আইডিয়াল বেইলীর মতো বকেয়া বেতন আদায়ে সময় বেধে দিল এবিসি স্কুলও

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:১১ পিএম, ১১ জুন ২০২০ বৃহস্পতিবার

আইডিয়াল বেইলীর মতো বকেয়া বেতন আদায়ে সময় বেধে দিল এবিসি স্কুলও

করোনার প্রার্দুভাবের মধ্যেও যেন অমানবিক হয়ে উঠেছে বিত্তবানদের মালিকানাধীন বেসরকারী স্কুলগুলো। করোনা ভাইরাসের কারণে সারাদেশে যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে সেখানে হটস্পটখ্যাত নারায়ণগঞ্জের বেসরকারী স্কুলগুলো বকেয়া বেতন আদায়ে চাপ দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের। সময় বেঁধে দিয়ে ওই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া বেতনভাতা সহ টিউশন ফিও চাইছেন কেউ কেউ। ৩ মাস শিক্ষার্থীদের কোন ধরনের কোচিং করানো না হলেও তাদেরকে কোচিং এর ফি প্রদান করার জন্যও বলা হচ্ছে। অথচ গত ৩ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে স্কুলগুলোর কার্যক্রম। কোন কোন স্কুল অনলাইনে ক্লাস নিলেও আকস্মিক সময় বেঁধে দিয়ে ওই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া বেতন ও টিউশন ফি প্রদানে চাপ সৃষ্টি করায় অনেক অভিভাবক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম নারায়ণগঞ্জে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তের পর ১৭ মার্চ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে অদ্যাবধি বন্ধ রয়েছে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। করোনার কারণে শহরের ভূইয়ারবাগ এলাকার বিদ্যানিকেতন হাই স্কুল ১৬০০ শিক্ষার্থীর মার্চ মাসের বেতন মওকুফ করেছিলেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের বেতন মওকুফ করেছিলেন।

গত মার্চ মাস থেকেই বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেতন মওকুফের দাবি জানিয়ে আসছে। গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে করোনায় উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দেশের সরকারি-বেসরকারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন মওকুফ চেয়ে আবেদন জানানো হয়েছে। ‘ল’ অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন’র পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট বারের আইনজীবী হুমায়ুন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাউছার সরকারের কাছে এ আবেদন জানান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব,শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এ আবেদন জানানো হয়।

দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো খুলে দেওয়ার কোন নির্দেশনা না আসলেও শিল্পপতি কাশেম জামালের মালিকানাধীন নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুল জুন মাসের শুরুতে সকল অভিভাবকদের মুঠোফোনে এসএমএস দেন ১১ জুনের মধ্যে বকেয়া বেতন ও টিউশন ফি পরিশোধ করতে। ওই এসএমএস এ উল্লেখ করা হয় ৩ জুন থেকে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত স্কুলটির অফিস রুমে বকেয়া বেতন ও টিউশন ফি পরিশোধ করতে। ১১ জুনের মধ্যে সকল বকেয়া বেতন ও টিউশন ফি পরিশোধ করতে এসএমএস এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। করোনাকালীন ছুটির কারণে গত ৩ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে সকল শিক্ষার্থীর। স্কুলটিতে শিক্ষার্থীদের বেতন শ্রেণীভেদে ১৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা। আর কোচিং ফি প্রতি মাসে ১ হাজার ৮০০ টাকা। স্কুলটিতে ৫ম ও ৯ম-১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক কোচিং করতে হয় বলে জানা গেছে। এখন বকেয়া ৩ মাসের বেতন ও কোচিং ফি পরিশোধ করতে হলে বেশ কিছু শিক্ষার্থীর অভিভাবককে একসঙ্গে ১২ হাজার টাকার ন্যায় গুনতে হবে যেটা অনেকের কাছেই বাড়তি বোঝা। সম্প্রতি স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ ধরনের এসএমএস পেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কিছু অভিভাবক উষ্মাও প্রকাশ করেছেন।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেনের মুঠোফোনে জানিয়েছিলেন, আমরা কোন শিক্ষার্থীর অভিভাবককে বেতন পরিশোধের জন্য চাপ দেইনি। আমরা মুঠোফোনে তাদেরকে অনুরোধ জানিয়েছি অফিস রুম খোলা রয়েছে তারা এসে বেতন পরিশোধ করতে পারেন। আমরা কোন কোচিং ফি নিচ্ছিনা।

অপরদিকে শিল্পপতি কাশেম জামালের মালিকানাধীন নারায়ণগঞ্জ বেইলী স্কুলের অধ্যক্ষও সকল অভিভাবকদের মুঠোফোনে এসএমএস দেন আগামী ১১ জুনের মধ্যে বকেয়া বেতন ও টিউশন ফি পরিশোধ করতে। ওই এসএমএস এ উল্লেখ করা হয় ৭ জুন থেকে ১১ জুনের মধ্যে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত স্কুলটির ফ্রন্টডেস্কে শিক্ষার্থীদের চলতি মাসের টিউশন ফিসহ যাবতীয় বকেয়াদি পরিশোধ করতে। করোনার এই দুর্যোগকালীন সময়ে যেখানে হটস্পট নারায়ণগঞ্জের অধিবাসীরা নানান সমস্যায় জর্জরিত সেখানে আকস্মিকই শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের উপর এহেন একসঙ্গে মোটা অংকের অর্থ প্রদান করা বাড়তি বোঝা বলেই মনে করছেন সকলে। যে কারণে স্কুলের অধ্যক্ষের কাছ থেকে এ ধরনের এসএমএস পেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কিছু অভিভাবক উষ্মাও প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে বেইলী স্কুলের অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও নারায়ণগঞ্জ শহরের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হিসেবে পরিচিত এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল নামে একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের বেতন আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত স্কুলের সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। চলতি মাসের ৬ জুন এ সংক্রান্ত নোটিশ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মোবাইলে দেয়া হয়েছে। যাতে ১০ জুনের মধ্যে বকেয়া বেতন প্রদান করে প্রবেশ পত্র সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। এ সংক্রান্ত নোটিশ নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবকদের উপার্জন প্রায় বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের স্কুলে গিয়ে বেতন পরিশোধ করতে বলা হয়েছে।

স্কুলের অধ্যক্ষ এম. আব্দুল হাই স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়, আগামী ১০ জুনের মধ্যে বিকাশের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের বেতন গ্রহণ করা হবে। যথাসময়ে বেতন পরিশোধ করার জন্য অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

করোনাভাইরাসের সংকটকালে স্কুলের এমন নোটিশকে কা-জ্ঞানহীন মনে করছেন অভিভাবকরা। যেখানে মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে কর্মক্ষেত্রে যেতে পারছেন না, আয়-রোজগার সবকিছু বন্ধ রয়েছে। সেখানে বেতন পরিশোধের নোটিশ দেয়ার বিষয়টিকে মড়ার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে দেখছেন। নোটিশের বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সাংবাদিকদের জানান, পরিবার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বেতন পরিশোধ করা আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব না। অভিভাবকরা সাংবাদিকদের জানান, করোনার কারণে নিয়মিত বেতন হচ্ছে না। তাই সন্তানদের স্কুলের বেতন পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছেন। এ অবস্থায় স্কুল কর্তৃপক্ষকে তাদের এমন স্বিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা।

এবিষয়ে এবিসি ইন্টারন্যাশনালের স্কুলের অধ্যক্ষ এম আব্দুল হাই এর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে স্কুল বন্ধ থাকায় তার স্বাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। অধ্যক্ষের স্কুলের অফিসিয়াল নাম্বারে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। পরবর্তিতে স্কুলের এক্সিকিউটিব অফিসার মোহনাকে (মোবাইল-০১৯৬৬৬৭৪৩০০) পাওয়া যায়। তিনি জানান, স্কুল বন্ধ রয়েছে। তার কাছে অধ্যক্ষের সাথে যোগাযোগের জন্য মোবাইল নাম্বার চাইলে তিনি জানান, কর্তৃপক্ষের নিষেধ রয়েছে অধ্যক্ষের নাম্বার দেয়া যাবেনা।


বিভাগ : শিক্ষাঙ্গন


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও