়াম ডিপোগুলোও এ ব্যাপারে তেমন অভিযোগ করে না।

স্থানীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম থেকে তেল নিয়ে গোদনাইল বন্দরে এসে তেল খালাস হওয়ার আগ পর্যন্ত যে কয়দিন জাহাজগুলো নদীতে অপেক্ষমাণ থাকে, প্রতিরাতেই এসব জাহাজ থেকে তেল চুরি হয়। গোদনাইল দুই নম্বর গেটে জাহাজ থেকে সবচেয়ে বেশি তেল চুরি করে থাকেন সেখানকার প্রভাবশালী উকিল ভুঁইয়া এবং লক্ষণের লোকজন। জাহাজ থেকে তেল চুরির পর রাখা হয় নদীর তীরে ডিপোর পাশে টিনের শেডে তৈরি বিভিন্ন ঘরে। এসব ঘরের জানালাগুলো বন্ধ করে রাখা। পরে ওই তেল খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, পদ্মা ও মেঘনার তেলের ডিপোর বিপরীতে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপাশে বন্দর থানার উত্তরলক্ষণ খোলা গ্রামেও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরির সঙ্গে জড়িত। এদের কয়েকজন হলেন আক্তার হোসেন, আলী আহমদ এবং সিরাজ ভান্ডারী। এ ব্যাপারে জানতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকেই পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান বলেন, তেল চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত বলে যে নামগুলো এসেছে তাদের ব্যাপারে আরো তদন্ত করতে এবং তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য খতিয়ে দেখতে দুদককে অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের ডিসিকে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা ও নিয়মিত মনিটরিংয়ের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও