স্যালুট সেলিম ওসমান

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৪:৫২ পিএম, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সোমবার

স্যালুট সেলিম ওসমান

নিজ অর্থায়নে নারায়ণগঞ্জের সদর ও বন্দর এলাকার অনেকগুলো স্কুল নির্মাণ থেকে শুরু করে এর ব্যয় যখন বহন করে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছিলেন ব্যবসায়ী থেকে জনপ্রতিনিধি হওয়া সেলিম ওসমান তখনই তাঁর নির্বাচনী আসনে একটি স্কুল বন্ধের খবর সেই পজেটিভ বিষয়কে চাপা দিতে শুরু করছিল। ব্যাপক সমালোচনা যখন তুঙ্গে তখন বিষয়টি নজরে এনে সেই পজেটিভ বিষয়কে পজেটিভ রেখেই নেগেটিভকে উল্টো চাপা দিলেন সেলিম ওসমান। স্ব উদ্যোগী হয়ে ওই বন্ধ হওয়া স্কুলটিকে ফের চালুর নির্দেশ দিলেন। সেই সঙ্গে মাত্র মাসে দেড় লাখ টাকা খরচের কারণেও কিছুটা ঠোটের কোনে হাসি দিয়ে দায়িত্ব নেওয়ারও পরোক্ষ ঘোষণা আসলো এ এমপির কাছ থেকে। আর সে কারণেই এখন সেলিম ওসমানের প্রশংসায় ভাসছে স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা থেকে শুরু করে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলো। তাদের দৃষ্টিতে শুধু কৃতজ্ঞতা জানানো না বরং একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবারো স্যালুট পাওয়ার যোগ্য সেলিম ওসমান।

৩৩ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ড্রেজার জুনিয়র হাইস্কুলটি অবশেষে খুলে দেওয়া হয়েছে। সোমবার (৪ ফেব্রুয়ারী) সকালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড্রেজার পরিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শামসুদ্দিন আহমদ স্কুলটির শিক্ষক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে তালা খুলে দেন। স্কুলটি পুনরায় চালু হওয়ায় শিক্ষক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বইছে উচ্ছ্বাসের হাওয়া। স্কুলটি চালু করায় এবং এর দায়িত্ব নেয়ায় এমপি সেলিম ওসমানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তারা সকলেই। 

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, এমপি সেলিম ওসমানের নির্দেশে নারায়ণগঞ্জ ড্রেজার জুনিয়র হাইস্কুলটি পুনরায় চালু হওয়ার খবর শুনে সোমবার সকাল থেকে স্কুল প্রাঙ্গনে হাজির হতে থাকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। তাদের ছুটোছুটিতে স্কুল প্রাঙ্গনে দীর্ঘ এক মাস পরে আবারো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।

সোমবার সকাল ১১টার দিকে স্কুলটিতে আসেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড্রেজার পরিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শামসুদ্দিন আহমদসহ ড্রেজার পরিদপ্তরের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। স্কুলটির শিক্ষক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে তালা খুলে দেন। এসময় স্কুলটির দ্বিতীয় তলার সিড়িতে লাগানো তালা ভাঙ্গা হয়। এছাড়া সকল শ্রেণীকক্ষের তালা খুলে দেয়া হয়। পরে স্কুলটিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনা করেন শিক্ষক শিক্ষার্থীরা। পরে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মিষ্টিমুখ করান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শামসুদ্দিন আহমদ ও স্কুলটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পারভীন আক্তার মালা। এসময় ড্রেজার পরিদপ্তরের সিবিএ’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল আলম সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। 

এসময় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শামসুদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা স্কুলটি পুণরায় চালু করার জন্য বলেছেন। স্থানীয় এমপি সেলিম ওসমান মহোদয়ের সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। আমি তাকে আশ্বস্ত করেছি সোমবার থেকে স্কুলটি পুনরায় চালু হবে। এছাড়া কয়েকজন আগে জেলা শিক্ষা অফিসার সরেজমিনে এসেছিলেন। তাকে আমি স্কুলটির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়েছি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মাসুম বিল্লাহ’র সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। আমি এ বিষয়ে শীঘ্রই তাদের সঙ্গে বসে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করবো।

তিনি আরো বলেন, স্কুলটি বন্ধ হোক সেটা আমি কখনোই চাইনি। কিন্তু নীড বেইসড সেটআপে ড্রেজার পরিদপ্তর অর্ন্তভুক্ত না হওয়ার কারণে আমার কিছুই করণীয় ছিলনা। যা কিছুই করা হয়েছে সেটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়েছে। আমি শুধু নির্দেশ পালন করেছি। এখানে আমার কিছু করণীয় ছিলনা। আমি চাই স্কুলটি যাতে সঠিকভাবে চলে। এক্ষেত্রে আমি পূর্ণ সহযোগিতা করবো।

স্কুলটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পারভীন আক্তার মালা নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, আজকে এমপি সেলিম ওসমান মহোদয়ের নির্দেশে স্কুলটি পুণরায় চালু হওয়ায় আমরা অন্তরের অন্তস্থল থেকে তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এমপি সেলিম ওসমান মহোদয়ের নির্দেশে স্কুলটি খুলে দেয়া ড্রেজার পরিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মহোদয়কেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। পাশাপাশি স্কুলটি চালু হতে যারা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদেরকেও ধন্যবাদ জানাই। মিডিয়ার বন্ধুদেরও ধন্যবাদ জানাচ্ছি তাদের লেখনির মাধ্যমে স্কুলটির অসহায় শিক্ষার্থীদের চিত্র তুলে ধরার জন্য। স্কুলটি যাতে আবারো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে এজন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।

প্রথম দিনেই বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে গিয়ে হাজির হন। তাদের মধ্যে ছিল এক উচ্ছ্বাসের ঘনঘটা। সেই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষিকারাও যেন প্রাণ ফিরে পায়। স্কুলের তালা ভাঙ্গার পর শিক্ষার্থীদের নিয়ে উড়ানো হয় বাংলাদেশের পতাকা। গাওয়া হয় জাতীয় সঙ্গীত।

এর আগে সেলিম ওসমান ঘোষণা দেন ড্রেজার কর্তৃপক্ষ যদি খরচ চালাতে না চায় তাহলে নারায়ণগঞ্জের মানুষই সেই সাড়ে ৩শ শিশুর লেখাপড়ার জন্য দায়িত্ব নিবেন। নারায়ণগঞ্জের মানুষই প্রতিমাসে ১লাখ ৩০ হাজার টাকার ব্যবস্থা করবে। 

উল্লেখ্য, ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে বর্তমান সরকার যেখানে বদ্ধ পরিকর। দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন স্কুল নির্মাণ ও শিক্ষক বাড়ানোর পাশাপাশি যেখানে সরকার সারাদেশে যেখানে বিনামূল্যে বই দিচ্ছে সেখানে মাসে মাত্র দেড় লাখ টাকা খরচ কমাতে ড্রেজার জুনিয়ার হাইস্কুলটি বন্ধ করে দেয় নারায়ণগঞ্জ শহরের কিল্লারপুল এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন ড্রেজার পরিদপ্তর। সম্প্রতি স্কুলটির সকল শ্রেণীকক্ষে তালাও লাগানো হয়। অথচ এই ড্রেজার পরিদপ্তরে প্রতি মাসে কোটি টাকার অনিয়ম দুর্নীতির পাশাপাশি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খামখেয়ালীপনায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অত্র ড্রেজার পরিদপ্তরে অনিয়মের মাধ্যমে অঢেল অর্থের মালিকও বনেছেন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের কিল্লারপুলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন ড্রেজার পরিদপ্তরের আওতাধীন ড্রেজার জুনিয়র হাইস্কুলটি সেই ১৯৮৬ সালে স্থাপিত হয়। স্কুলটির ইআইআইএন নম্বর হচ্ছে ১১২৪৪৩। স্কুলটি প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং জেলা শিক্ষা অফিসের তালিকাভুক্ত ছিল। স্কুলটিতে প্রথম শ্রেনী থেকে ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত প্রায় ৩শ’ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করতো। যার মধ্যে প্রথম শ্রেনী থেকে ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত বিনা বেতনে এবং ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে মাসে ৬০ টাকা, ৭ম শ্রেনীতে মাসে ৭০ টাকা এবং ৮ম শ্রেনীতে মাসে ৮০ টাকা বেতনে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করতে পারতো। সর্বশেষ স্কুলটিতে প্রায় ৩শ’ শিক্ষার্থী ছিল। কিল্লারপুলে অবস্থিত ড্রেজার পরিদপ্তর আগে নিজস্ব আয়ে পরিচালিত হতো। ড্রেজার জুনিয়র স্কুলটিতে একজন প্রধান শিক্ষক, ১০ জন শিক্ষক ও একজন পিয়ন (বুয়া) কর্মরত ছিল। সর্বশেষ প্রধান শিক্ষক পদে প্রেষণে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল নিজামউদ্দিনকে যিনি ড্রেজার পরিদপ্তরে লস্কর পদে কর্মরত। ১০ জন শিক্ষক ও পিয়ন সকলেই ড্রেজার পরিদপ্তরে ঠিকাদারের অধিভুক্ত শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিল। শিক্ষকরা কোন মাসে ১২ হাজার আবার কোন মাসে ১৩ হাজার টাকা বেতন পেত। তাদের দৈনিক হাজিরা ছিল ৫২০ টাকা। শিক্ষকরা বেতন পেত ড্রেজার পরিদপ্তর থেকে। প্রতি মাসে শিক্ষকদের বেতন হতো সবমিলিয়ে দেড় লাখের মতো।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নীড বেইসড সেট আপ গেজে আকারে প্রকাশিত হয়। ওই নীড বেইসড সেটআপে ড্রেজার পরিদপ্তর অর্ন্তভুক্ত হওয়ায় বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতাদিসহ যাবতীয় ব্যয় বোর্ডের রাজস্ব খাত থেকে নির্বাহ করা হচ্ছে। কিন্তু কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারসাজিতে ড্রেজার পরিদপ্তরের স্কুলটি ও তার শিক্ষকদের নীড বেইসড সেটআপে অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি। ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড্রেজার পরিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এক চিঠিতে নীড বেইসড সেটআপে অর্ন্তভুক্ত না থাকায় স্কুল পরিচালনা সম্ভব নয় বলে প্রধান শিক্ষককে নতুন বছরে কোন শিক্ষার্থীকে ভর্তি না করার নির্দেশনা দেন। পরে গত বছরের ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্কুলটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। নতুন বছরের প্রথম দিনে বিতরণের জন্য জেলা শিক্ষা অফিস ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে নতুন বইও এসেছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষের আদেশে ওই সকল বই ফেরত দিতে হয়েছে।

স্কুলটি বন্ধ করে দেয়ার পরে শিক্ষার্থীরা মাঝেমধ্যে স্কুলে আসলেও শিক্ষকরা প্রতিদিনই স্কুলটিতে আসতেন। তারা টিচার্স রুমে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বসে থাকতেন। স্কুলটিতে প্রতিদিনই জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হতো। তবে বৃহস্পতিবার ৩১ জানুয়ারী থেকে স্কুলটিতে আর জাতীয় পতাকা উত্তোলন না করার জন্য নির্দেশনা দেয় ড্রেজার পরিদপ্তরের ঊর্ধ্বতনরা। এছাড়া ৩১ জানুয়ারী স্কুলটির সকল শ্রেণীকক্ষে নতুন তালা লাগানো হয়।


বিভাগ : শিক্ষাঙ্গন


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও

আরো খবর