৩মাসে শীতলক্ষ্যা মেঘনা ও ধলেশ্বরীর সাত শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪৯ পিএম, ১০ জুলাই ২০১৯ বুধবার

৩মাসে শীতলক্ষ্যা মেঘনা ও ধলেশ্বরীর সাত শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও ধলেশ্বরী নদীর তীর অবৈধ দখলমুক্ত করতে সাড়াশি অভিযান চালাচ্ছে বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর কর্তৃপক্ষ।

গত ৩ মাস ধরে চলমান অভিযানে তিনটি নদীর যে পরিমাণ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে তা বিগত দিনের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গত ৩ মাসে তিনটি নদীর ৭ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি ৩২ দশমিক ৬ একর জমি উদ্ধার করে নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া অবৈধ স্থাপনা মালিকদের প্রায় ১৬ লাখ টাকা জরিমানা এবং জব্দকৃত বালু পাথর, কাঠ ও অন্যান্য সামগ্রী নিলামে ১ কোটি ৭৩ লাখ ২৪ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।

জানা গেছে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত বলেছেন, মানুষের জীবন-জীবিকা নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানবজাতি টিকে থাকার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নদী। নাব্য সংকট ও বেদখলের হাত থেকে নদী রক্ষা করা না গেলে বাংলাদেশ তথা মানবজাতি সংকটে পড়তে বাধ্য। ‘নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সরকার আইন প্রণয়ন করে নদীকে বেদখলের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। নদী রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে জাগরণ শুরু হয়েছে। এখন সবারই ভাবনা-পরিবেশের জন্য নদী রক্ষা করতে হবে।’ নদী রক্ষায় বিভিন্ন দেশের আদালতের দেওয়া রায়ের উদাহরণ দিয়ে হাইকোর্ট বলেন, ‘আমাদের দেশের সব নদীকে রক্ষা করার সময় এসেছে। যদি তা না করতে পারি তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিপ্রস্ত হবে।’ পাশাপাশি দেশের সব নদ-নদী-খাল-জলাশয় ও সমুদ্র সৈকতের সুরক্ষা এবং তার বহুমুখী উন্নয়নে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বাধ্য থাকবে বলেও রায়ে উল্লেখ করেছেন আদালত।

এদিকে আদালতের ওই রায়ের পরে নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও ধলেশ্বরী নদীর তীর দখলমুক্ত করতে সাড়াশি অভিযান চালিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর। গত ৮ এপ্রিল ও ৯ এপ্রিল বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী মোস্তাফিজুর রহমান ও ম্যাজিষ্ট্রেট দীপ্তিময়ী জামানের নেতৃত্বে ধলেশ্বরী নদীর মীরকাদিম পৌরসভা এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হয়। এসময় বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক গুলজার আলী, উপপরিচালক মো. শহীদুল্লাহ, সহকারী পরিচালক এহতেশামুল পারভেজের সহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এসময় ৩৬টি পাকা স্থাপনা, ৮টি আধাপাকা স্থাপনা ও ৫৬টি কাঁচা স্থাপনা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হয়। এছাড়া জব্দকৃত কাঠ, বালু ও ইট ৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রি এবং অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ১৫ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত রূপগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর উভয় তীরে ৭ দিন ব্যপী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। এসময় কয়েকটি কারখানা, কয়েকটি ডকইয়ার্ড ও একাধিক পাকা বহুতল ভবনসহ ৬৫টি পাকা স্থাপনা, ৩৫টি আধাপাকা স্থাপনা ও ১৭৬টি কাঁচা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।

এছাড়া জব্দকৃত কাঠ, বালু ও ইট ৫ লাখ ৯৬ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রি এবং অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ২০ মে থেকে ২৯ মে পর্যন্ত মেঘনা নদীতে নদীর তীরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ৬ দিন ব্যপী অভিযান পরিচালনা করে বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর কর্তৃপক্ষ। এসময় মেঘনা নদীর তীর ভরাট ও দখল করায় মেঘনা গ্রুপ, আমান গ্রুপ, অরিয়ন গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, ইউনিক গ্রুপ, আল মোস্তফা গ্রুপের পলিমার ইন্ড্রাস্ট্রিজ, খাঁন ব্রাদার্স ডকইয়ার্ড, আব্দুল মোনেম গ্রুপ, কনকর্ড গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি ভরাট ও দখলকৃত অংশ অবমুক্তে অভিযান চালানো হয়। এসময় কয়েকটি পাকা বহুতল ভবন, কয়েকটি ডকইয়ার্ডের বর্ধিত অংশসহ শতাধিক পাকা ও কাচা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এছাড়া জব্দকৃত বালু ও অন্যান্য সামগ্রী নিলামে প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। এসময় মেঘনা নদীর শাখা নদী ড্রেজার দিয়ে ভরাটের চেষ্টাকালে কমপক্ষে ১৭টি ড্রেজার ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

এরপর ১৬ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত ধলেশ্বরী নদীতে ৪ দিন ব্যপী অভিযান পরিচালিত হয়। এসময় কমপক্ষে অর্ধশতাধিক ইটভাটার বাশের পাইলিং ও গাইড ওয়াল, পাকা, কাচা স্থাপনা ও অবৈধ ডকইয়ার্ডের বর্ধিতাংশ উচ্ছেদ করা হয়। অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার টাকা। এরপর ২৩ ও ২৪ জুন কাঁচপুরে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর কর্তৃপক্ষ। এসময় আব্দুল মালেক জুট মিল, একাধিক বহুতল ভবনসহ পাকা ও কাঁচা মোট ৬৫টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। অভিযানকালে ১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরে উপ পরিচালক মোঃ শহীদুল্লাহ জানান, গত এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে তিনটি নদীর ৭ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। তিনটি নদীর ৩২.৬ একর জমি উদ্ধার করে নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া জব্দকৃত বালু পাথর, কাঠ ও অন্যান্য সামগ্রী নিলামে ১ কোটি ৭৩ লাখ ২৪ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। নদী দখলদারদের প্রায় ১৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর সীমানা পিলার পুনঃস্থাপনে ইতিমধ্যে একটি প্রকল্প রাজধানীতে উদ্বোধন করা হয়েছে। নতুন সীমানা পিলার ৪০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট হবে। এছাড়া সরকার ঢাকার চারিপাশের ২১০ কিলোমিটার নদীপথ রক্ষায় ওয়াকওয়ে ও বনায়ন করছে। ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জে ২৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মিত হয়েছে। আরো ১৭ কিলোমিটার ওয়াকওয়ের নির্মাণকাজ শীঘ্রই শুরু হবে।

বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরে সদ্য যোগদানকারী যুগ্ম পরিচালক শেখ মাসুদ কামাল বলেন, সিএস ও আরএস অনুযায়ী  উচ্চ আদালতের নির্দেশে ধারাবাহিক ভাবে উচ্ছেদ অভিযান চলছে। নদীর তীর দখল করে গড়ে উঠা সবরকমের স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও