শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে টর্চার সেলে নারায়ণগঞ্জের অভিভাবকেরা শংকিত

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৪৫ পিএম, ১১ অক্টোবর ২০১৯ শুক্রবার

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে টর্চার সেলে নারায়ণগঞ্জের অভিভাবকেরা শংকিত

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের মারধর ও টর্চার করার ঘটনা এই প্রথম নয়। পত্রিকার পাতা উল্টালেই এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে টর্চার সেলে শিক্ষার্থীদের আহত কিংবা নিহতের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা নেতাকর্মী ও তাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা নেতাকর্মীরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে যাকে ইচ্ছে তাকেই টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করছে।

রাজধানী সহ এর লগোয়া নারায়ণগঞ্জের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর টর্চার সেলে নির্যাতনে ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরারকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে নির্যাতন করে হত্যা করে। এতে করে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। যেকারণে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতেও শঙ্কাবোধ করছে।

এখানে উল্লেখ যে, ৬ অক্টোবর বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যাকান্ডের ঘটনার পরের দিন ৭ অক্টোবর বিক্ষোভের মুখে হলের সিসি টিভি ফুটেজ দেখানো হলে সেখানে আবরারকে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা ধরে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশ পায়। এতে ক্যাম্পাস আরো উত্তাল হয়ে ওঠে। আবরারের পোস্টমর্টেম রিপোর্টে পিটানোর কারণে ব্যাথায় ও রক্তক্ষরণে তার মৃত্যুর হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে।

জানা গেছে, ৬ অক্টোবর ৩ দফায় পেটানো হয় আবরারকে। প্রথম দফায় তাকে পেটানোর পর রাত সাড়ে ১১টায় আবরারকে ব্যথা নাশক ওষুধ ও রাতের খাবার খাওয়ানো হয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় মারধর শুরু করে বুয়েটের ১৫ ব্যাচের অনিক তখন মধ্যরাতে আবরার বারবার বমি করে। পরে তৃতীয় দফায় তাকে টেনে হিচড়ে বের করে আরেক বড় ভাইয়ের কক্ষে নিয়ে তৃতীয় দফায় ৬ জন মিলে মারধর করে। এতে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার মৃত্যুর বিষয়টি তারা বুঝতে পারে। পরবর্তী নাটকীয়তা সবার জানা।

এদিকে গত ২৮ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী সৌরভ হোসেন সিয়াম তার ৩য় বর্ষের ফরম ফিল-আপের জন্য তোলারাম কলেজ গেলে তার উপর অতর্কিত হামলা চালায় ছাত্রলীগের নামধারী নেতাকর্মীরা। হামলার এক পর্যায়ে পুলিশের কাছে নাম না প্রকাশ করার কথা বলে তাকে প্রাণনাশেরও হুমকি দেয় হামলাকারীরা।

উল্লেখ্য, গত বছরে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে ছাত্র সংসদের ভেতর আটকে রেখে একই সন্ত্রাসীরা সাংবাদিক সৌরভকে বেধড়ক মারধর করে। আবরারের মত একই কায়দায় তাকে মারধর করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে সিয়াম আহত অবস্থায় ছাড়া পায়।

এই ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে ছাত্র ফেডারেশন সভাপতি শুভ দেব বলেন, ‘ছাত্র সংসদের নামে ক্যাম্পাসের ভেতরে এক ভয়ানক টর্চার সেল গঠন করেছে কলেজ শাখা ছাত্রলীগ। এতদিন ছাত্রদের সংসদে ডেকে নিয়ে শারীরিকভাবে নিপীড়ন করা ছিলো তাদের দৈনন্দিনকার ঘটনা। এই নিপীড়নের ঘটনা দিনেদিনে ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র ক্যাম্পাসজুড়ে। এখন ডিপার্টমেন্টের ভেতরে ঢুকে ছাত্রদের উপর হামলা করতে নুন্যতম কুন্ঠাবোধ করছে না ছাত্রলীগ। অথচ এই বিষয়ে কলেজ প্রশাসন বরাবরই নীরব ভূমিকায় অবতীর্ণ।

সূত্র বলছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মতের বিরোধীতা করলেই শিক্ষার্থীদের উপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। তার সেই নির্যাতনের জন্য কখনো ছাত্র সংসদ, কখনো টর্চার সেল হিসেবে পৃথক কক্ষ ব্যবহার করছে। আর সেখানে চলে শিক্ষার্থীদের উপর নির্মম নির্যাতন। এটা শুধুমাত্র একটি বা দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিত্র নয়, প্রায় সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখন এমন চিত্র অহরহ ঘটছে। তবে ভীতির কারণে অসংখ্য নির্যাতনের তথ্য প্রকাশ্যে আসছেনা। আর তাতে করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

একটি নির্দিষ্ট সূত্র বলছে, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত দল যখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজত্ব করে তখন নিজেদের ক্ষমতা জাহির করা সহ প্রভাব বিস্তারের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। আর যে তাতের বিরুদ্ধে যায় তাকে শায়েস্তা করতে নিজেদের গড়ে তোলা টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন চালায়। টর্চার সেলের কথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ জানলেও ক্ষমতাসীন দলের কারণে তারা কিছু বলতে পারেনা।

এতে করে অভিভাবক মহল বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে। অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাই পড়াশোনা করার জন্য মার খাওয়ার জন্য না। কিন্তু ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কথা না শুনলেই আমাদের সন্তানদের নানাভাবে হেনস্তা সহ নির্যাতন সহ্য করতে হচ্ছে। এই সিস্টেম বন্ধ করতে হবে। নতুবা শিক্ষা খাতে অচিরেই ধস নামবে।

অভিভাবক রেহানা সুলতানা বলেন, আমার সন্তানকে এখন কলেজে পাঠাতে ভয় লাগে। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন করে তা বলার ভাষা রাখেনা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছেনা।

অভিভাবক আজিজ মিয়া বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজনীতি মুক্ত করা দরকার। কারণ এই রাজনীতির কারণে ভাল শিক্ষার্থীরা ইচ্ছে করলেই নিজের মত করে পড়াশোনা করতে পারছেনা। এমনকি স্বাধীনভাবে কথা পর্যন্ত বলতে পারছেনা। তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাহলে স্বাধীন দেশে বসবাস করে কি লাভ ?


বিভাগ : শিক্ষাঙ্গন


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও