২ কার্তিক ১৪২৫, বুধবার ১৭ অক্টোবর ২০১৮ , ২:৩২ অপরাহ্ণ

UMo

সেই বর্বরতা আর দেখতে চায় না নারায়ণগঞ্জবাসী


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:২১ পিএম, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বুধবার


সেই বর্বরতা আর দেখতে চায় না নারায়ণগঞ্জবাসী

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করা হবে ৮ ফেব্রুয়ারি। এ রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়ত জোট নারায়ণগঞ্জে নাশকতা করতে পারে এমন শংকা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর মধ্যে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নশকতার লক্ষ্যে গোপন বৈঠক করা হয়েছে অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। কারণ হিসেবে নগরবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে বিগত ২০১৫ সালের বিএনপির টানা অবরোধ ও হরতালে দেশজুড়ে জালাও পোড়াও এর বর্বরচিত হামলা। বর্বরচিত কর্মকান্ডে বাদ যায়নি নারায়ণগঞ্জও। চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা দিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সাধারণ মানুষকে। সেই নির্মম রাজনীতির শিকার হয়ে এখনও বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন দুইজন। যার মধ্যে একজন শিশু সাফির ও সালাউদ্দিন। তবে এসব কিছুই আর দেখতে চায় না নগরবাসী।

২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপি জামায়াত জোটের নেত্রী খালেদা জিয়ার ডাকা অনির্দিষ্ট কালের অবরোধ ও হরতাল চলাকালীন সময়ে ১৮ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় বাসে ছোড়া পেট্রোল বোমায় দুই বছরের শিশু সাফির ও তার বাবা ডা. সাইফুল ইসলাম, মা ডা. শারমিন সিদ্দিক দগ্ধ হন। সেই সময় শিশু সাফির শরীরের ১৭ ভাগ পুড়ে যায়। আগুনে পুড়ে যাওয়া বাবা মায়ের ক্ষত সেরে উঠলেও ছেলেকে নিয়ে তাদের দূর্ভবনা কাটেনি। এখনও সাফির সম্পূন্ন সুস্থ্য হয়ে উঠতে পারেনি। এখনও প্রতি রাতে আতঙ্কে কেঁদে উঠে।  সেই দিনে বিএনপি জামায়াতের বর্বরতার কথা আজও ভুলতে পারেনি তারা।

অন্যদিকে ২৩ জানুয়ারি পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয় সালাউদ্দিন। বিএনপি জামায়াতের ছোড়া পেট্রোল বোমায় তার সারা শরীর পুড়ে যায়। এখন সন্তান ও পরিবারের লোকজনও পুড়ে যাওয়া শীর দেখে আঁতকে উঠে। আর এক মাত্র উপার্যনক্ষম ব্যক্তি হয়ে পরেন অসহায়। যার কারণে পড়ালেখা করা ছোট ভাইয়েরাও এখন কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। সেই দিনে বিএনপি জামায়াতের বর্বরতার কথাগুলো বলতে গিয়ে ঢুকরে কাঁদলেও চোখের পানি ঠিকমত বের হচ্ছিল না। কারণ পেট্রোল বোমার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে তার শরীর, শুকিয়ে দিয়েছে চোখের পানিও। সারাদিন বাসায় শুয়ে থাকতে হয় কিন্তু প্রতি মাসে চিকিৎসার জন্য ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। আর এ টাকা যোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

নতুন করে আবারও খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে সেদিকেই ধাবিত হতে পারে এমন আতঙ্ক বিরাজ করছে নগরবাসীর মধ্যে। যা উপলব্ধি করা যায় পুলিশের করা একের পর এক মামলা থেকে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে,  গত কয়েকদিনে নারায়ণগঞ্জের ৭ থানায় পৃথক ভাবে ৮টি মামলা করেছে যেখানে বিএনপি ও এর সহযোগি সংগঠনের ৪০০জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো অন্ত ৫০০ জনকে আসামী করা হয়েছে। যার মধ্যে সদর মডেল থানায় ১টি, বন্দর থানায় ১টি, আড়াইহাজারে ১টি, রূপগঞ্জে ১টি, সোনারগাঁয়ে ২টি, সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ১টি ও ফতুল্লা থানায় ১টি।

সব কয়টি মামলায় অভিযোগ করা হয়, বিএনপি জামায়াত নেতাকর্মীরা ওইসব থানায় এলাকায় অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য প্রস্তুতি কিংবা গোপন বৈঠক করছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালালে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীরা পুলিশের উপর ইটপাটকেল সহ ককটেল নিক্ষেপ করে। ওই সময় পুলিশ ককটেল অবিস্ফোরিত ককটেলও উদ্ধার করে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতনরাও বলছেন, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে হুমকি ধমকি দিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। যার তথ্য তাদের কাছে রয়েছেন। এর ধারাবাহিকতায় নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন, চেক পোস্ট, তল্লাশী ও পুলিশের টহল অব্যাহত আছে।’

নগরবাসীর বাসির দাবি, ‘অপরাধী হলে শাস্তি হবে না হলে হবে না। কিন্তু এসব নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার কেন জনগন হবে। কেন জনগনকে শাস্তি দিবে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষকে পুড়ে মরবে। এগুলো কারো কাম্য নয়। আমরা নগরবাসী শান্তিতে বসবাস করবো নির্বিঘেœ রাস্তায় চলাচল করবো। আমরা কারো প্রতিহিংসার শিকার হতে চায় না। আমরা এমন রাজনৈতিক দল চাই না যারা নিজেরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দেশের জনগণকে পুড়িয়ে মারবে। মানুষকে তাদের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে তৈরি করবে। এ বর্বরতা ও নিশংসতা আর নারায়ণগঞ্জবাসী দেখতে চায় না।’

পেট্রোল বোমায় দগ্ধ উপার্যনক্ষম ব্যক্তি
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার পাঁচরুখী গ্রামে বাড়ি সালাউদ্দিনের। রাস্তার পাশেই টিনের ঘর। কোন রকম পরিবার নিয়েই ওই ঘরে বসবাস করেন তিনি। এক সময়ে যে ঘর থাকতো উচ্ছাস আর আনন্দে সেই ঘরে এখন বিষাদের ছায়া। কারণ যার আয়ে সচল থাকতো পুরো পরিবার সেই ব্যক্তি এখন অচল বেকার হয়ে পড়ে রয়েছেন বিছানায়।

সালাউদ্দিন বলেন, ‘বাবা আবদুস সাত্তার মারা গেছেন চার বছর আগে। তখন থেকেই আমি ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে ‘ক্যাথে রেডিমেন্ট গার্মেন্ট’ নামের একটি কাপড়ের দোকানে চাকুরী শুরু করি। বেতন ভালোই দিত দোকান মালিক। আর সে বেতনের টাকা দিয়েই চলতো পুরো সংসার। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সালাউদ্দিন তৃতীয়। আর ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। সালাউদ্দিনের দুই ছেলে হাসিব হোসেন ও আবির হোসেন দুইজনই স্থানীয় ‘পাঁচরুখী হাজী সাহেব আলী ফকির উচ্চ বিদ্যালয়’ এর ছাত্র।’

‘কিছুদিন আগেও ছেলেদের সঙ্গে ঘুরতে যেতাম ছুটি পেলেই। তারাও সব সময়ে আমার কাছেই থাকতো। কিন্তু আগুনে আমার শরীর পুড়ে যাওয়ার পরে এখন অনেকেই ভয় পায়।’

বলেই কাঁদতে শুরু করে সালাউদ্দিন। বলেন, ‘আমার কি দোষ, নিজের পেটের তাগিদেই ঝুকি নিয়ে দোকানে গিয়েছিলাম। ২৩ জানুয়ারী রাত ১০টায় যখন বাসে করে ফিরছিলাম তখনই একটি পেট্রোল বোমায় পুরো বাসটি জ¦লে যায়। আগুনে পুড়ে যাই আমি। ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে থেমে থেমে ছয় মাস চলে চিকিৎসা। সরকার ওই সময়ে হাসপাতালের চিকিৎসার টাকা মওকুপ করেছিল।’

সাফির
২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ শহরে বাসে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয় আড়াই বছরের শিশু সাফির। ওই ঘটনায় তার চিকিৎসক মা-বাবাও আহত হন।

জানা গেছে, শহরের চাষাঢ়া সমবায় মার্কেটের সামনে রাতে অবরোধকারীদের দেওয়া আগুনে সিটি বন্ধন পরিবহনের একটি বাস পুড়ে গেছে। ওই বাসে থাকা এক চিকিৎসক দম্পতি ও তাদের আড়াই বছর বয়সী শিশু সন্তান সহ কমপক্ষে ১০ জন আগুনে দগ্ধ হন।

বাসটির চালক কলিম উদ্দিন বলেন, রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাসটি শহরের চাষাঢ়া সমবায় মার্কেটের সামনে আসামাত্র ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী ৩-৪ যুবক হাতে লাঠি নিয়ে অতর্কিতে বাসের সামনে দাঁড়িয়ে সামনের কাচ ভাঙতে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা তরল জ্বালানি ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে সটকে পড়ে। ওই সময় বাসে ১০-১২ জন যাত্রী ছিল।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ