৭ কার্তিক ১৪২৫, মঙ্গলবার ২৩ অক্টোবর ২০১৮ , ১:৪১ পূর্বাহ্ণ

UMo

পিয়ার সাত্তার স্কুল নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্রে বহিস্কৃত ফারুকুল


স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৪৮ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০১৮ শুক্রবার


পিয়ার সাত্তার স্কুল নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্রে বহিস্কৃত ফারুকুল

বন্দরের কল্যান্দিতে পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি নির্বাচনকে পুঁজি করে আবারো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে সমালোচিত ফারুকুল ইসলাম। ইতোপূর্বে তার বিরুদ্ধে স্কুল পরিচালনায় অনিয়ম দুর্নীতি, নীতিমালা ভঙ্গ সহ নানা বির্তকিত ঘটনা সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। যার মধ্যে ২০১৬ পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছিত করা এবং পরবর্তীতে তাঁকে স্কুল থেকে বহিস্কার করে বির্তকের জন্ম দেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ফারুকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের বহিস্কারাদেশ বাতিল করে পুনর্বহাল এবং স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদ থেকে উল্টো ফারুকুল ইসলামকে বহিস্কার করে শিক্ষা মন্ত্রনালয়।

ঘটনা সূত্রে জানা যায়, স্কুলটির প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনার সময় স্কুলটির পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন ফারুকুল ইসলাম। ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০১৬ সালের ১৩মে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সেই সাথে স্কুলে গ্রীস্মকালীন ছুটি চলছিলো। গ্রীস্মকালীন ছুটি চলাকালীন শুক্রবার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সভা আহবান করে ছিলেন ফারুকুল ইসলাম। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা শুক্রবারে সভা আহবানের বিরোধীতা করে সভাপতি শনিবার করার দাবী রেখে ছিলেন। কিন্তু কমিটির সভাপতির সাথে অন্যান্য সদস্যদের বিরোধ থাকায় বাকি সদস্যদের কথায় কর্নপাত না করে শুক্রবারেই সভার আয়োজন করা হয়। শুক্রবার সকাল ১০টায় সভা আহবান করা হলেও ফারুকুল ইসলাম সকাল ৯টায় প্রধান শিক্ষককে স্কুলে উপস্থিত থাকতে বলেন।

প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত লাঞ্ছিত হওয়ার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাতকারে সভাপতি ফারুকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলে ছিলেন, স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলাম তার বোনকে স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা বানানোর জন্য তাঁকে স্কুল থেকে সড়ানোর পায়তারা চালিয়ে আসছিল। এছাড়াও স্কুলের উন্নয়নের জন্য নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অনুদানের ৫০ লাখ টাকার ব্যয়ে হিসেবের গড়মিল নিয়ে সভাপতি ফারুকুল ইসলাম সহ অন্যান্য সদস্যদের মাঝে বিরোধের কথাও তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে ছিলেন। সেই সাথে এজেন্ডা বহির্ভূত ভাবে পরিচালনা কমিটির সদস্য মতিউর রহমান মেজো তাঁর বিরুদ্ধে মৌখিকভাবে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটুক্তির অভিযোগ তুলেন। যার সূত্রধরে ওই দিন তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে কয়েক দফায় হামলা চালিয়ে একটি কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরবর্তীতে বিকেলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন।

জানা গেছে, এরআগে ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে স্কুলে উপস্থিত হয়ে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। ওই অনুষ্ঠানে এলাকাবাসীর দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে এমপি সেলিম ওসমান স্কুলটির উন্নয়নে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ৫০ লাখ টাকার অনুদান প্রদান করেন। ওই টাকা দিয়ে তিনি স্কুলের সীমানা প্রাচীর এবং স্কুলের অভ্যন্তরে থাকা বিশাল আকৃতির পুকুরটি চারপাশ বাঁধাই করে সুইমিং পুল নির্মাণের পরামর্শ দেন। যাতে করে বন্দর সহ শহরের অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এখানে নিয়মিত সাঁতার প্রতিযোগীতার আয়োজন করা যায়। এমপি সেলিম ওসমানের এমন প্রস্তাবে সভায় উপস্থিত এলাকার হাজারো সাধারণ মানুষ একাত্মা প্রকাশ করেন।

এমপি সেলিম ওসমান প্রদত্ত অনুদানের ৫০ লাখ টাকা দীর্ঘদিন ফেলে রাখার পর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্কুলের সীমানা দেয়াল নির্মাণ করা হয়। তবে ওই সীমানা দেয়াল নির্মাণে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়। যার ফলে দেয়াল নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই নির্মিত দেয়ালের একাংশ ধ্বসে পড়ে যায়। এ ঘটনায় স্কুলের উন্নয়নে এমপি সেলিম ওসমান প্রদত্ত অনুদানের ৫০ লাখ টাকা লুটপাটের অভিযোগ তুলেন এলাকাবাসী। এ ঘটনার সূত্রধরেই পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলামের একের পর এক দুর্নীতির খবর প্রকাশ পেতে শুরু করে। যা নিয়ে কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সাথে ফারুকুল ইসলামের বিরোধ আরো চরম আকার ধারন করে।

এদিকে জলাশয় ভরাট করার ব্যাপারে সরকারী নিষেধাজ্ঞা আইন থাকলেও সরকারী নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে স্কুলের অভ্যন্তরে থাকা পুকুরটি সম্পূর্ন ভরাটের উদ্দেশ্যে বালু ফেলতে শুরু করে ফারুকুল ইসলাম। এক সময় এলাকাবাসীর বাঁধার মুখে অর্ধেক ভরাট করেই ভরাট কাজ শেষ করে দেওয়া হয়।

স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং এলাকাবাসীর কাছ থেকে অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে স্কুল পরিচালনা কমিটির কাছে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অনুদান দেওয়া ৫০ লাখ টাকায় স্কুল উন্নয়ন কাজের ব্যয়ের হিসেব জানতে চান সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। ব্যয়ের হিসেব চাওয়ার পর থেকেই উক্ত স্কুলটির পরিচালনা কমিটির সদস্যদের মাঝে চলমান বিরোধ প্রকাশ্যে আসে এবং নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা বেরিয়ে আসতে শুরু করে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তির দেওয়া বক্তব্য থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, অনুদানের ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের অনিয়মের ব্যাপারেই গ্রীস্মকালীন ছুটি চলাকালে শুক্রবার জরুরি সভার আয়োজন করা হয়েছিল। আর অর্থ লুটপাটের বিষয়টি আড়াল করতেই ওই দিন এজেন্ডা বহির্ভূত বিষয়ে মৌখিক অভিযোগ তুলে একটি ঊচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল। সকাল ১০টা উদ্ভট পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে একে একে বন্দর থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি এম এ রশিদ, জেলা জাতীয় পার্র্টির আহবায়ক আবুল জাহের, বন্দর উপজেলার তৎকালীন নির্বার্হী কর্মকর্তা মৌসুমী হাবিব, সার্কেল এসপি মাসুদ, বন্দর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আ.ক.ম নুরুল আমিন, কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন প্রধান ও এলাকার গন্যমান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শতাধিক সদস্য সেখানে উপস্থিত থাকলেও ঘটনাস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলাম।

ঘটনার দুই দিন পর অর্থাৎ ১৫ মে ফারুকুল ইসলাম বিদেশে অবস্থানরত সময় তার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যে চিঠিতে শ্যামল কান্তি ভক্তকে স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদ থেকে বহিস্কার করা হয়। তবে উক্ত চিঠিটি ইস্যুর তারিখ উল্লেখ করা হয় ১৩ মে ২০১৬ইং। বিষয়টি নিয়ে সে সময় বির্তক ও সমালোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল।

পরবর্তীতে মাউশি কর্তৃক প্রেরিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের বহিস্কারাদেশ অবৈধ ঘোষণা করে তাঁকে প্রধান শিক্ষক পদে পূর্ণবহাল করে ফারুকুল ইসলামকে পরিচালনা কমিটি থেকে বহিস্কার করে কমিটি ভেঙ্গে দেওয়ার পাশাপাশি তৎকালীন জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান মিঞাকে সভাপতি করে এডহক কমিটি গঠন করা হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত এডহক কমিটির নিয়ন্ত্রনে স্কুলটি পরিচালিত হয়ে আসছিল।

এলাকাবাসী ফারুকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাশাপাশি প্রশ্ন তুলেছেন, মাউশি, সহ বিভাগীয় তদন্ত কমিটির তদন্তে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়েছে। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় এখানো প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে গেছে। ১৩মে স্কুলের ভেতরে বিশৃঙ্খলা চলাকালীন সময় ফারুকুল ইসলাম ও তার অনুগামীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তাহলে কে বা কারা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এলাকার হাজার হাজার সাধারণ মুসল্লী সহ নারী-পুরুষদের বিক্ষিপ্ত করে পরিস্থিতি আরো উস্কে দিয়ে ছিলো?

এদিকে কল্যান্দি এলাকাবাসী জানান, ফারুকুল ইসলামকে স্কুল পরিচালনা কমিটি থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে সে স্কুল কমিটির কোন পদে নাই। তারপরে বৃহস্পতিবার সে স্কুলের এসে স্কুলের শিক্ষকদের নিয়ে মিটিং করেছে। অথচ বৃহস্পতিবার এইচএসসি পরীক্ষার জন্য স্কুল বন্ধ ছিল। কমিটির কোন পদে না থেকেও স্কুল বন্ধের দিন স্কুলের ভেতরে শিক্ষকদের নিয়ে মিটিং করে মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করা নিয়ে বিশৃঙ্খলা করে নির্বাচনকে বির্তকিত করার মধ্য দিয়ে সে নতুন করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

এলাকাবাসী প্রশ্ন তুলেছেন, ফারুকুল ইসলাম বন্দরে বসবাস করেন না। তাছাড়া শিক্ষা মন্ত্রনালয় কর্তৃক তাকে এই স্কুল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। মূলত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত উজ্জল করার লক্ষ্যে স্কুলে লেখাপড়ার সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি এবং পরিচালনার জন্য কমিটি করা হয়ে থাকে। স্কুলটি পরিচালনা করার জন্য অত্র এলাকায় অনেক যোগ্য ব্যক্তি রয়েছেন। তাহলে কেন সরকারী ভাবে শিক্ষা-মন্ত্রনালয় কর্তৃক বহিস্কারের শাস্তি পাওয়া বিতর্কিত ব্যক্তি হওয়ার পরেও ফারুকুল ইসলাম আবারো স্কুল পরিচালনা কমিটির নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র কিনেছে। আসলে কি আছে এই স্কুল পরিচালনা কমিটিতে।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

শিক্ষাঙ্গন -এর সর্বশেষ