শীতলক্ষ্যায় দূষণেও কৌশল

১ ভাদ্র ১৪২৫, শুক্রবার ১৭ আগস্ট ২০১৮ , ৩:৪৭ পূর্বাহ্ণ

শীতলক্ষ্যায় দূষণেও কৌশল


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৫০ পিএম, ১৩ জানুয়ারি ২০১৮ শনিবার | আপডেট: ০২:৫০ পিএম, ১৩ জানুয়ারি ২০১৮ শনিবার


শীতলক্ষ্যায় দূষণেও কৌশল

নারায়ণগঞ্জ সেন্ট্রাল খেয়াঘাট সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদী তীঁরে বিশাল আকৃতির একটি ড্রেন দিয়ে অবধারিত পড়ছে পানি। তবে এটা স্বচ্ছ না পুরো পানি জুড়েই ময়লা আবর্জনা আর বিভিন্ন কল কারখানার রঙ যুক্ত দুর্গন্ধযুক্ত পানি। সেই সঙ্গে আসছে পলিথিন আর গৃহস্থলী অনেক জিনিসপত্রও। যে স্থানটিতে পানি পড়ছে শীতলক্ষ্যার ওই বিশাল এলাকা জুড়ে পানির রঙ কালো বিবর্ণ সঙ্গে আসছিল বিদঘুঁটে গন্ধ। আশেপাশে মানুষ ঠাঁই দাঁড়ানোও বেশ কষ্টসাধ্য। নাকে রুমাল দিয়েও আটকে রাখা যায় না গন্ধ। একটু এগিয়ে সেন্ট্রাল খেয়াঘাট থেকে টানবাজারের দিতে যেতে নজরে আসে আরো কয়েকটি ড্রেন। সেখান দিয়েও আসছে একই পন্থায় দূষিত পানি।

নদীর তীঁর ঘেঁষে একটি নৌকায় করে সেন্ট্রাল খেয়াঘাট থেকে আরো একটু উত্তরে গেলে দেখা যাবে একের পর এক ড্রেনের মুখ। নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলীর ড্রেনগুলো এসব মুখে সংযুক্ত। শহরের প্রায় সব এলাকার পানি এভাবেই পড়ছে শীতলক্ষ্যায়। শহরের খানপুর বরফকল মাঠ এলাকার সামনে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে ৫টি মোটা পাইপের সংযোগস্থল নদীতে। দিনের বেলায় এসব পাইপ দিয়ে কিছু বের না হলেও সন্ধ্যার পরেই বেরিয়ে আসে বিভিন্ন ডাইংয়ের দূষিত পানি। সন্ধ্যার পরেই এসব ডাইং কারখানা ছেড়ে দেয় বর্জ্য ও দূষিত পানিগুলো। তাছাড়া অনেক ডাইং কারখানা এখন কৌশলে তাদের পাইপগুলো নদীর নিচে দাবিয়ে রাখে যাতে দৃশ্যমান না হয়।

আরো একটু উত্তরে গেলে পাঠানটুলী এলাকার চিত্র আরো ভয়াবহ। সেখানে দিনের বেলাতেই বিভিন্ন স্থানে ড্রেনে কেটে পানি নিস্কাশনের লাইন করা হয়েছে। এসব পানির পাইপও ক্রমশ নিচের দিকে নামতে থাকে। নদীর তীরে আসতে আসতে পাইপ থাকে পানির অনেক গভীরে।

বরফকল ঘাটের নৌকার মাঝি সাইফুল জানান, ‘দিনের বেলাতে আমরাই নাকে রুমাল চেপে নৌকা পারাপার করতে হয়। গন্ধে আমরা টিকতে পারি না। আর সন্ধ্যার পর কালো পানি লাল হয়ে যায়। মনে হয় রক্তের বন্যা বইতে শুরু করেছে।’

শহরের ৫নং খেয়াঘাটের ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাঝি সুমন মিয়া জানান, ইঞ্জিনের পাকা ঘুরলে দুর্গন্ধ অনেক বেড়ে যায়। প্রায়শই পলিথিন এসে পাখায় আটকে যায়।

সিদ্ধিরগঞ্জের চিত্তরঞ্জন খেয়াঘাটের মাঝি সোলেমান মিয়া বলেন, ‘এখন কারখানা মালিকেরা চালাক হয়ে গেছে। পাইপ এমনভাবে বসায় যে আমরা দেখতে পারি না। তবে যখন পানি ছাড়ে তখন নদীর তীরে বুদবুদ হয়ে লাল আর কালো রঙয়ের পানি বেরিয়ে আসতে থাকে। এগুলো ডাইংয়ের পানি।’

এদিকে নদীতে শুধু বিভিন্ন কলকারখানার পানি না বরং বিভিন্ন এলাকার লোকজনও বর্জ্য নিয়ে ফেলে দিচ্ছে নদীর তীরে। আর সেগুলোও ধীরে ধীরে গিয়ে পড়ছে নদীতে। বর্ষাকালে নদীর পানি ¯্রােতসীনি থাকায় পানির বিবর্ণ রঙ কিছুটা মিইয়ে আর কালো রঙ না থাকলেও শীতকালে নদীরে পরিধি যেমন ছোট থাকে তেমনি নদীর পানিও একেবারে ব্যবহারের তো অযোগ্য বটেই পানির সামনেও দাঁড়ানো যায় না।

ব্যবসায়ীদের সূত্র মতে, নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ও আশেপাশ অন্তত ২শ শিল্প কারখানা সহ ডাইং রয়েছে। এছাড়া নদী থেকে দূরে অনেক কারখানারও পানি নিস্কাশনের ড্রেন করে নদীতে ফেলার স্থান তৈরি করা হয়েছে। এসব কারখানার বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই এসব নদীতে এসে পড়ে। তার সঙ্গে এ নদীতে পড়ছে নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলির নাগরিক বর্জ্য।

নারায়ণগঞ্জ সেন্ট্রাল খেয়াঘাট এলাকার ৬০ বছর বয়সী রমজান মিয়া এক সময়ে মাছ ধরতো। তিনি জানান, তিনি ২০ বছর আগেও তিনি মাঝ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে তিনি আর নদীতে মাছ ধরেন না। নদীর যে অবস্থা তাতে মাছ থাকাটাই একেবারে অসম্ভব। সে কারণেই এখন তিনি নৌকা চালান। আর নৌকা চালাতেও বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বর্ষাকালে গন্ধ কম থাকলেও শীতকালে কখনো কখনো বমি আসার উপক্রম হয়।

নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সমন্বয়ক মোস্তফা করিম বলেন, ‘বিভিন্ন শিল্প কারখানা, ব্যক্তি মালিক সহ আমরা সবাই কোন না কোনভাবে শীতলক্ষ্যাকে দূষণ করছি। নির্ধিদ্বায় আমরা বর্জ্য, বাড়ির সুয়ারেজের পানি নদীতে ফেলে দূষণের মাত্রা বাড়াচ্ছি। আর যেসব সরকার প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মকর্তারা ‘নদীকে বাঁচাতে হবে’ বার বার বলে তারাও কাজের ক্ষেত্রে যথার্থভাবে এগিয়ে আসতে পারছে না। দূষণ রোধে আমাদের সকল সরকারী দফতর, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্প কারখানা মালিকদের সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’

শীতলক্ষ্যা দূষণ রোধে নিয়মিত কর্মসূচী পালন করা পরিবেশবাদী সংগঠন নির্ভীকের প্রধান সমন্বয়ক এটিএম কামাল জানান, আমরা বহু বছর ধরে আন্দোলন করলেও কার্যত কোন সুফল পাচ্ছি না। বরং দিন দিন দূষণ বেড়েই চলেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও কারখানা স্থাপনের কারণেই এ দূষণ হচ্ছে। আমরা শুধু বক্তব্য, গোলটেবিল বৈঠক, সভা সেমিনার করে দূষণের কারণ বললেও এগুলো রোধে কোন উদ্যোগ নেই।

পরিবেশ অধিদফতর নারায়ণগঞ্জ জোনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, অনেক কারখানার ইটিপি প্লান্ট তৈরি করা আছে। জরিমানা কিংবা প্রশাসনিক ঝামেলা এড়াতে ইটিপি প্লান্ট নির্মাণ করে রাখলেও সেটা ব্যবহার করে না। কারণ অনেক মালিকের দাবী, এটা ব্যবহার করলে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা খরচ হয়। সে খরচ বাঁচাতেই বিকল্প পাইপ দিয়ে অনেক ডাইং ও শিল্প কারখানা মালিকেরা তাদের কেমিক্যালযুক্ত পানি সরাসরি নদীতে ফেলে দিচ্ছে। আর রাতে এ কাজটি বেশী করায় প্রায়শই তাদের ধরা যাচ্ছে না। আমরা যখন দিনের বেলায় কারখানা পরিদর্শনে যাই তখন দেখানো হয় ইটিপি প্লান্ট আছে। আর অনেক কারখানা এখন প্লান্টের পাশে বিশাল আকৃতির ট্যাংকি করে রাখে। এখানে দিনের বিষাক্ত পানি জমা করে রাখে যা সন্ধ্যার পর কিংবা গভীর রাতে নদীতে ছেড়ে দেয়।

পরিবেশ অধিদফতর নারায়ণগঞ্জ জোনের উপ পরিচালক মো. ফেরদৌস আলম জানান, গত এক বছরে নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন নদী দূষণে অনেক কারখানাকে কোটি টাকার অর্থদ- করা হয়েছে। এর মধ্যে শীতলক্ষ্যা নদী দূষণের অভিযোগে গত এক বছরে ৬৪ লাখ ৬০ হাজার ২৮৮ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকবলের সংকট রয়েছে। যার জন্য সব সময় আমরা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া ঢাকার অফিস থেকে অভিযানগুলো পরিচালনা করা হয়। সেখানেই কারখানা মালিকদের তলব করে শুনানী হয়। তখন দূষণের মাত্রা বুঝে অর্থদণ্ড করা হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকার আশেপাশে শীতলক্ষ্যা সহ অন্য নদীগুলো রক্ষার দাবিতে আগামী ১৫ জানুয়ারি ঢাকার অফিসে পরিবেশ অধিদপতরের মহাপরিচালক মো. রইছল আলম মণ্ডলের সভাপতি সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে নদীর পাশে অবস্থানরত প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান, নদী দূষণরোধ, নাব্যতা সহ নদীরক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নতুন করে গ্রহণ করা হবে।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ