৯ আশ্বিন ১৪২৫, মঙ্গলবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৯:৫৯ পূর্বাহ্ণ

নানা সমস্যায় জর্জরিত ঐতিহ্যবাহী তোলারাম কলেজ


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:৪৯ পিএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ শুক্রবার


নানা সমস্যায় জর্জরিত ঐতিহ্যবাহী তোলারাম কলেজ

দেশের অন্যতম স্বনামধন্য কলেজ হচ্ছে সরকারি তোলারাম কলেজ। নারায়ণগঞ্জের ছাত্র-ছাত্রীদের স্বপ্ন থাকে এই কলেজে পড়ার। শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এই কলেজে পড়তে আসে। তাই অনেকটা যুদ্ধ করেই ভর্তি হতে হয় এই কলেজে। কিন্তু ছাত্র ছাত্রীদের আশার গুঁড়ে বালি পরে ভর্তি হবার পর। কলেজটির নানান সমস্যা আর অব্যবস্থাপনার জন্য রীতিমত পস্তাতে হয় এই কলেজে ভর্তি হওয়া ছাত্র ছাত্রীদের।

১৯৩৭ সালে মাত্র ৫ জন ছাত্র নিয়ে খগেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে কলেজটিতে ২৫ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কলেজটিতে নেই স্বতন্ত্র কোনো পরীক্ষার হল। নেই পর্যাপ্ত খাবার পানির ব্যবস্থা। ছেলেদের জন্য তিনটি টয়লেট থাকলেও তার দরজাগুলোও ভাঙ্গাচোড়া। কলেজের এক কোনায় টিনের তৈরী একটি ক্যান্টিন থাকলেও তা খুবই ছোট। টিনের তৈরী হওয়ায় ক্যান্টিনের ভিতরে থাকে প্রচন্ড গরম। নেই কোন বিজ্ঞান ক্লাব এবং সাহিত্য চর্চার কেন্দ্র যেখানে বসে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনা কিংবা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে পারে। যে কারণে ফলাফলের পাশাপাশি খেলাধুলা কিংবা অন্যান্য কারিকুলাম একটিভিটিতেও দিন দিন পিছিয়ে পরছে কলেজটি।

বর্তমানে কলেজটি নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পরেছে। ফলে সার্বিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে কলেজটি। এযাবৎ কালের সব থেকে ভয়াবহ ফলাফল বিপর্যয়েও পরে কলেজটি। ২০১৮ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মাত্র ৫৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ পাশ করেছে। যা কলেজটির সব থেকে নিম্নতম ফলাফলের মধ্যে পরে। শিক্ষার্থীদের দাবি এর মূল কারণ হচ্ছে কলেজের অব্যবস্থাপনা।

শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কলেজটিতে প্রতিটি শ্রেনিতে স্বাভাবিকের তুলনায় তিন চার গুন বেশি ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে শ্রেনি কার্যক্রম হয়। গড়ে এক জন শিক্ষক এক ক্লাসে ৪৫-৬০ জন শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারলেও এখানে একজন শিক্ষককে পড়াতে হয় ৩০০-৭০০ জন শিক্ষার্থীকে। যে কারণে প্রতিদিন ক্লাস করেও সুফল পায় না শিক্ষার্থীরা। সামনের বেঞ্চে বসা ছাত্র ছাত্রীরা ছাড়া পেছনের ছাত্র ছাত্রীরা মনযোগ দিয়ে পড়তে পারে না। ফলে শিক্ষার্থীরা কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রথম কয়েক দিন নিয়মিত ক্লাস করলেও পরবর্তিতে আর কলেজমুখি হয় না। তখন ছুটতে থাকে কোচিং সেন্টারগুলোর দিকে।

এ প্রসঙ্গে কলেজের দ্বাদশ শ্রেনির একজন ছাত্র জানায়, আমি ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় দ্বাদশ শ্রেনিতে পড়ি। খুব আশা নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। আর আমাদের ফ্যামিলির অবস্থাও ভালো না। এখানে খরচ কম হয় তাই এখানে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝতে পারি এখানে ক্লাস করে পাশ করতে পারবো না। ভালো রেজাল্টতো অনেক দূরের কথা। বাধ্য হয়ে কলেজে আসা বন্ধ করে কয়েকটা কোচিংয়ে ভর্তি হই। এখন আর কলেজে আসা হয় না।

ব্যবস্থাপনার মান নিয়ে অভিভাবকদেরও অভিযোগের শেষ নেই। তারা জানান, নারায়ণগঞ্জের যত কলেজ আছে এর মধ্যে সব থেকে বেশি বিসিএস ক্যাডার শিক্ষক আছে এই কলেজে। তার পরেও এই কলেজের ফলাফল অন্যান্য বেসরকারি কলেজের থেকেউ খারাপ হয় কেন। এছাড়া এখানে যারা ভর্তি হয় সবাই ভালো রেজাল্ট নিয়েই ভর্তি হয়। তাহলে পরবর্তিতে তাদের রেজাল্ট এত খারাপ হয় কি করে। তাহলে কি এখানে পড়ানো হয় না। নারায়ণগঞ্জের স্বনামধন্য একটি কলেজের রেজাল্ট যদি এমন হয়, তবে এর সুনাম হয়তো আর বেশি দিন থাকবে না।

এদিকে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে উঠে আসে কলেজটির আরো নানান সমস্যার কথা। কলেজটিতে মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নেই কোনো টয়লেট। সর্বমোট ২৫০০০ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র তিনটি টয়লেট। এতে মেয়ে শিক্ষার্থীদের বিড়ম্বনার মুখে পরতে হয়।

কলেজটিতে নেই পর্যাপ্ত খাবার পানির ব্যবস্থা। ২০১৭ সালে কলেজের নবীন বরণ উৎসবে এসে নারাযণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমান শিক্ষার্থীদের অভিযোগে কলেজের ছাত্রলীগ কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদকে খাবার পানির ব্যবস্থা করার জন্য বলেন। কলেজ ক্যাম্পাসের দুই পাশে দুইটি পানির ট্যাংক বসিয়ে সেই ট্যাংকেই দুটি কল বসিয়ে পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোনো ফিল্টার লাগানো হয়নি। পানির ট্যাংকের সাথে দুইটি স্টিলের মগ শিকল দিয়ে লাগিয়ে রাখা হয়েছে। এমন পরিবেশে পানির বিশুদ্ধতা ও পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা খুশি নয়। যে কারণে এই পানি খুব একটা খাওয়া হয় না বলে জানায় ছাত্র-ছাত্রীরা।

কলেজটির ক্যান্টিনের অবস্থাও ভয়াবহ। জাহানারা ইমাম কলা ভবনের পাশ সামান্য ফাঁকা জায়গায় টিনের তৈরী ছোট একটি ক্যান্টিন। বসার জায়গা খুবই সীমিত। রোদের সময় সেখানে প্রচন্ড গরম পরে। ঠিকমত টেনের বেড়া না দেওয়ায় বৃষ্টির সময় পানি ঢুকে।

রয়েছে শ্রেণি কক্ষে পর্যাপ্ত পাখার অভাব। ফলে ক্লাস করার সময় এবং পরীক্ষার সময় চরম ভোগান্তিতে পরতে হয় শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বারবার কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

কলেজটিতে বিজ্ঞানাগার থাকলেও শিক্ষার্থীরা তা ব্যবহার করার সুযোগ কমই পায়। অনেক শিক্ষার্থী শুধু নামেই চিনে এই কলেজে বিজ্ঞানাগার রয়েছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই তা ব্যবহার করেনি।

সব থেকে ভয়াবহ অবস্থা ঘটে কলেজের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার সময়। কলেজের সিটের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েকগুন বেশি। তাই একই সময় যদি অনার্স এবং একাদশ অথবা দ্বাদশ শ্রেনির পরীক্ষা শুর হয় তখন এক বেঞ্চে ৪-৫ জন বসে পরীক্ষা দিতে হয়।

এ প্রসঙ্গে কলেজের ছাত্র জানায়, যন্মাসিক পরীক্ষার সময় রুটিন করা হয়েছিল একাদশ শ্রেনির বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা সকালে হবে আর আমাদের বিকেলে। প্রথম দুই পরীক্ষা ভালোই গেছে। কিন্তু পরে সবার পরীক্ষা এক সাথে নেওয়া হয়। এক বেঞ্চে ৪-৫ জন বসে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। পরীক্ষার হলে প্রচুর হৈ চৈ হয়েছে। সবারই পরীক্ষা খারাপ হয়েছে।

এসময় সে আরো জানায়, দেশের নাম করা কলেজগুলোর অন্যতম আমাদের এই কলেজ। কিন্তু আমাদের কলেজের এই অব্যবস্থাপনা দেখলে নিজেদের খুব খারাপ লাগে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ করা জরুরি। নয়তো সামনে আরো সমস্যায় পরতে হবে। এতে কলেজের ফলাফল আরো খারাপ হতে পারে।

শুধু ভেতরে নয়, কলেজ গেইটের সামনে হকারদের উৎপাত। সৌন্দর্য নষ্ট করে কলেজ গেইটের সামনে বসে বিক্রি করা হচ্ছে।

শুধু ভেতরে নয়, রয়েছে কলেজের বাইরে কলেজ গেইটের সামনে হকারদের উৎপাত। সৌন্দর্য নষ্ট করে কলেজ গেইটের সামনে বসে বিক্রি করা হচ্ছে ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি ও কলেজের দেয়ালে টাঙিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে মেয়েদের গহনা। এতে নষ্ট হচ্ছে কলেজের পরিবেশ।

দীর্ঘদিন ধরেই কলেজটি নানান সমস্যায় ভুগছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের নেই কোনো পদক্ষেপ। সামান্য বৃষ্টি হলে কলেজ প্রাঙ্গনে পানি জমে থাকে। বৃষ্টি হলেই কবি জাহানারা ভবনের নিচ তালায় পানি জমে থাকে। রয়েছে একেক দিন একেক শিক্ষকের ক্লাস নেওয়ার অভিযোগ যে কারণে পড়ালেখা হয় না। এত কিছুর পরেও কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এইভাবে চলতে থাকলে হয়ত খুব দ্রুতই কলেজটি তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলবে।

তোলারাম কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২টি বাস উপহার দেন। অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে এখন বাস দুইটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পরেছে।

সরেজমিনে কলেজে গিয়ে দেখা যায় বাস দুইটির ভয়াবহ অবস্থা। উপর থেকে চকচকে মনে হলেও ভেতরে এর অবস্থা ভয়াবহ। বাসটি দেওয়ার আগে বাসের গায়ে মোটা রং করা হয়েছিল। এখন যেখানে রং উঠে গেছে সেখানে দেখলে বুঝা যায় রং ছাড়া বাসের গায়ে অন্য কিছু নেই। বাসের বডির লোহার আস্তরণ মরিচা ধরে খসে পরতে পরতে এখন শুধু মোটা রংয়ের আস্তরন রয়েছে। সেই বাসে চড়েই ছাত্র ছাত্রীরা যাতায়াত করছে। এমতাবস্থায় ছাত্রদের আন্দোলন কতটা সফল হলো তা সকলের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ।

এসব প্রসঙ্গে কথা বলতে তোলারাম কলেজের অধ্যক্ষ বেলা রানী সিংহের সাথে মুঠোফোনে যোাগাযোগ করা হয়। কিন্তু মোবাইলে কোনো প্রকার কক্তব্য দেওয়া যাবে না বলে জানান তিনি।

সরকারি তোলামার কলেজের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সহকারি অধ্যাপক জীন কৃষ্ণ মোদক বলেন, বাস দুটি দেখভাল করে পরিবহন কমিটি। গত ৭ বছরে বাস দুটি চলাচলের প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, ২০ হাজার ছাত্রছাত্রীর এই বিদ্যাপীঠে আরো দুটি বাস জরুরী দরকার। সাথে সাথে পুরোনো বাস দুটিও মেরামত করে সারিয়ে তোলার তাগিদ দেন তিনি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

শিক্ষাঙ্গন -এর সর্বশেষ