১০ বৈশাখ ১৪২৫, মঙ্গলবার ২৪ এপ্রিল ২০১৮ , ১:৩১ পূর্বাহ্ণ

Kothareya1150x300

এখনও কাঁদে বক্তাবলী


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ১০:৪১ পিএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ শুক্রবার | আপডেট: ০৪:৪১ পিএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ শুক্রবার


অনলাইন থেকে নেওয়া ছবি।

অনলাইন থেকে নেওয়া ছবি।

দেশ যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনি পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার প্রত্যন্ত অঞ্চল বক্তাবলীর ২২টি পরগণায়। বর্বরোচিত ওই হামলায় পাক বাহিনীর হাতে ১৩৯ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ দেয়। তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি নারী কিংবা শিশুরা। রাজাকার আলবদররা জ্বালিয়ে দিয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম। আজও স্বজন হারানো বুক ফাটা কষ্ট নিয়ে শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয় দিবসটি।

১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর ছিল সোমবার। এর পরের সোমবার তিন বোনের একমাত্র ভাই হাফিজুর রহমানের বিয়ে। ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাসিত ছিলো বোন রোকেয়া বেগম। তবে ঘুনাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগেই একমাত্র ভাই হারিয়ে যাবে অজানার দেশে। যে হাতে বিয়ের মেহেদী লাগার কথা ছিল সেই হাত রক্তাক্ত হয় পাক সেনাদের গুলিতে। ঘটনার ৪ দশক পেরিয়ে গেলেও ভাইয়ের কথা মনে আজো কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে রোকেয়া। এভাবে সেদিন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্ল¬া থানাধীন বক্তাবলী ও আলীরটেক ইউনিয়েনর কয়েকটি গ্রামে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা। জ্বালিয়ে দেয় বাড়ি ঘর। গুলি করে, বেনট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে ১ শ ৩৯ জনকে। বছরের এই দিনে নানা কর্মসূচীর আয়োজন করা হলেও এখনো অবহেলিত রয়েছে এ জনপদ। দু:খ দুর্দশায় দিন যাপন করছে অনেক শহীদ পরিবার।

তখনও ভোরের কুয়াশা কাটেনি। নদী বেষ্টিত চরাঞ্চল বক্তাবলীর মানুষ ছিলেন ঘুমিয়ে। এ গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি আছে এমন তথ্য পেয়ে দেশীয় দোসরদের নিয়ে হামলা চালায় পাক সেনারা। অতর্কিত হামলায় মুক্তিযোদ্ধারা ভড়কে যায়। কিছুটা সময় যুদ্ধ করলেও কৌশলগত কারনে তারা চলে যায় পাশের জেলায়। পাক সেনারা তাদের না পেয়ে বক্তাবলী, লক্ষীনগর, কানাই নগর, আলীর টেকসহ কয়েকটি গ্রামের প্রায় সবকটি বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। আগুনে পুড়ে যায় অনেক মানুষ। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে নদীর ধারে লাইন করিয়ে গুলি করে মারা হয় অনেককে। ঘন কুয়াশার কারণে অনেকেই সেখান থেকে পালিয়ে অন্য গ্রামে চলে যেতে সক্ষম হন।

লক্ষীনগর গ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, ভাই হাফিজুর মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বের হয়েছে মাত্র। তাকে ধরে নিয়ে নদীর ধারে গুলি করে পাক সেনারা। পরে নদী থেকে লাশ উদ্ধার করে কবর দেয় স্বজনরা। সাবেক ইউপি সদস্য আ: রহিম জানান, বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করে মুক্তিযোদ্ধারা এখানে এসে থাকতো। এ খবর রাজাকার মাউরা গুলজার পাকসেনাদের দেয়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে এসে অর্থাৎ ২৯ নভেম্বর তারা এখানে হামলা চালায়।

বক্তাবলি ২ নং ওয়ার্ড বাসিন্দা আলাউদ্দিন বারী জানান, সে সময়ে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ৫/৬ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে হত্যা করে পাক সেনারা। তাদের মধ্যে আ: করিম খাঁর ছেলে দুই সহদোর ফারুক হোসেন ও মো: সহিদুল্লাহ, নেওয়াজ আলীর ছেলে মনির হোসেন। মেধাবী শিক্ষার্থী মোস্তফা, শহিদুল্লাহ ও নূরে আলম।

মুক্তিযুদ্ধাদের তথ্য প্রদান করে যারা
কোন গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে, তাদের পরিবারে কারা রয়েছেন, তারা কখন কোথায় থাকবে কি করবে এসব অনেক তথ্যই চলে যেত পাক হানাদার বাহিনীর কাছে। কে বা কারা এই তথ্য প্রদান করে দিতো এমন প্রশ্ন করলে উত্তরে এক মুক্তিযোদ্ধা জানান, মূলত মুসলিমলীগের লোকজন এসব বলে দিতো। তারা এবং কিছু খারাপ লোক ছিল, তারা পাক বাহিনীর আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য এবং এলাকায় ক্ষমতা দেখানোর জন্যই এসব তথ্য পাচার করে দিতো পাক বাহিনীর কাছে।

শহীদ ও আহত মুক্তিযুদ্ধাদের পরিবারের বর্তমান অবস্থা
মুক্তিযুদ্ধে আহত হয়েছেন যারা, যারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তাদের কোন খোঁজ খবর আজও কেউ নেয়নি। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক কোন তালিকাও নেই সরকার বা প্রশাসনের কারো কাছে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়েও নেই এমন কোন তথ্য। তবে বক্তাবলির সেই ২৯ নভেম্বর রাতের ১৩৯ জন শহীদ মুক্তিযুদ্ধাদের তালিকা রয়েছে। তবে তালিকা থাকলেও এবং সেই তালিকা অনুযায়ী আর্থিক সাহায্য বা বরাদ্দ আসলেও নেই বরাদ্ধ এসব পরিবারের হাতে যাচ্ছেনা। অনেক পরিবার বহু কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। এদের অনেক পরিবার এখন দিন আনে দিন খায় অবস্থা। অনেক পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ বেঁচে নেই। তবে কয়েকটি পরিবার বর্তমানে কিছুটা সচ্ছল হয়েছে তাদের সন্তানদের উপার্জনে। যেসব পরিবারের সংখ্যা হাতেগোনা একেবারেই কম।

মুক্তিযোদ্ধার বর্ণনায় সে ভোরের দৃশ্য
কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আতকে উঠা সে ভোরের বর্ণনা করেন এই প্রতিবেদকের কাছে। তাদের বর্ণনায় উঠে আসে সে ভোরের বর্বরতার এক নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি। তারা জানায়, কয়েকটি গানবোটযোগে মিলিটারিরা বক্তাবলিতে প্রবেশ করে। প্রবেশ করেই ঘরে ঘরে ঢুকে তারা সকল পুরুষদের বের করে একাধারে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়। পরে সকলের ঘরে মহিলা ও বাচ্চাদের তালাবদ্ধ করে রাখে তারা। এর পর পরই সবাইকে গুলি করে হত্যা করে তারা। এর কয়েকদিন পরে আবারো গ্রামে হানা দেয় তারা। মুক্তিযোদ্ধা আছে ভেবে গ্রামের সকল ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় পাক হানাদার বাহিনীরা। ভাগ্যজোরে সেদিন ভোঁরে ঘন কুয়াশা থাকার কারণে অনেকেই পালিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। তবে প্রাণে বেঁচে গেলেও পরিবারের সদস্যদের হারানোর দুর্বিষহ

যন্ত্রণা এখনো বয়ে বেড়ান অনেকে।
এরকম একজন বেঁচে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা হলেন খাওয়াজ আলীর সন্তান আসাদুজ্জামান। তিনি নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, তিনিও সেরাতে গুলিবিদ্ধ হন। গুলি খেয়েও বেঁচে যান তিনি তবে বেঁচে গেলেও সেই গুলির দুর্বিষহ যন্ত্রণা এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। বয়সের ভাড়ে অনেকটা ধীরে ধীরে হাতেন এবং থেমে থেমে কথা বলেন তিনি। তবে এভাবে হলেও তিনি তার কষ্টের কথা বলছিলেন। আজও কেউ তাদের জন্য কিছু করেনি, কোন সরকারই না।

প্রতিশ্রুতিতেই আবদ্ধ বধ্যভূমি
প্রতি বছর এই দিনটি আসলেই সাংসদ, ডিসিসহ চেয়ারম্যান, মেম্বাররা এখানে অবস্থিত বধ্যভূমিতে এসে দোয়া ও মিলাদের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান। যেমন বধ্যভূমিকে সরকারী স্বীকৃতি দেয়া, এখানে একটি সৃতিস্তম্ভ করা, বধ্যভূমির চারপাশে দেয়াল দেয়া, মাটি ভরাট করে উঁচু করা, বধ্যভূমি থেকে বক্তাবলি ঘাট পর্যন্ত প্রশস্ত রাস্তা করা। এসব প্রতিশ্রুতিতেই আবদ্ধ হয়ে রয়েছে এই বধ্যভূমি। প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন বলতে শুধুমাত্র বধ্যভূমির বাইরের সামনের দিকের দেয়ালটি করা হয়েছে।

সুখে নেই বক্তাবলির কোন পরিবার
বক্তাবলি ইউনিয়নের কোন পরিবার নাগরিক সুবিধার দিক থেকে সুখে নেই। এখানকার অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অনুন্নত শিক্ষা ব্যবস্থাসহ নানা নাগরিক সমস্যা রয়েছে তাদের। গ্যাসের সমস্যাও তাদের একটি বিশাল সমস্যা। বক্তাবলির প্রায় সকল রাস্তার অবস্থাই বেহাল। এ গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন এসব সহ্য করেই বসবাস করছে ইউনিয়নটিতে। অথচ মুক্তিযুদ্ধে শুধুমাত্র এই একটি ইউনিয়ন থেকে এক রাতেই ১৩৯ জনকে হত্যা করা হয়। আজ দেশের এত উন্নয়ন তবুও এ ইউনিয়নের মানুষ নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সেই শোক আজও তাড়া করে বেড়ায় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের বেঁচে যাওয়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের।

এখনো অনেকে মাঝরাতে আতকে উঠেন
এখনো অনেক মাঝরাতে আতকে উঠেন মুক্তিযুদ্ধে আহত ও শহীদ পরিবারের সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী অনেক সদস্যরা। তারা জানান, সেদিনের সেই  দুঃসহ স্মৃতি ভুলার মত নয়। মানুষ কতটা নরপিশাচ হতে পারে তা কখনো ভুলা যাবে না। এখনো সেদিনের অনেক স্মৃতি মনে পড়লে ঘুম ভেঙ্গে মাঝরাতে আঁতকে উঠেন তারা।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ