৩০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, শুক্রবার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ , ২:৫৭ পূর্বাহ্ণ

ফুটপাতে হকার : ৫ হাজার হকারের ৫ লাখ টাকার ইঁদুর-বিড়াল খেলা


|| সূত্র : কালের কণ্ঠ

প্রকাশিত : ০৮:৪৬ পিএম, ৩ ডিসেম্বর ২০১৭ রবিবার | আপডেট: ০২:৪৬ পিএম, ৩ ডিসেম্বর ২০১৭ রবিবার


ফুটপাতে হকার : ৫ হাজার হকারের ৫ লাখ টাকার ইঁদুর-বিড়াল খেলা

সুজন সাহা ডায়াবেটিক রোগী। খুব ভোরে ঘুম ভাঙে না বলে বিকেলেই হাঁটেন তিনি। কিন্তু নির্বিঘ্নে হাঁটার জো নেই। সুজন বলছিলেন, ‘হকারদের জ্বালায় নির্বিঘ্নে হাঁটাহাঁটি করতে পারি না। যদিও সিটি করপোরেশন ফুটপাতগুলোতে টাইলস লাগিয়ে পথচারী চলাচলের সুন্দর ব্যবস্থা করে দিয়েছে।’

নারায়ণগঞ্জ নগরের ফুটপাত দখলের এমন অভিযোগ আরো বহু মানুষের। জানা গেছে, প্রায় পাঁচ হাজার হকার নগরের বিভিন্ন সড়কের ফুটপাত দখলের প্রতিযোগিতা নেমেছে। এ কারণে যানজটের পাশাপাশি জনজটেরও সৃষ্টি হচ্ছে। মাঝেমধ্যে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের হকার উচ্ছেদ অভিযান অনেকটা ইঁদুর-বিড়াল খেলার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন পাঁচ লাখ টাকা চাঁদাবাজিই এই ইঁদুর-বিড়াল খেলার অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে জড়িত পুলিশ প্রশাসনের কিছু সদস্য, স্থানীয় হকার্স লীগের নেতারা ও সিটি করপোরেশনের কতিপয় কর্মচারী। সূত্র : কালের কণ্ঠ।

নগর ঘুরে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের প্রধান সড়ক বঙ্গবন্ধু সড়কের চাষাঢ়া থেকে মন্ডলপাড়া, সলিমুল্লাহ সড়ক, চেম্বার রোড, কালীর বাজার, সিরাজউদ্দৌলা সড়ক, শায়েস্তা খান রোডের ফুটপাতগুলোর কয়েক কিলোমিটারজুড়ে হকাররা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পসরা সাজিয়ে বসে। এসব এলাকায় রয়েছে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক, ব্যাংক-বীমা কার্যালয়, মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা করতে লোকজনকে বিশেষ বেগ পেতে হয়। অনেক সময় অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে।

বঙ্গবন্ধু সড়কের পাশে চাষাঢ়া এলাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রিপারেটরি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে সাদিয়া আফরিন। প্রতিদিন তাকে স্কুলে আনা-নেওয়া করেন তার মা শারমীন অন্তরা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হকার আর ক্রেতাদের ভিড় ঠেলে রীতিমতো যুদ্ধ করে মেয়েকে স্কুলে আনা-নেওয়া করতে হয়। এটা এক ধরনের হয়রানির মতো। হকারদের এই দৌরাত্ম্য বন্ধ করে ফুটপাত সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হোক। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের বিভিন্ন ফুটপাতে প্রায় ৫হাজার হকার নিয়মিত ব্যবসা করছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করছেন কিছুসংখ্যক হকার নেতা। শহরের সলিমুল্লাহ সড়কে হরকারদের নিয়ন্ত্রণ করেন হকার নেতা জুয়েল, চেম্বার রোডে হকার্স লীগের সাধারণ সম্পাদক পলাশ, কালীরবাজার পুরান কোর্ট এলাকায় সোহেল, সিরাজউদ্দৌলা সড়কে শাহ আলম ও আবু তাহের, কালীর বাজার ফলপট্টি এলাকা নজরুল, চাষাঢ়া জিয়া হল এলাকা মনির, শাহাদাৎ, আলম চাঁন নিয়ন্ত্রণ করছেন।

কোনো কোনো এলাকায় পুলিশ হকার নেতাদের কাছ থেকে মাসোয়ারা নেয়, আবার কোনো কোনো এলাকায় পুলিশ নিজেরাই হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে- এমন অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে শহরের গলাচিপা এলাকায় নেছার, মহসিন; আমলাপাড়া এলাকায় সেলিম, লিপু, বাবলু, রুবেল; চাষাঢ়া সোনালী ব্যাংক এলাকায় নাসির, শহীদ; সমবায় ব্যাংক এলাকায় মিলন খেলন ও আলমগীর হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন চাঁদা তুলছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে চাষাঢ়া শহীদ মিনার এলাকায় পুলিশ চাঁদা আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া সড়কে ভ্যানগাড়িতে পসরা সাজিয়ে বসা হকারদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে ট্রাফিক পুলিশের কিছু সদস্য। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধেও হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে শহরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় নগর সংস্থার কর্মচারী রহিম, গোবিন্দ, আল আমিন ও মাসুদের বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন হকার বলেন, তাঁদের কাছ থেকে হকার নেতারা দৈনিক ৩০ টাকা, পুলিশের লোক ৩০ টাকা ও অন্যরা ৪০ টাকা করে নিচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চৌকি ছোট-বড় হলে টাকার পরিমাণেও কম-বেশি হয়। বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহারের জন্যও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে অর্থ দিতে হয়। কিছু স্থানীয় মাস্তানেরও উৎপাত আছে বলে তাঁরা জানান।

শহরের পুরান কোর্ট এলাকার চাদর বিক্রেতা শামীম বলেন, ‘আমরা পুলিশ, রাজনৈতিক দলের নেতা ও সংশ্লিষ্ট লোকজনকে প্রতিদিন চাঁদা দিচ্ছি। তার পরও আমাদের ভয়ে ভয়ে ব্যবসা করতে হয়। কখন এসে মালামাল উচ্ছেদ করে সে ভয়ে তটস্থ থাকি।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা হকার্স লীগ সভাপতি আব্দুর রহিম মুন্সী বলেন, ‘আশা করছি পুনর্বাসন বা অন্য কোনো জায়গায় স্থানান্তর করা হলে ফুটপাতে আর হকার বসবে না।’

নিতাইগঞ্জের ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার পর হকার সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা ছিল নগরবাসীর। ওই সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একাধিক সভায় হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। ওই সভাগুলোতে আলোচনায় এসেছিল ঈদ ও পূজার পর হকার সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিবেন নারায়ণগঞ্জের নীতিনির্ধারকরা। তবে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক টানাপড়েনে আবারও থমকে গেছে হকার পুনর্বাসন প্রক্রিয়া।

জানা গেছে, ২০০৭ সালে শহরের ফুটপাত হকারমুক্ত করতে ৬৭৫ জন হকারের তালিকা করে তাদের চাষাঢ়ায় হকার্স মার্কেটে পুনর্বাসন করা হয়। সাধারণ একজন পান দোকানদারও দোকান  পেয়েছিল সেখানে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই হকারদের অনেকেই হকার্স মার্কেটের দোকান ছেড়ে ফুটপাতে এসে বসতে শুরু করে।

গেল বছর হকারদের উচ্ছেদে অভিযান চললেও চলতি বছর সমন্বিতভাবে কোনো অভিযান চলেনি। বরং একদিকে উচ্ছেদ আরেকদিকে দখল, বিগত কয়েক মাস ধরেই এ অবস্থা চলছে নারায়ণগঞ্জ নগরে।

নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমরা আশা করছি, সিটি করপোরেশন কঠিন সিদ্ধান্ত নিবে হকারদের সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে। যেন জনসাধারণ ফুটপাত দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। পৃথিবীর সব দেশে ফুটপাত হকারমুক্ত থাকলেও আমাদের দেশেই এর ব্যতিক্রম। ’ তিনি আরো বলেন, চাষাঢ়া রামকৃষ্ণ মিশনের উল্টো দিকে ও থানা পুকুর পাড় এলাকায় দুটি হকার্স মার্কেট থাকলেও হকাররা সেগুলো ব্যবহার না করে ফুটপাত দখল করে রেখেছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ