চামড়ার দামে কারসাজি : মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কেউ নিঃস্ব, পালিয়ে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:১৬ পিএম, ১৮ আগস্ট ২০১৯ রবিবার

চামড়ার দামে কারসাজি : মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কেউ নিঃস্ব, পালিয়ে

কোরবানীর পশুর চামড়ার দাম নিয়ে কারসাজির কারণে ব্যাপক ধস নামার কারণে নি:স্ব হয়ে পড়েছেন অনেক মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী। অনেকে আবার বাকীর অর্থ ফেরত দিতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

জানা গেছে, প্রতি বছরই নারায়ণগঞ্জে কোরবানীর পশুর চামড়া সংগ্রহে মাঠে নামেন একাধিক মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী। অব্যাহত দরপতনের কারণে গত বছরের তুলনায় এবছর কম ছিল মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী। তবে এরপরও অনেক মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী সাহস যুগিয়ে চামড়া সংগ্রহে নেমেছিলেন। কিন্তু কাঁচা চামড়ার নজিরবিহীন দরপতনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা।

একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেন মিশনপাড়া এলাকার বাসিন্দা হযরত আলী খোকন। সংসারে স্বচ্ছলতা বাড়াতে ও কিছু অর্থ উপার্জনের আসায় এবছর বন্ধুদের সঙ্গে চামড়ার ব্যবসায় নেমেছিলেন তিনি। তবে স্বচ্ছলতা বাড়ানোতো দূরের কথা পুজি হারিয়ে এখন পাওনাদারদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন হযরত আলী খোকন। আমলাপাড়া এলাকার বন্ধু মানিকের সঙ্গে গিয়ে শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকার সৈয়দ জাহের শাহের আবেদীয়া বাহাদুর শাহিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদরাসা থেকে ৬০০ টাকা দরে ৬৫৫ পিছ চামড়া সংগ্রহ করেছিল হযরত আলী খোকন। মানিকদের পুঁজি ছিল আড়াইলাখ টাকা। তাদের টার্গেট ছিল ৩০০ থেকে সাড়ে ৩শ’ কুরবানীর চামড়া ক্রয় করার। কিন্তু মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাদেরকে বাকীতে চামড়া দেয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকলে তারা রাজী হয়। পরে ৬৫৫ পিছ চামড়া সংগ্রহ করে যার দর এসেছিল ৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। যার মধ্যে নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধও করেছিল। বকেয়া ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। চামড়া বিক্রি করে সেই অর্থ পরিশোধ করার কথা ছিল। তবে রাতে সেই চামড়া ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করতে গিয়ে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে তাদের। যে কারণে মোটা অংকের লোকসানে পড়েছেন তারা। ঘটনার পর থেকে মুঠোফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান মানিক। অপরদিকে পাওনাদারদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন হযরত আলী খোকন। বকেয়া পাওনা টাকার জন্য তার বাড়িঘরে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন নানা ধরনের হুমকী ধমকী দিচ্ছে বলে মেসেঞ্জারে এ প্রতিবেদককে জানান খোকন।

একই অবস্থা বন্দরের আরিফ হোসেনের। নিজের সঞ্চিত অর্থের পাশাপাশি স্বজনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে এবার নেমেছিলেন কুরবানীর পশুর চামড়ার ব্যবসায়। লোকসানের কারণে এখন স্বজনদের কাছে উল্টো ঋনগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন আরিফ হোসেন।

জানা গেছে, গতবার প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ঢাকায় ৪৫ থেকে ৫০ এবং ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দাম নির্ধারিত হয় ১৮ থেকে ২০ এবং ছাগলের চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকা। এই দরে ৩০ থেকে ৩৫ বর্গফুটের লবণযুক্ত বড় গরুর চামড়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় ট্যানারি-মালিকদের কেনার কথা। কোরবানির পশুর চামড়ার দাম গত বছরের হার অপরিবর্তিত রেখেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রতিটি চামড়া সংরক্ষণে লবণ, গুদাম ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহনসহ মোট ব্যয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা এবং ১০০ টাকা মুনাফা ধরলেও ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকায় মাঠপর্যায়ে কেনাবেচা হওয়ার কথা। অথচ এবছর রাজধানীর হাজারীবাগে ৭০ হাজার থেকে লাখ টাকার ওপরে কেনা গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। পানির দামের চেয়েও কম দামে বিক্রি হচ্ছে ছাগলের চামড়া। ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার ছাগলের চামড়া বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকায়।

স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, ৪০ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম দামে চামড়া কেনাবেচা হয়েছে। ট্যানারি-মালিকদের নির্ধারণ করে দেওয়া দরের এক-তৃতীয়াংশ দামও মিলছে না চামড়ার। অনেক এলাকায় চামড়ার ক্রেতাই পাওয়া যাচ্ছে না। কম দরে চামড়া বিক্রি হওয়ায় দরিদ্র প্রতিবেশী, এতিমখানা, মাদ্রাসা প্রাপ্য অর্থ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

বিভিন্ন এলাকা থেকে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনে এবার লোকসান গুনেছেন। চামড়ার দাম এতটাই কম যে কেউ কেউ বিক্রিই করতে পারেননি। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষরা যারা চামড়া নিয়েছেন তারা এগুলো বিভিন্ন স্থানে মাটিখুড়ে চাপা দিলেও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা তা না করে চামড়াগুলো ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে এনে ফেলে যান। চামড়ায় এই অবস্থায় মানুষ দুর্গন্ধে অতীষ্ঠ হয়ে উঠে। পরে সদর উপজেলা প্রশাসনের তত্বাবধায়নে ফেলে যাওয়া চামড়াগুলো মাটিচাপা দেয়া হয়।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও