আদমজীর পরে বন্ধ আরো ১০ পাটকল

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৫৪ পিএম, ৪ জুলাই ২০২০ শনিবার

আদমজীর পরে বন্ধ আরো ১০ পাটকল

এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিলস আদমজীর শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তা ও আদমজী নগরবাসীর জন্য আজ ৩০ জুন একটি বেদনাবিধুর দিন। ২০০২ সালের ৩০ জুন সরকার চিরতরে আদমজী জুট মিল বন্ধ করে দেয়। এতে ২৪ হাজার ৯১৬ জন শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা চাকুরী হারায়। বন্ধের দিন কান্নার রোল পড়ে গোটা আদমজীতে। কিন্তু মিল বন্ধের দীর্ঘ এ সময়েও সাধারণ অসহায় শ্রমিকদের কান্না থামেনি। প্রতি বছরের ৩০ জুন এলেই নিজের ভাগ্য নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারা।

এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিল বন্ধ হওয়ার কয়েক বছরের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জে বন্ধ হয়ে গেছে আরো অন্তত ১০টি পাটকল। যেগুলোর অনেকগুলোর অবকাঠামোও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার অবকাঠামো থাকলেও বিক্রি করে দেয়া হয়েছে মেশিনারীজ। ওই সকল জুট মিলের লাখো শ্রমিকের কান্না আজো থামেনি। অনেক মিলের অবকাঠামো ব্যবহৃত হচ্ছে গোডাউন হিসেবে। আদমজী জুট মিল বন্ধ হওয়ার পরে এই দেড় যুগে নারায়ণগঞ্জের পাট শিল্পে কর্মহীন হয়েছে কমপক্ষে অর্ধলাখ শ্রমিক।

জানা গেছে, পাকিস্তানের অন্যতম ধনাঢ্য আদমজী পরিবারের তিন ভাই এ ওয়াহেদ আদমজী, জাকারিয়া আদমজী ও গুল মোহাম্মদ আদমজী যৌথভাবে আদমজী জুটমিল প্রতিষ্ঠা করেন। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার তীরে সিদ্ধিরগঞ্জের সুমিলপাড়ায় আদমজী জুটমিল গড়ে ওঠে ২৯৭ একর জমির ওপর। ১৭০০ হেসিয়ান ও ১০০০ সেকিং লুম দিয়ে এই মিলের উৎপাদন শুরু হয় ১৯৫১ সালের ১২ ডিসেম্বর। ওই সময় এই মিলের উৎপাদন থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো। তখন মিলে তাঁতকল বসানো হয় ৩ হাজার ৩০০টি। আদমজী জুট মিলে উৎপাদিত চট, কার্পেটসহ বিভিন্ন প্রকার পাটজাত দব্য দেশের চাহিদা পুরন করে রপ্তানী হতো চীন, ভারত, কানাডা, আমেরিকা, থাইল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এ সময় আদমজী জুটমিল হয় পৃথিবীর অন্যতম জুটমিল এবং এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ কারখানা। আদমজীকে ঘিরে শীতলক্ষ্যার দুইপাড়ে সিদ্ধিরগঞ্জ, কাঁচপুর, বন্দর, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে গড়ে ওঠে বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাস। মিল ছাড়াও এসব এলাকায় কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়। আদমজী জুট মিলকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে গড়ে ওঠে আরো বেশ কিছু জুট মিল। যেকারণে নারায়ণগঞ্জ খ্যাতি লাভ করে প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে।

জানা গেছে, স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আদমজী জুট মিলটি ১৯ বছরে লোকসান দেয় মাত্র ২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ রাষ্ট্রপতির আদেশবলে আদমজী জুটমিল জাতীয়করণ করে জুটমিল কর্পোরেশনের হাতে ন্যস্ত করা হয়। এরপর থেকে অব্যাহতভাবে লোকসানে ছিল আদমজী জুটমিলটি। মিলটিতে ২৪ হাজার ৯১৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক চাকরি করতেন। মিলটি বন্ধ করার সময় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের ৩৫ কোটি ৭৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। আদমজী জুটমিল বন্ধ করা হয় ২০০২ সালের ৩০ জুন। তবে এর অনেক আগেই ১৯৯৪ সালের দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের মনোয়ারা জুট মিলটি বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৫ বছর আগের রিটের কারণে বেসরকারিকরণের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে মনোয়ারা জুট মিলকে। সরকারের বন্ধ কলকারখানা চালুকরণ নীতিমালার আওতায় বন্ধ আদমজী জুটমিলের ২নং ইউনিটের স্থানে ৫০ তাত বিশিষ্ট একটি অত্যাধুনিক ডাইভারসিফাইড প্রোডাক্ট তৈরির মিল স্থাপন এবং মনোয়ারা জুট মিলকে টিস্যু পেপার মিলে রুপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে গত এক যুগে বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত আরো ১০টি জুট মিল। বন্ধ হয়ে পড়া জুট মিলগুলোর মধ্যে রয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত তাজ জুট প্যাকিং কোম্পানী, প্রাইম জুটেক্স, শীতলক্ষ্যার পূর্বতীরে সোনাকান্দার সারোয়ার জুট মিল, নবীগঞ্জে জামাল জুট মিল, উত্তর নদ্যার আমিন ব্রাদার্স জুট এন্ড কোঃ, কাঁচপুর এলাকায় আনোয়ার জুট মিল, এলাইড জুট মিল, রূপগঞ্জে তারাব এলাকায় নিশান জুট মিল, গাউছিয়া জুট মিল, মাসরিকী জুট মিল। চালু থাকা মিলগুলোর মধ্যে রয়েছে কাঁচপুর বাজার এলাকায় নওয়াব আব্দুল মালেক জুট মিল, রূপগঞ্জের তারাবোর টাটকী এলাকায় অবস্থিত নিউ ঢাকা জুট মিল, উত্তরা জুট মিল, কাঞ্চনে নবারুন জুট মিল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশ কয়েক বছর আগে রূপগঞ্জের কাঞ্চনের নবারূন জুট মিলটি বেসরকারীকরণ করা হয়। এরপর থেকে মিলটি চালু রয়েছে। তবে গত কিছুদিন ধরে মিলটিতে নানাবিধ সমস্যা চলছে। এছাড়া বন্দরের মদনপুরে অবস্থিত সুরুজ জুট স্পিনিং নামে পাটের সুতা তৈরীর কারখানা।

এদিকে শুধু পাটকলের জন্যই নয় নারায়ণগঞ্জ থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচাপাটও রফতানী করা হয়ে থাকে। যা থেকে আয় হয় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। নারায়ণগঞ্জের পপুলার জুট এক্সচেঞ্জ ছাড়াও শহরের নিতাইগঞ্জ, খানপুরের কুমুদিনী, গোদনাইল, বন্দর এলাকায় বেশ কিছু পাটের প্রেস হাউস রয়েছে। কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট থেকে কিছু পাটপণ্য রফতানী করা হয়ে থাকে। সারাদেশে অন্তত দেড় শতাধিক কাঁচাপাট রফতানীকারক রয়েছেন। যার মধ্যে প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জেই রয়েছে অন্তত ২৫ জন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে ব্যবসায়ী রয়েছে অন্তত শতাধিক। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে অন্তত ১০ হাজার শ্রমিক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে করোনার কারণে কাঁচাপাট রপ্তানীতে নেমেছে ধ্বস।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও