‘দুর্ঘটনায় নাসিকের দায় নেই’ টানবাজারে চলছে কেমিক্যাল ব্যবসা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৩১ পিএম, ২ ডিসেম্বর ২০১৯ সোমবার

‘দুর্ঘটনায় নাসিকের দায় নেই’ টানবাজারে চলছে কেমিক্যাল ব্যবসা

নারায়ণগঞ্জের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোর একটি হচ্ছে টানবাজারের ক্যামিকেল বাজার। পাইকারী ও খুচরা মিলিয়ে শতাধিক রং-ক্যামিকেলের দোকান আছে এখানে। তবে সময়ের সাথে পাল্টেছে এখানকার চিত্র। বাজারকে ঘিরে এখন তৈরী হয়েছে সুউচ্চ আবাসিক ভবন। আর এসব ভবনে মানুষের বসবাসের সাথেই চলছে দাহ্য পদার্থের মজুদ ও ক্রয়-বিক্রয়। অথচ এখানে ব্যবসায় করার জন্য সিটি কর্পোরেশন থেকে ব্যবসায়ীরা নিয়েছে রং বিক্রির ট্রেড লাইসেন্স।

২ ডিসেম্বর সোমবার সরেজমিনে দেখা যায় টানবাজারের পদ্ম সিটি প্লাজা, খালেক প্লাজা সহ আশপাশের সবগুলো সুউচ্চ আবাসিক ভবনের নিচতলা থেকে ভবনগুলোর তৃতীয় তলা পর্যন্ত ক্যামিকেলের দোকান ও গোডাউন রয়েছে।

এসব দোকান ও গোডাউনে মজুদ করে রাখা হচ্ছে সফটেনার, এসিড, নাইট্রেট, ডাইস কেমিক্যাল, প্রিন্টিং কেমিক্যাল সং আরো কয়েক ধরনের পদার্থ। যার মধ্যে এসিড, নাইট্রেট, পার-অক্সাইড দাহ্য পদার্থ। লাইসেন্স ছাড়া এসব দাহ্য পদার্থ বিক্রি করার অনুমতি না থাকলেও আইনের তোয়াক্কা না করেই ব্যবসায়ীরা এসব দাহ্য কেমিক্যাল বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে ঝুঁকি নিয়েই এসব ভবনের উপরে বছরের পর বছর বসবাস করছে মানুষ।

গত ২০ ফেব্রুয়ারী রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৭০ জন প্রাণ হারানোর পর নড়েচড়ে বসেছিল প্রশাসন। দেশব্যাপী আবাসিক এলাকা থেকে দাহ্য পদার্থের দোকান ও গোডাউন সরানোর অভিযানের অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের টানবাজারেও শুরু হয়েছিল অভিযান। ব্যবসায়ীদের বেধে দেওয়া হয়েছিল ১০দিনের সময়। সেই ১০দিন পেরিয়ে ১১মাসে পরিণত হলেও এখনো আবাসীক ভবনগুলোতেই দেদারসে চলছে ক্যামিকেল বিক্রি ও মজুদ। এছাড়া অধিকাংশ দোকানেই নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা।

সিটি কর্পোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী, ক্যামিকেল ব্যবসায়ের ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, পরিবেশ অধিদপ্তরের লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপন লাইসেন্স সহ জেলা প্রশাসকের অনুমতি বাধ্যতামূলক। এগুলো ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করে না সিটি কর্পোরেশন।

অথচ টানবাজারের অধিকাংশ দোকানেই নেই এসব সনদপত্র। শুধু মাত্র নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন প্রদত্ত রং বিক্রির ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই এখানে চলছে কেমিক্যালের মত ভয়াবহ দাহ্য পদার্থের মজুদ ও বিক্রি।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্স পরিদর্শক শাহাদাত হোসেন সুমন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, সিটি কর্পোরেশন কেমিক্যাল বিক্রির জন্য সনদপত্র দেয় না। আমাদের কাজ হচ্ছে বৈধ উপায়ে ব্যবসা শুরুর জন্য অনুমতিপত্র বা ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া। কেমিক্যাল বিক্রির অনুমতি জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের থেকে নিতে হয়। তারপরেও দুর্ঘটনার পর আমরা ট্রেড লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করেছিলাম।

তিনি আরো বলেন, বন্ধ করার পর ব্যবসায়ীরা সবাই আমাদের কাছে এসেছিল এবং বলেছে যে যদি ট্রেড লাইসেন্স না দেই তাহলে তাঁরা ব্যবসা করবে কিভাবে? তখন আমরা বাধ্য হয়ে অঙ্গিকারনামার মাধ্যমে তাদেরকে ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করি। সেই অঙ্গিকারনামায় লেখা ছিল, ‘আমার কোনো ধরনের দাহ্য পদার্থ মজুদ বা বিক্রি করি না। তারপরেও যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে সেই দুর্ঘটনার জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন দায়ি থাকবে না।’ এই অঙ্গিকারনামার মাধ্যমে আমরা ব্যবসায়ীদেরকে ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করি।

তবে লাইসেন্স বা ছাড়পত্র নিয়ে ব্যবসায়ীদেরও অভিযোদের শেষ নেই। ব্যবসায়ীদের দাবি এক জায়গা থেকে সব লাইসেন্স সংগ্রহ করা যায় না। আলাদা জায়গা থেকে লাইসেন্স সংগ্রহ করতে প্রচুর সময় লাগে। কখনো কখনো একটা লাইসেন্স সংগ্রহ করতেই বছর পার হয়ে যায়। লাইসেন্সের জন্য চক্কর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়েই অনেকে লাইসন্স করার সিদ্ধান্তই পাল্টে ফেলেন বলে জানান তাঁরা।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, সব জায়গা থেকে লাইসেন্স সংগ্রহ করতেই বছর পার হয়ে যায়। এর পর আবার সব কাগজ নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের কাছে গেলে তাঁরাও সময় নেয়। এতদিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা খুব কঠিন। তাই বাধ্য হয়েই আমরা কেমিক্যালের লাইসেন্স নেই না। শুধু রং বিক্রির ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করি। আর সেই লাইসেন্স দিয়েই কেমিক্যাল বিক্রি করি।

ব্যবসায়ীরা আরো অভিযোগ করে বলেন, কোন কেমিক্যাল দাহ্য আর কোনটা না সেই বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণা দেওয়া হয় না। যে কারণে অজ্ঞতাবশত অনেকে দাহ্য কেমিক্যাল দোকানে মজুদ করে রাখে। যদি সিটি কর্পোরেশন, ফায়ার সার্ভিস বা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আমাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো তাহলে আমরা নিজেরাই এটা সরিয়ে রাখতাম।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও