স্কুলের দপ্তরীকে বলাৎকারের সিসিটিভি ফুটেজে যা আছে (ভিডিও)

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৫৪ পিএম, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ মঙ্গলবার

স্কুলের দপ্তরীকে বলাৎকারের সিসিটিভি ফুটেজে যা আছে (ভিডিও)

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দাপা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে প্রধান শিক্ষককে আটকে রেখে দুই দফায় নির্যাতন ও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পদত্যাগপত্র ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয়ার অভিযোগ ওঠার পরে ওই স্কুলেরই দপ্তরীকে জোরপূর্বক বলাৎকারের পাল্টা অভিযোগ উঠেছে নির্যাতনের শিকার প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পুলিশ পাল্টাপাল্টি অভিযোগ গ্রহণ করে নির্যাতিত প্রধান শিক্ষক ও দপ্তরিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এছাড়া স্কুলটির প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে একটি সিসি টিভি ক্যামেরা ও ভিডিও ফুটেজ জব্দ করেছে।

নির্যাতনের শিকার প্রধান শিক্ষক মো. আহসান হাবিব জানান, স্কুলটিতে প্রধান শিক্ষক হতে চান জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সানাউল্লাহর ছোট ভাই কৃষি ব্যাংক মতিঝিল শাখায় কর্মরত সিরাজুল ইসলাম। সোমবার ৪ ফেব্রুয়ারী বিকেল ৩টার দিকে সিরাজুল ইসলাম তাকে (প্রধান শিক্ষককে) মুঠোফোনে কল করে তার মতিঝিলস্থ কৃষি ব্যাংকে তার কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে যায়। এসময় সিরাজুল ইসলাম তাকে সভাপতি বানানোর জন্য চাপ দেয়। সিরাজুল ইসলাম তাকে বলে এমপি শামীম ওসমান ৯ ফেব্রুয়ারী ওমরা শেষে দেশে ফিরবেন। এর আগেই তাকে সভাপতি বানাতে হবে। কিন্তু তিনি এতে রাজী না হওয়ায় সেখানেই তাকে মারধর করে। এসময় তাকে নানা ধরনের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখায়। পরে তাকে গাড়িতে করে ফতুল্লায় স্কুলটিরই দপ্তরী ফখরুলের বাড়িতে নিয়ে আসে। সেখানে টিভির ভলিউম বাড়িয়ে দিয়ে সিরাজুল ইসলাম, স্কুলটির শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম, দপ্তরী ফখরুলের ছেলে আব্বাস উদ্দিন, কালাম তাকে বেধড়ক মারধর করে।

এসময় তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাকে একাধিক কাগজে স্বাক্ষর নেয় যার মধ্যে সাদা কাগজও ছিল। তিনি প্রাণভয়ে ওই সকল কাগজে সাক্ষর দিতে বাধ্য হন। পরে তাকে রাতেই ফতুল্লা থেকে তার গেন্ডারিয়াস্থ বাসায় চলে যেতে হুমকি দেয়। অন্যথায় তাকে হত্যা করার পাশাপাশি তাকে বিতর্কিত করা হবে বলেও হুমকি দেয় সিরাজুল ইসলাম সহ অন্যরা। পরে তাদের থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি স্কুলটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি গোলাম মোস্তফা, সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহআলম, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আবুল কাশেমের শরনাপন্ন হলে তারা তাকে উদ্ধার করে ফতুল্লা মডেল থানায় নিয়ে আসে।

তিনি আরো জানান, গত ২ ফেব্রুয়ারীও দপ্তরী ফখরুলের বাড়িতে ডেকে নিয়ে সিরাজুল ইসলাম তার গায়ে হাত তুলেছিল। কিন্তু তিনি লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার রাতেই একই স্কুলের দপ্তরী ফখরুল ইসলাম জোরপূর্বক সমকামিতা ও বলাৎকারের লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ওই প্রধান শিক্ষক আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে।

তার পরিবারের স্বজনরা জানান, প্রধান শিক্ষক আহসান হাবীব দপ্তরী ফখরুল ইসলামকে বেশ কিছুদিন যাবত জোরপূর্বক সমকামিতায় বাধ্য করছেন। এই ক্ষোভে তিনি গত বৃহস্পতিবার রাতে বাসায় কান্নাকাটি করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে স্ত্রী সন্তানকে ঘটনার বর্ণনা দেন। ফখরুলের পরিবার এ ঘটনার ন্যায়বিচার দাবী করেন।

তবে বলাৎকারের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক আহসান হাবীব জানান, তাকে নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা দিতে ফখরুলকে দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবী করেন।

অভিযোগ তদন্তে ঘটনাস্থলে যাওয়া ফতুল্লা মডেল থানার পরিদর্শক (আইসিপি) গোলাম মোস্তফা, পরিদর্শক (অপারেশন) মজিবুর রহমান জানান, দাপা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহসান হাবিব ও একই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেনীর অফিস সহায়ক পৃথক দুটি অভিযোগ করেছে। প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদ দখল করে স্থানীয় সিরাজ মিয়া তাকে ঢাকায় নিয়ে মারধর করে। পরে ফতুল্লায় নিয়ে এসেও আরেক দফায় তাকে মারধর করে একাধিক সাদা কাগজে সাক্ষর রাখেন। এরপর তাদের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে থানায় এসে সিরাজুল সহ ৫জনের বিরুদ্ধে ৫ লাখ টাকা চাঁদাদাবীর অভিযোগ করেছে। অপরদিকে প্রধান শিক্ষক আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে চতুর্থ শ্রেনীর অফিস সহায়ক বলাৎকারের অভিযোগ করেছে। দুজনের অভিযোগ তাৎক্ষনিক তদন্তে গিয়ে অফিস সহায়কের অভিযোগ প্রাথমিক ভাবে সত্যতা পেয়েছি। এতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অফিস কক্ষ থেকে সিসি টিভি ক্যামেরা ভিডিও জব্দ করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারের তদন্ত চলছে।

দাপা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোস্তফা কামাল বলেন, স্থানীয় সিরাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার জন্য র্দীঘদিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এতে স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে সিরাজুল নানা ভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা করে। তিনি আরো বলেন, সোমবার দুপুরে প্রধান শিক্ষক আহসান হাবিবকে অপহরণ করে ঢাকায় নিয়ে মারধর করে সিরাজুল। এরপর দ্বিতীয় দফায় ফতুল্লায় এনে প্রধান শিক্ষক আহসান হাবিবকে মারধর করে বিভিন্ন কাগজে সাক্ষ্যর রাখেন। এবিষয়ে থানায় অভিযোগ করতে আসলে সিরাজুলের পক্ষে চতুর্থ শ্রেনীর অফিস সহায়ক মিথ্যা অভিযোগ করেছে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।

অভিযুক্ত সিরাজুল ইসলাম জানান, তার দাদা স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তার বড় ভাই আওয়ামী লীগ নেতা সানাউল্লাহও ওই স্কুলের সঙ্গে জড়িত ছিল। তিনি ২০১৮ সালে স্কুল পরিচালনা কমিটির নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু কিছু ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের কারণে কমিটি আর হয়নি। পরে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক স্কুলটির উন্নয়নের কথা বলে শিল্পপতি মোস্তফা কামালকে দিয়ে একটি এডহক কমিটি গঠন করেন। ওই এডহক কমিটি ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক বছরেও নির্বাচন দেন নাই। তারা কি উন্নয়ন করেছেন সেটা আপনারা সরেজমিনে স্কুলে গেলেই দেখতে পাবেন। আমি ২০১৮ সালে নির্বাচনের পরে আর স্কুলে যাইনি বললেই চলে। এছাড়া আমি চাকুরী করে স্কুলে সময়ও দিতে পারিনা। বেশ কিছুদিন পূর্বে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক আহসান হাবিব কর্তৃক দপ্তরি ফখরুলকে বলাৎকার করেছেন বলে অভিযোগ শুনি। তার বিরুদ্ধে একটি সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজও রয়েছে। তখন ফখরুলের ছেলে উত্তেজিত হয়ে ওই প্রধান শিক্ষককে মারধরও করে। কিন্তু আমরা চাইনি স্কুলটির বদনাম হোক। এছাড়া প্রধান শিক্ষক আহসান হাবিবও কোরআন শরীফ ছুয়ে এ ধরনের অপরাধ আর করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল। যে কারণে আমরা চেপে গিয়েছিলাম। কিন্তু সোমবার বিকেলে প্রধান শিক্ষক কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলটির দপ্তরী ফখরুল ও তার ছেলে আব্বাসকে হুমকী দেন। এছাড়া রাতে আমাকে প্রধান আসামী করে থানায় অভিযোগও দিয়েছেন। অথচ আমি এর কিছুই জানিনা। আমিও চাই ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত হোক। আর একজন বলাৎকারী প্রধান শিক্ষক ওই স্কুলে থাকলে আমরা সন্তানরা সেখানে নিরাপদ নয়।

ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ মোহাম্মদ মঞ্জুর কাদের জানান, দুইজনের পক্ষ থেকে অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষককে মারধরের বিষয়টিসহ দপ্তরিকে বলাৎকারের ঘটনার ভিডিত ফুটেজ সংগ্রহ করে দুইটি ঘটনার তদন্ত চলছে। দুইজনকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তের পর অইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।


বিভাগ : শিক্ষাঙ্গন


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও

আরো খবর