নারায়ণগঞ্জ জেলার জন্মদিন

এস. এম শহিদুল্লাহ || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:১৮ পিএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বুধবার



নারায়ণগঞ্জ জেলার জন্মদিন

১৫ ফেব্রুয়ারী। ১৯৮৪ সালের এদিন গঠিত হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ জেলা। নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁয়ের আদি নাম ছিল সুবর্ণগ্রাম। বর্তমানে এখানে হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের কোনো প্রাচীন কীর্তির ধ্বংসাবশেষ দেখা না গেলেও ঐতিহাসিকগণ সকলেই একমত যে, এখান থেকেই হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের শাসকগণ বঙদেশকে শাসন করেছিলেন।

অতঃপর মুসলমান সুলতানি আমলে ফখরউদ্দিন মোবারক শাহ (১৩৩৮-৪৯খ্রিঃ) সোনারগাঁয়ের সুলতান ছিলেন, সে কথা বিশ্ব ভ্রমনকারী ইবনে বতুতা বলে গেছেন। এরপরে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (১৩৮৯-১৪১১খ্রিঃ) প্রথম জীবনে সোনারগাঁ থেকে বাঙলায় রাজত্ব করেছিলেন। সে কথাও ইতিহাসে উল্লেখ আছে। ১৪৮৬ সালে রালফ্ ফিচ নামক একজন ইউরোপীয় ভ্রমনকারী সোনারগাঁয়ে এসে বলে গেছেন বাঙলার স্বাধীন বার ভূইঞাদের নেতা ইসা খাঁ`র রাজধানী ছিল এই সোনারগাঁয়ে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বের কোন বিবরণে ‘নারায়ণগঞ্জ’ নামের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। নারায়ণগঞ্জ বলতে তখন পর্যন্ত কোন শহর গড়ে ওঠেনি। কত্রাভু (নবীগঞ্জ), খিজিরপুর (খাঁনপুর), কদমরসুল এবং বন্দরই  ছিল মূল শহর। ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও শীতলক্ষার নদীর পরিধি তখন পশ্চিমে দেওভোগ ও উত্তরে খাঁনপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জ শহরের দক্ষিণভাগ পুরোপুরি নদীগর্ভে ছিল।

নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার লক্ষ্মীবাজার অঞ্চল দুটি ভিখনলাল পান্ডে পত্তন করেছিলেন। শ্রী ভিখনলাল পান্ডে ছিলেন একজন পাঞ্জাবী ব্রাহ্মণ। তিনি আঠার শতকে ভাগ্যান্বেষণে পাঞ্জাব থেকে ঢাকায় এসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি দপ্তরে একটি চাকরি যোগাড় করে নেন। লোকশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম ইঙ্গ-বার্মা যুদ্ধে ইংরেজরা পরাজিত হলে গুজব রটে যে বার্মা বাহিনী ঢাকা আসছে। ইংরেজরা ভয়ে নানা পণ্যদ্রব্য ও লাখ লাখ টাকা ফেলে কলকাতা পালিয়ে যায়। পরে ফিরে আসার পর ভিখনলাল তা ইংরেজদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

ইংরেজরা ভিখনলালের অবদানের পুরস্কার হিসেবে তাঁকে প্রচুর ভূ-সম্পত্তি দান করেন এবং তা বংশানুক্রমে ভোগ করার অধিকার প্রদান করেন। ভিখনলালের ছিল দুই পুত্র। একজন কৃষ্ণ প্রসাদ ওরফে রাজা বাবু আরেকজন গোপাল প্রসাদ। ঢাকার লক্ষ্মী বাজারের শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরীর গলিতে অবস্থিত ‘রাজা বাবুর বাড়ি`টির মালিক ছিলেন ভিখনলাল। যা এখনও পরিত্যাক্ত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। ভিখনলাল পান্ডকে কোনো কোনো রেকর্ডে বেল্লুর ঠাকুর বা লক্ষ্মী নারায়ণ ঠাকুর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিখনলাল খুবই ধর্মভীরু এবং দয়াবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি শীতলক্ষা নদী তীরের বাজারগুলো নারায়ণ পূজার ব্যয় বহনের জন্য একটি উইলের মাধ্যমে দেবোত্তর সম্পত্তি করে দেন। এসব অঞ্চলের আয় থেকেই সব ধর্মীয় খরচ বহন করা হতো। নারায়ণ ঠাকুরের নামে উৎসর্গীকৃত বলে এই স্থনকে নারায়ণগঞ্জ নামে অভিহিত করা হয়। সেই থেকে এ অঞ্চলের নাম হয় নারায়ণগঞ্জ।

পাট ব্যবসার সুখ্যাতির কারণে ব্রিটেনের স্কটল্যান্ডের লিলিয়ন ও পাট ব্যবসার সুবিখ্যাত ডান্ডি শহরের সাথে তুলনা করে নারায়ণগঞ্জকে ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ শহর বলা হয়ে থাকে।

১৮৭৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মদনগঞ্জ ও বন্দরকে নারায়ণগঞ্জের সাথে অন্তর্ভুক্ত করে নারায়ণগঞ্জ মিউনিসিপ্যালটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৭৬ সালে তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে পৌরসভা গঠিত হয়। ১৮৯৬ সালে তিনটি ওয়ার্ড থেকে ৬ জন এবং মনোনীত ২ জন কমিশনার নিয়ে পৌরসভা পরিচালনা কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মি. এইচ টি উইলসন। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় প্রথম এদেশীয় নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন খানঁপুর মহল্লার সৈয়দ মোহাম্মদ মালেহ। সে সময় তিনি একজন বিদ্ব্যান ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অবশ্য এর পূর্বে ১৯০০ সালে মি. উইলসন পদত্যাগ করায় কিছু দিনের জন্য বাবু মহিমচন্দ্র গাঙ্গুলী চেয়ারম্যান পদে ছিলেন। ১৯০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নারায়ণগঞ্জ শহরে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে প্রথম বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্হা চালু হয়। ১৯৯০ সালের জুলাই হতে এ সরবরাহ ব্যবস্থাটি ঢাকা ওয়াসার উপর ন্যস্ত হয়। ১৯৩১ সালের দিকে প্রথম নারায়ণগঞ্জ শহরের রাস্তায় পৌর বাতির ব্যবস্থাকরা হয়। তখন এ বাতিকে মানুষজন `বিজলী বাতি` বলতো। এর পূর্বে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোতে হারিকেন জ্বালিয়ে রাখা হতো।

১৮৬৬ সালে নারায়ণগঞ্জ শহরে জেলার প্রধান ডাকঘরটি স্থাপিত হয়। ১৮৮২ সালে নারায়ণগঞ্জ মহকুমা গঠিত হয়। আবার ১৯৬৪ সালে বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলা এবং নরসিংদী জেলার সমন্বয়ে নারায়ণগঞ্জ মহকুমা পুনর্গঠিত হয়। যা ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। ১৯৭৮ সাল থেকে নরসিংদীকে আলাদা মহকুমা করা হয়।

১৮৮২ সালে ৩০ শয্যা বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। হাসপাতালটি দীর্ঘদিন পৌরসভা কর্তৃক পরিচালিত হয়। ‘নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল’ এই শহরের প্রথম হাই স্কুল।

১৮৮৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জে রেল প্রতিষ্ঠা করা হয়। কয়েক বছর ডিআইটি মার্কেটের পেছনে থাকার পর এটি বর্তমান স্থানে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১৯৪৯-৫০ সালের দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র ‘সাপ্তাহিক বার্তাবহ’। এর প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন মনীন্দ্র দত্ত।

১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ জেলা গঠিত হয়। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে উন্নিত হয়। পৌরনীতি বিজ্ঞানে নাগরিকের সজ্ঞায় বলা আছে, ‘শব্দগত অর্থে নগরের অধিবাসীকে নাগরিক বলা হয়। যেমন, ঢাকার নাগরিক, লন্ডনের নাগরিক ইত্যাদি’।

সেই হিসেবে আমরা নারায়ণগঞ্জের নাগরিক। ১৮৭৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে প্রথম স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অর্থাৎ পৌরসভা চালুর মধ্য দিয়েই পৌর নাগরিক হিসেবে আমাদের পথ চলা শুরু হয়েছিল। তাই ৮ সেপ্টেম্বরকে নারায়ণগঞ্জে ‘নাগরিক দিবস’ হিসেবে পালনের মধ্য দিয়ে আমরা দিনটি উদযাপন করতে পারি। যা আমাদের ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হবে। এ ব্যাপারে  নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক: একজন সমাজকর্মী ও কলাম লেখক। বি: দ্র: লেখার তথ্য লেখকের নিজস্ব সংগ্রহ করা।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও