৭ কার্তিক ১৪২৫, মঙ্গলবার ২৩ অক্টোবর ২০১৮ , ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ

UMo

তোলারাম কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়াতে আক্ষেপ, উধাও ছাত্রদল


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৩৩ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ শনিবার


তোলারাম কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়াতে আক্ষেপ, উধাও ছাত্রদল

দেশের অন্যতম বিদ্যাপীঠ ও জেলার প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ সরকারী তোলারাম কলেজ। এখান থেকেই জেলার অনেক রাজনীতির শুরু। শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয় ভালো ফলাফল এবং কলেজের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য। এছাড়াও ছাত্রদের অধিকার রক্ষার জন্য এই কলেজের ছাত্র সংসদের অন্যরকম সুনাম রয়েছে। শুধু ছাত্রদের নয় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও উন্নয়নমূলক অনেক কাজেও রয়েছে এই কলেজের ছাত্রসংসদের অবদান। কিন্তু আন্দোলনের সূতিকাগাড় এ কলেজের ছাত্রসংসদ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

সেই ১৯৩৭ সালে এই কলেজের সুচনা হয়। স্যার খগেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম অধ্যক্ষ। সেই সুচনালগ্ন থেকেই  ছাত্রদের অধিকারের জন্য সোচ্চার ছিল একদন যুবক। যাদের দাবির মুখে কলেজে ছাত্রদের অধিকারের জন্য সেই যুবকদের বসার একটি রুম বরাদ্দ করা হয়। সেই রুমটি পরে ছাত্রসংসদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তখন থেকেই জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও উন্নয়নমূলক অনেক কাজে অংশগ্রহণ শুরু হয় ছাত্রদের।

কলেজটিতে সর্বশেষ কথিত নির্বাচন হয়েছিল ১৬অক্টোবর ২০০৪ সালে। ওই বিতর্কিত ও কথিত নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিল রাজীব-শাহ আলম পরিষদ। অভিযোগ রয়েছে ওই সময়কার এমপি গিয়াসউদ্দিনের প্রভাবের কারণে কথিত সেই নির্বাচনে ছাত্রলীগের কোন অস্তিত্ব রাখা হয়নি। এর পর থেকে আজ পর্যন্ত কলেজটিকে আর কোন নির্বাচিত নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়নি। ফলে ছাত্র ছাত্রীদের দীর্ঘদিনের প্রধান দাবীতে পরিণত হয়েছে এটি।

রাজীব-শাহ আলমের পূর্বে কলেজের সংসদে দায়িত্বে ছিল বাদল-হেলাল পরিষদ। এর পূর্বে ছিল শামীম-বাদল পরিষদ। ১৯৯১ সালে সবশেষ নির্বাচন হয়। সেখানেই বাদল ও হেলাল পরিষদের জয় ঘটে।

অভিযোগ রয়েছে, কলেজটিতে বর্তমানে ছাত্রলীগের একক কর্তৃত্বের কারণে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রদল, ছাত্র ফ্রন্ট সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা কোন কর্মসূচি পালন করতে পারেন না। সবশেষ ২০১৫ সালের ১৮জুন নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজে ছাত্রলীগের ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ সহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কলেজ অধ্যক্ষের কাছে স্মারকলিপি জমা দিতে গেলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রগতিশীল ছাত্র জোটের নেতাকর্মীদের উপর হামলা চালায়। ওই হামলায় নারী কর্মীসহ কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়। যার ফলে ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ছে কলেজ কেন্দ্রিক ছাত্র আন্দোলন।

এছাড়া কলেজে ছাত্রদলের কোন কার্যক্রম নেই। কলেজ ক্যাম্পাসেও ছাত্রদলের কোন কর্মীদের দেখা যাচ্ছেনা। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদলের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায় এখানে। গত ২০১৪ সালের ১ অক্টোবর মহানগর ছাত্রদলের ওই সময়কার আহ্বায়ক ও বর্তমানে মহানগর বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুল ইসলাম সজল সরকারি তোলারাম কলেজ শাখা ছাত্রদলের কমিটি গঠন করেছিলেন। যে কমিটির স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ২৪ ঘণ্টা। ওই কমিটিতে সভাপতি করা হয় কাউসার আহম্মেদ, সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বায়োজিদ আল কাউসার, সিনিয়র সহ-সভাপতি আশিকুর রহমান অনি, সহ-সভাপতি মাসুদ রানা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহজালাল ও সহ সাংগঠনিক রফিকুল ইসলামকে। এরা নামে মাত্র কলেজ রাজনীতি করলেও তারা কোনদিনই কলেজ ক্যাম্পাসে যায়নি। তাদের ছাত্রত্বও নেই অনেকের।

নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক মাসুকুল ইসলাম রাজিব নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, এই সরকার সুস্থ ধারার রাজনীতি হোক তা চায়না, যার ফলে সারাদেশের কোথাও তাদের সংগঠন ব্যতিত অন্য কোন সংগঠনের কোন কার্যক্রম কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। আমাদের শিক্ষার্থীরা, নেতাকর্মীরা কলেজে যায় না কারণ ক্যাম্পাসমুখী হলে আমাদের কর্মীদের তারা হামলা করে প্রশাসনের যোগসাজশে বিভিন্ন মামালায় আসামী বানিয়ে দেয়। মূলত ক্যাম্পাসমুখী রাজনীতি বা সুস্থধারার রাজনীতিতে এই সরকার বিশ্বাসী নয় আর তাই সারাদেশের মত সরকারি তোলারাম কলেজেও কোন ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান নেই।

একই অবস্থান ব্যাখ্যা করে মহানগর ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক রশিদুর রহমান রশু নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, আমি সর্বশেষ ২০১১ সালে ক্যাম্পাসে গিয়ে ছাত্রদলের সহাবস্থান চেয়ে অধ্যক্ষের কাছে আবেদন করেছিলাম। তার পরেও কয়েকবার আমাদের ছেলেদের ক্যাম্পাসে মেরে আহত করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তারা এবং বর্তমান সরকার দেশের কোথাও ছাত্রদল ব্যতীত কোন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সহাবস্থান করুক তা চায়না। তবে আমাদের ছেলেরা ক্যাম্পাসের বাইরে আমাদের দলীয় সকল কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করে।

মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি শাহেদ আহমেদ নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আমরা তো সুস্থ ধারার রাজনীতি করতে চাই। কিন্তু কলেজে সে সুযোগ নাই। তবে আমরা আগামীতে চেষ্টা করবো আমাদের অধিকার আদায় করে নিতে।’

তোলারাম কলেজে ছাত্রলীগের আধিপত্য ও অন্যান্য দলের ছাত্র সংগঠনের কোন কর্মসূচির সুযোগ না থাকার বিষয়ে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ নিউজ নারায়ণগঞ্জতে বলেন, আমাদের প্রথম পরিচয় কলেজের ছাত্র। পরে কে কোন দল করি সেটা। কলেজে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে এতে বিভিন্ন ব্যান্ডের দল ও শিল্পীরা আসবে। এ অনুষ্ঠানের জন্য কাউকে দলের পরিচয় বহন করতে হবে যে কেউ প্রবেশ করতে পারবেন এবং অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পরবে। এ অনুষ্ঠানে সবাইকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, আমরা সব সময় অন্যান্য দলের ছাত্র সংগঠনগুলোকে আহবান জানাই। তারা তাদের সংগঠনের হয়ে সুন্দর কাজ করবে এতে আমাদের কোন সমস্যা না। তবে তারা ছাত্র হতে হবে। ছাত্রের নামে অছাত্র এসে কলেজে বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তা মেনে নিবে না।

কয়েক যুগ ধরে তোলারাম কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পক্ষে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন মূলত তদারকি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ। ঢাকসু নির্বাচন হলে ধারাবাহিক ভাবে সারাদেশের কলেজ পর্যায়ে নির্বাচন হবে। তখন আমাদের কলেজেও নির্বাচন হবে। যেহেতু নির্বাচন হচ্ছেন আপাত্ত আমরা ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমরা সব সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে আছি ও থাকবো।

প্রসঙ্গত বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত ছাত্র সংসদের ৪টি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে। এগুলো হলো প্রথমত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ত্বরান্বিত করা। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একাডেমিক ও একাডেমির বাইরের বিষয়ে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন করা। তৃতীয়ত, নেতৃত্ব বিকাশে এবং সত্যিকারের নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং এর অধিভুক্ত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সুযোগ ত্বরান্বিত করা। এর বাইরে আরও কিছু কার্যাবলি ছাত্রসংসদের  উপর বর্তায়। প্রতি বছর একটি করে জার্নাল, পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও বুলেটিন বের করা। বিতর্ক, বক্তৃতা,  আবৃত্তি, রচনা লিখন ও খেলাধুলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান করা ইত্যাদি। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী যাতে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদ্যাচর্চা করে বের হতে পারে সেসবের যাবতীয় দায়িত্বভার। এভাবে সংসদগুলি ছাত্র-ছাত্রীদের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে অধিকার আদায়ের ভিত্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। ১৯৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় আইন দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয় স্বশাসনের সুবিধা ভোগ করলেও আইনের তেমন বালাই নেই বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্র সংসদের কার্যক্রম  দীর্ঘদিন না থাকলেও ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে আসছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রতি বছরে ভর্তির সময় এ চাঁদা নেয়া হয়।

এদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, কলেজে অনেক সময় কলেজে নির্বাচিত সংসদ না থাকলে অনেক সমস্যা হয়। শিক্ষকরা অনেক সময় অনেক খারাপ ব্যবহার করে। ক্লাসে অনেক সময় ছাত্র ছাত্রীদের অনেক ঝামেলা পোহাতে হয় এই শিক্ষকদের জন্য। অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সাহায্য করার পরিবর্তে তাদেরকে নিজেদের কোচিং সেন্টারের ঠিকানা দিয়ে দেয়। সেখানে না পড়লে পরীক্ষায় সঠিকভাবে নাম্বারও দেয়না বলে অভিযোগ করে শিক্ষার্থীরা। এসব ব্যাপারে অনেকবার অভিযোগ দিয়েও কোন কাজ হয়নি বলে জানান তারা।

তোলারাম কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদংসদ নির্বাচন না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন ধরে এই নির্বাচন অনুষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সম্প্রতি দেশের প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০১০ সালে ১০০টি স্কুলে এ ধরনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে,

শিশুকাল থেকে শিক্ষার্থীদের গণতন্ত্রচর্চার অভ্যাস গড়ে তুলতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে গণতন্ত্রচর্চার উদ্যোগ নেওয়া হবে, অথচ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে এই অনুশীলন বন্ধ থাকবে, এটা কেমন কথা?

কলেজের শিক্ষক পরিষদ স¤পাদক জীবন কৃষ্ণ মোদক সময়ের নারায়ণগঞ্জকে বলেন, এখানে আমাদের করার কিছু নেই। দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়েই নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়াও আমাদের এখানে ছাত্র ছাত্রীদেরও তেমন কোন অভিযোগ নেই।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

শিক্ষাঙ্গন -এর সর্বশেষ