৯ ফাল্গুন ১৪২৪, বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ , ৯:২০ পূর্বাহ্ণ

primer_vocational_sm

অলিগলি ইয়াবায় ভাসছে নারায়ণগঞ্জ


মানবজমিন হতে নেওয়া || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:১৪ পিএম, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭ সোমবার | আপডেট: ০৩:১৪ পিএম, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭ সোমবার


অলিগলি ইয়াবায় ভাসছে নারায়ণগঞ্জ

লিংকরোড দিয়ে মূল শহরে প্রবেশের আগেই শিবু মার্কেট এলাকা। এ এলাকায় কয়েক শ’ গজ দুরত্বে একাধিক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। প্রয়াস, ফ্রিডম লাইফ, দীপ্তি, কাছের মানুষ। শহর এলাকার শুরুতেই কেন এতগুলো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র? এর কারণ সহজেই অনুমান করা যায়। নগরবাসী জানান, নারায়ণগঞ্জ তার পুরনো পরিচয় ভুলতে বসেছে। এ নগরী এখন আর অতখানি বাণিজ্যিক নগরী নয়, যতখানি ইয়াবা নগরী।

রাজনৈতিক নেতারা গত কয়েক বছরে বক্তৃতা-বিবৃতিতে যতখানি মাদক-বিরোধী প্রচার চালাচ্ছেন, ততই বেশি হারে বাড়ছে ইয়াবার নেশা। সচেতনামূলক নানা কার্যক্রম চললেও গত এক বছরে সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে ইয়াবা নেশা। শহরে এমন ঘর খুঁজে পাওয়া কঠিন, যে ঘরে কেউ নেশায় আসক্ত নয়।

তারা জানান, বছর কয়েক আগেও নারায়ণগঞ্জকে অনেকে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির নগরী হিসেবে চিহ্নিত করতো। সময়ের ব্যবধানে মানুষ এখন সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিকে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করছে না। নগরবাসীর বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জের এক নম্বর সমস্যা এখন ইয়াবা।

মাদকের ভয়াবহ বিস্তৃতির বিষয়ে বলতে গিয়ে কুমুদিনী বাগান এলাকার রশীদ মিয়া বলেন, সত্যি বলতে কি- ইয়াবায় ভাসছে নারায়ণগঞ্জ। পাড়া-মহল্লা, অলি-গলিতে দেদার মিলছে ইয়াবা। ১৫ থেকে ৩৫ বছরের কিশোর-তরুণ-যুবক আসক্ত ইয়াবায়। শহরের ৩০ ভাগ তরুণই এখন কোনো না কোনো নেশায় আসক্ত।

তিনি বলেন, ইয়াবা সেবী আর নেশা ব্যবসায়ীদের দৌরাত্মে আমরা অতিষ্ঠ। শহরের মানুষ কুমুদিনী বাগান বলতেই মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের আস্তানা হিসেবে চিনতো। এ এলাকায় কেউ আত্মীয়তা করতে চাইতো না। সকাল-বিকাল নিয়ম করে এ এলাকায় পুলিশ হানা দিতো। এভাবে এ এলাকাটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। পরে আমরা এক হয়ে সভা করে কুমুদিনী বাগান এলাকাকে মাদক মুক্ত এলাকা ঘোষণা করেছি। বস্তিতে প্রবেশের প্রতিটি পথে টাঙিয়ে দিয়েছি সতর্কবাণী সম্বলিত সাইনবোর্ড, ‘বহিরাগত ও মাদক ব্যবসায়ীদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ; আদেশ অমান্যকারীদের দেয়া হবে গণধোলাই’।

নারায়ণগঞ্জ জেলা মাদদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত তারা মাদকবিরোধী ৪৭৫টি অভিযান পরিচালনা করে। এসব অভিযানে ৯ হাজার ৪শ’ পিছ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় ২২৮ জনকে। ১২৪ বার হয় মোবাইল কোর্ট। এর বাইরে নিয়মিত মামলা হয় ৮৮টি। তবে এসব উদ্যোগের পরও মাদকের বিস্তার রোধ সম্ভব হয়নি। ফলে আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মাদক স্পটগুলোতে মাদক বিরোধী সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়। এরই অংশ হিসেবে ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সভা করা হয়। আলোচনা ও পথসভা করা হয় ৩৩টি। ২৪টি স্পটে দেখানো হয় নেশাবিরোধী চলচ্চিত্র। পোস্টার ও লিফলেট বিলি করা হয় ৮ হাজারেরও বেশি।

সরজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, শহরের চাঁদমারি বস্তি ছিল মাদকের উৎসঘর। মূলত এ বস্তি থেকেই মাদক ছড়িয়ে পড়তো শহরের আনাচে-কানাচে। মাদকের এ উৎস বন্ধে তিন বছর আগে বিশেষ উদ্যোগ নেন তৎকালীন সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার গাউসুল আজম। তিনি প্রথমবারের মতো মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেন নারায়ণগঞ্জে।

চাঁদমারি বস্তির যে অংশজুড়ে প্রতিদিন বসতো মাদকের হাট- সেই অংশ উচ্ছেদ করে তিনি গড়ে তোলেন ‘স্বপ্নডানা’ নামের একটি স্কুল। এতে অনেকখানি নির্মুল হয় মাদক ব্যবসা। সময়ের ব্যবধানে এখনও টিকে আছে স্বপ্নডানা স্কুলটি। তবে গাউসুল আজমের বদলির পর ধীরে ধীরে স্বপ্নডানা স্কুলের আশ-পাশে শুরু হয়ে যায় মাদক ব্যবসা। যা এখন ছড়িয়ে পড়েছে শহর ও শহরতলির বিস্তৃত এলাকাজুড়ে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, চাষাঢ়া সংলগ্ন আদমজিগেট পর্যন্ত পরিত্যক্ত রেললাইনজুড়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসে মাদকের হাট। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির দেখা মেলে পাঠানটুলি-আইলপাড়া এলাকায়। জেলার আইন-শৃঙ্খলা বৈঠকে গত তিন বছর ধরে পাঠানটুলি ও আইলপাড়া মাদক স্পট উচ্ছেদের একাধিক ঘোষণা এলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর অভিযানের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে জেলা প্রশাসনের তরফে একাধিকবার বিতরণ করা হয়েছে সচেতনামূলক লিফলেট। আয়োজন করা হয়েছে সভা-সমাবেশ। তবে ফলাফল শূন্য। এছাড়া শহর ও শহরতলির ঋষিপাড়া, জিমখানা, নিতাইগঞ্জ, কুমুদিনী বাগান, খানপুর, তল্লা, কায়েমপুর, জামতলা, কিল্লারপুল, মাসদাইর পাকাপুল, গোরস্থান, বিসিকের মোড়, বেকারি মোড়, স্কুলের মোড়, সারাইভোগের মোড়, কাশিপুর, শাসনগাঁও, শীষমহল, গলাচিপা, নল্লাপাড়া, দেওভোগ পাকা রোড এলাকায় সহজেই মেলে ইয়াবাসহ নানা নেশাদ্রব্য।

বিবি রোডের ব্যবসায়ী তপন কুমার বলেন, নারায়ণগঞ্জে ইয়াবা বিক্রির নির্দিষ্ট স্পট খোঁজার প্রয়োজন নেই। শহর ও শহরতলীর সব স্থানেই মেলে ইয়াবা। বহন ও হাত বদল প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের ইয়াবা ব্যবসা এখন অনেকটাই ডিজিটাল।

সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত তিন মাদক ব্যবসায়ী শহিদুল্লাহ ওরফে কালা মানিক, দেলোয়ার হোসেন দেলু ও কে টু সুমনের ছত্রছায়ায় চলছে ইয়াবা নগরী নারায়ণগঞ্জের মাদক ব্যবসা। তিনজনের বিরুদ্ধেই রয়েছে মাদক, অস্ত্র বা ডাকাতির একাধিক মামলা।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশের একটি তালিকায় মাদক ব্যবসার গডফাদার হিসেবে রয়েছে শাহজাহান সরকার ওরফে কৃষ্ণার নাম। এছাড়া চঞ্চল, টাইগার সুমন, চোকলা সাইদুল, শফিউল্লাহর বিরুদ্ধেও রয়েছে মাদক ব্যবসার সুনির্দিষ্ট অফিযোগ। মাসদাইর এলাকার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে তিনটি গ্রুপ। এর মধ্যে একটা গ্রুপের নেতৃত্ব দেয় স্বপন ও জামাল। আরেকটি গ্রুপের নেতৃত্ব রয়েছে আলী, রহমান ও শামীমের হাতে। অন্য একটি গ্রুপ চালায় তুহিন ও এবাদুল। এছাড়া বিপ্লব, জামান, জসীম, মনির, নয়ন ও হাশেমের বিরুদ্ধেও রয়েছে মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ।

মাদকের বিস্তার রোধে জেলা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দাবি করে সংস্থার সহকারী পরিচালক বিপ্লব কুমার মোদক বলেন, জনবল স্বল্পতার (মাত্র ৬ জন) মধ্যেও আমরা প্রতিনিয়ত মাদক-বিরোধী অভিযান পরিচালনা করি।

তিনি বলেন, একজন পরিদর্শক, একজন এসআই, একজন এএসআই আর দুইজন সিপাহি নিয়ে মাদক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করি আমরা। অথচ আমাদের কাছে থাকে না কোনো অস্ত্র! আমাদের অবস্থাটা একবার ভাবুন, কতটা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি আমরা।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ