১০ দিনের আলটিমেটামের ৩৬৫

সোহেল রানা, স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৩:৫৭ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বুধবার

১০ দিনের আলটিমেটামের ৩৬৫

রাজধানীর চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর নারায়ণগঞ্জের কেমিক্যাল বাজার টানবাজারে অভিযান চালিয়েছিল জেলা প্রশাসন। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পরিদর্শনে গিয়ে বিভিন্ন ভবনে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ব্যানার। পাশাপাশি টানবাজারের ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করেছিল সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সংস্থাগুলো ভুলে গেছে সেই দুর্ঘটনার কথা। তাইতো এক বছর পেরিয়ে গেলেও দ্বিতীয়বার আর এই জায়গা পরিদর্শনের প্রয়োজন মনে করেনি একটি সংস্থাও।

গত বছর রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় কেমিক্যালের গোডাউন থেকে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনায় মুহূর্তেই নাই হয়ে গিয়েছিল ৭৮টি তাজা প্রাণ। যাদের কয়েকজনের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। ভয়াবহ এ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছিল সরকার। জেলায় জেলায় অভিযান চালিয়ে জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলার অন্যতম পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী টানবাজার এলাকা থেকে সব ধরসের কেমিক্যালের গোডাউন সরানোর জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উজ্জল হোসেনের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার করা হয়। পরবর্তিতে কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইয়ান মার্চেন্ট এসোসিয়েশনের সে সময়ের সভাপতি এম সোলায়মানের উপস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের টানবাজার থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরানোর জন্য ১০ দিনের সময় দেওয়া হয়।

সেই ১০দিন এখন ১বছরে পূর্ণ হয়েছে। তবে এখনো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আগের মতই। টানবাজারে গড়ে উঠা জনবহুল বহুতল ভবনগুলোতে থাকা কেমিক্যাল গোডাউনগুলোতে মজুদ করা হচ্ছে এসব ভয়াবহ দাহ্য পদার্থ। ফলে দিনের পর দিন দরে এসব ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউনের সাথেই বসবাস করছে কয়েক হাজার মানুষ।

এ প্রসঙ্গে কিছু জানেন না জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, বিষয়টি আমার নলেজে নেই। আপনি আমাকে বলেছেন। আমাদের নিজস্ব একটিভিটিস টিম আছে, ম্যাজিস্ট্রেটরা ঘুরছে দেখছে। আপনি যে তথ্য দিয়েছেন এটি আমাদের অনেক কাজে লাগবে। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। এখন এই আলোকে দফতরে বসে দেখি কি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আমরা একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে পদক্ষেপ নিয়ে নেবো।

চুড়িহাট্টায় দুর্ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন মার্কেট ও বহুতল ভবন পরিদর্শনে যায় নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস। ৭৫টি ভবন পরিদর্শনের পর সবগুলোই অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ পায় ফায়ার সার্ভিস। যার মধ্যে ১৭টি ভবন অতি অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব ঝুকিপূর্ণ ভবনে নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের টিম অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ নোটিশ টাঙিয়ে দেয়। এরপর এক বছর কেটে গেলেও আর খোঁজ নেয়নি ফায়ার সার্ভিস।

এ প্রসঙ্গে মন্ডলপাড়া ফায়ার স্টেশনের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফীন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, আমরা অনেক আগে সার্ভে করেছিলাম। এখন কি অবস্থায় আছে আমরা জানি না। একসপ্তাহ পর সার্ভে করা হবে তখন বলা যাবে।

টানবাজার এলাকাটি পড়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১৫নং ওয়ার্ডের আওতায়। যে কারণে এখানে ব্যবসায়ের জন্য ব্যবসায়ীদের নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু শর্ত অনুযায়ী জেলা অগ্নি ঝুঁকির ছাড়পত্র ছাড়াই ‘দুর্ঘটনায় সিটি কর্পোরেশনের দায় নেই’ এমন লিখিত অঙ্গিকার নামায় ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করছে নারায়ণগগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন।

এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্স পরিদর্শক শাহাদাত হোসেন সুমন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, চকবাজারের চুড়িহাট্টায় দুর্ঘটনার পর আমরা ট্রেড লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করেছিলাম। বন্ধ করার পর ব্যবসায়ীরা সবাই আমাদের কাছে এসেছিল এবং বলেছে যে যদি ট্রেড লাইসেন্স না দেই তাহলে তাঁরা ব্যবসা করবে কিভাবে? তখন আমরা বাধ্য হয়ে অঙ্গিকারনামার মাধ্যমে তাদেরকে ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করি। সেই অঙ্গিকারনামায় লেখা ছিল, ‘আমার কোনো ধরনের দাহ্য পদার্থ মজুদ বা বিক্রি করি না। তারপরেও যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে সেই দুর্ঘটনার জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন দায়ি থাকবে না।’ এই অঙ্গিকারনামার মাধ্যমে আমরা ব্যবসায়ীদেরকে ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করি।

তিনি আরো বলেন, সিটি কর্পোরেশন কেমিক্যাল বিক্রির জন্য সনদপত্র দেয় না। আমাদের কাজ হচ্ছে বৈধ উপায়ে ব্যবসা শুরুর জন্য অনুমতিপত্র বা ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া। কেমিক্যাল বিক্রির অনুমতি জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের থেকে নিতে হয়। তারপরেও দুর্ঘটনার পর আমরা ট্রেড লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করেছিলাম।

এদিকে সরেজমিনে দেখা যায়, টানবাজারের পদ্ম সিটি প্লাজা, খালেক প্লাজা সহ আশপাশের সবগুলো সুউচ্চ আবাসিক ভবনের নিচতলা থেকে তৃতীয়তলা পর্যন্ত ক্যামিকেলের দোকান ও গোডাউন রয়েছে। এসব দোকান ও গোডাউনে মজুদ করে রাখা হচ্ছে সফটেনার, এসিড, নাইট্রেট, ডাইস কেমিক্যাল, প্রিন্টিং কেমিক্যাল সং আরো কয়েক ধরণের পদার্থ। যার মধ্যে এসিড, নাইট্রেট, পার-অক্সাইড দাহ্য পদার্থ। লাইসেন্স ছাড়া এসব দাহ্য পদার্থ বিক্রি করার অনুমতি না থাকলেও আইনের তোয়াক্কা না করেই ব্যবসায়ীরা এসব দাহ্য কেমিক্যাল বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছে।

নগরবাসীর দাবি, নারায়ণগঞ্জের সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি হচ্ছে টানবাজার। এখানে যতদিন কেমিক্যাল গোডাউন থাকবে ততদিন ভয়াবহ অগ্নি ঝুঁকি থাকবেই। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে এই জায়গা থেকে দ্রুত সব ধরণের কেমিক্যালের গোডাউন অপসারণের দাবি করেছেন সচেতন নগরবাসী।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও