‘বস্তির ভেতরে পাঠাগার’

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২০ পিএম, ২ মার্চ ২০১৮ শুক্রবার



‘বস্তির ভেতরে পাঠাগার’

‘চারদিকে সব বড় বড় দালান কোঠা। এর মধ্যখানে একটি খেলার মাঠ। আর মাঠের কিছুটা জায়গা দখলে করে বাসস্থান গড়ে তুলেছেন কিছু নিম্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। যাদের সহজ ভাষায় বলা হয় বস্তিবাসি। যাদের ঘর গুলোতে বৈদ্যুতিক আলো জ্বললেও শিক্ষার আলো না থাকায় অন্ধকারে জীবন যাপন করছে বলে দাবি করেন সেখানকার বাসিন্দারা। তবে সেই মানুষের জীবনে আলো ছাড়াতে বস্তির মধ্যে দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ষাটোর্ধ্ব এক নারী।

‘পড়িলে বই আলোকিত হই, না পড়িলে বই অন্ধকারে রই’ এ স্লোগানে ১৯৯০ সালে গড়ে তুলেন ‘শাপলা পাঠাগার’। সেই থেকে এখনও পর্যন্ত অসংখ্য প্রতিকূলতা কাটিয়ে ধরে রেখেছেন তার ভালোবাসা ও স্বপ্নের শাপলা পাঠাগারটি। ঝড় বৃষ্টি ও পরিবারে সঙ্গে রীতিমত যুদ্ধ করেই এসব কিছু চালিয়ে যান তিনি। তবে এখনও পর্যন্ত তেমন কোন প্রতিষ্ঠানিক মর্যাদা না পেলেও ‘মিনার মা’ হিসাবে বেশ পরিচিত পেয়েছেন তিনি।’

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা বালুর মাঠের দক্ষিন দিকে শাপলা পাঠাগারটি গড়ে তোলেন সাফিয়া বেগম (৬৫)। দু’চালা টিনের হেলে পড়া পাঠাগারটিতেই বসবাস করেন তিনি। চার ছেলে ও দুই মেয়ের থাকলেও তৃতীয় ছেলে শাকিল হোসেন মিঠুকে নিয়ে ওই পাঠাগারে বসবাস করতে তিনি। সম্প্রতি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শাকিল হোসেন মিঠু মারা যাওয়ার পর থেকে সেখানে একাই বসবাস করছেন তিনি। আর কখনো নিজেই রান্না করেন কিংবা ছেলে মেয়েদের বাড়ি থেকে পাঠানো খাবার খেয়ে জীবন যাপন করছেন। এতো কিছুর পর তিনি খুশি এজন্য যে তার ছোট পাঠাগারে দিনে অনেকই এসে বই নেয় ও ফেরত দিয়ে যায়। কখনো কখনো পাঠাগারে ছোট টেবিলে বসে পাঠকদের বই পড়তে দেখে।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জকে এসব কথাগুলো বলেন সাফিয়া বেগম। এসময় তিনি বলেন, ‘বেড়াগুলো পরে গেছে। চালাও ফুটা হয়ে গেছে, বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। বাশ দিয়ে কোন রকম আটকে রেখেছি। টাকা পয়সার অভাবে নতুন করে ঘর তুলতে পারছি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখন আর আগের মতো পাঠক নেই। নতুনের চেয়ে পুরাতন পাঠকরাই বই বেশি নেয়। ভাঙা ঘরে তো আর বসে বই পড়তে পারে না তাই সবাই বই বাসায় নিয়ে যায়। পাঠাগারে সদস্য সংখ্যা ৩০ জন আছে। যার মধ্যে পুরাতনই বেশি। নতুন কয়েকটা কলেজের মেয়ে আছে। আর পাঠাগারে ৫০০ এর বেশি বই আছে।’

১৯৫২ সালে নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়া এলাকার বাবা আলী হোসেন ও মা শাহারা বেগমের সংসারে জন্মগ্রহণ করেন সাফিয়া বেগম। পরিবারের অভাব অনটন থাকায় মাত্র অষ্টম শ্রেণীতে পড়ালেখা করা অবস্থায় রাজধানী ঢাকার কেরানিগঞ্জ এলাকার সফর আলী ব্যাপারীর ছেলে মো. আলী হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়। কেরানিগঞ্জে শ্বশুর বাড়ি হলেও ফতুল্লায় স্বামী আলী হোসেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকায় ১৯৭০ সাল থেকে ফতুল্লায় বসবাস করেন তারা। পরে ১৯৮৮ সালে স্বামী মো. আলী হোসেন মৃতুবরণ করলে ৬ সন্তানকে নিয়ে কষ্টে দিনযাপন শুরু করেন। সাফিয়া বেগম নিজে ফতুল্লার পোস্ট অফিস এলাকার একটি তোয়ালে কারখানার শ্রমিক হিসাবে কাজ শুরু করেন। অন্যদিকে সন্তানরা পড়ালেখা বাদ দিয়ে কাজে নেমে পড়েন। দুইবছর কাজ করার পর ১৯৯০ সালে শিশু ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে গণশিক্ষা কেন্দ্র পরিচলনা ও এ শাপলা পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০০৯ সালে মানিকগঞ্জ থেকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণ নিয়ে আনসার বাহিনীতে যোগদান করেন সাফিয়া বেগম।

সাফিয়া বেগমের ৬ সন্তানের মধ্যে বড় হাসিনা আক্তার মিনা, দ্বিতীয় সেলিম হোসেন, তৃতীয় শহীদ হোসেন, চতুর্থ শাকিল হোসেন, পঞ্চম শামিমা আক্তার দিপু ও ষষ্ঠ শফিক উদ্দিন টিটু। আর তাই বড় সন্তান হাসিনা আক্তার মিনার নাম অনুযায়ী সাফিয়া বেগমের পরিবর্তে ‘মিনার মা’ হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত।

সাফিয়া বেগম বলেন, ‘শিশু ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ২টি গণশিক্ষা স্কুল পরিচালনা করি। সেইসময় ১০০ থেকে ১২০ জন নারী পুরুষ পড়ালেখা করতো। সকালে দুই ব্যাচ ও বিকালে দুই ব্যাচ। তাদের জন্য বই পাওয়া যেত না। তখন আমি বই ব্যবস্থা করে দিতাম। সঙ্গে পড়ার জন্য বিভিন্ন গল্পের বই, মুক্তিযুদ্ধের বই, উপনাস, ছোট গল্প এসব দেওয়া হতো। যার ফলে আস্তে আস্তে এ পাঠাগারটি গড়ে উঠে। তবে এখন গণশিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কিন্তু পাঠাগারের পাঠক ঠিকই আছে।’

তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই বইয়ের জন্য কারো কাছ থেকে কোন টাকা নেইনি। নিজের ও সন্তানদের টাকা জমিয়ে ‘দুইটা একটা’ করে বই যোগাড় করে পাঠাগার গড়ে তুলি। পাঠাগারে সদস্য হতে কারো কাছ থেকে কোন টাকা নেওয়া হয় না। তবে যারা বই পড়ে টাকা দিয়ে যায় তাদের টাকা জমিয়ে নতুন বই আনা হয়। ২০১২ সালের ১০ নভেম্বর গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের অধীনে সরকারি তালিকাভুক্তিকরণ সনদ পাই। এর পর ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সরকারি ভাবে পাঠাগারে জন্য বই পাই। কিন্তু গত বছর সরকারি ভাবে আর কোন বই পাইনি।’

স্থানীয় বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘নাম সাফিয়া বেগম হলেও মিনার মা হিসাবে সবাই জানে ও ডাকে। টাকা পয়সার অভাবে এখানে কম টাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি। মেয়েদের কিভাবে স্কুলে ভর্তি করাবো। পড়ালেখা করলে জীবন সুন্দর হয় কিন্তু টাকাও লাগে। এ পাঠাগারে অনেকে বই নিতে আসে।’

স্থানীয় বাসিন্দা জামিলা খাতুন বলেন,‘আমরা পড়ালেখা জানি না। টাকার অভাবে ছেলে মেয়েকেও পড়ালেখা করতে পারি নাই। এখন রিকশা চালায়। আমরা কিভাবে বই পড়বো। মিনার মায়ের কাছে মাঝে মধ্যে কয়েকটা পোলাপান আসে বই নিতে। আবার কয়েকজন এখানে বসে বই পড়ে।’

পাঠক মো. সজিব হোসেন বলেন, ‘গত পাঁচ বছর ধরে আমি এ পাঠাগার থেকে বই নিয়ে পড়ছি। বইয়ের সংখ্যা কম। তবে অনেক বই আছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের উপন্যাস, কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ন আহমেদ, শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, ডা. এম এ হাসানের যুদ্ধাপরাধ গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ সহ বিভিন্ন লেখকের বই আছে। যা কম বেশি পড়া হয়েছে।’ তবে এখানে নতুন বইয়ের চেয়ে পুরাতন বইয়ের সংখ্যা বেশি। পাঠাগারটিতে আরো নতুন বই আসলে ও পরিবেশটা আরো সুন্দর হলে পাঠকও বাড়বে।’

সাফিয়া বেগমের বড় ছেলে সেলিম হোসেন বলেন, ‘মা ছোট ভাইয়ের সঙ্গে থাকতো। কিন্তু ক’দিন আগে ভাইটা মারা গেছে। এর পর মাকে বলেছি ওখান থেকে চলে আসতে। কিন্তু মা আসতে রাজি না। ছোট ভাইয়ের স্মৃতি আছে তাই ছাড়তে চায় না। আর ১৮ থেকে ২০ বছর ধরে পাঠাগার করছে একটা সেখানে ছেলে মেয়েরা বই পড়তে আসে, বই পড়ে ও নেয় সেগুলো নাকি মায়ের ভালো লাগে। তাই ছেড়ে আসতে চায় না। আমরাও কোন বাধা দেই না। মা যাতদিন বাঁচবে ওনার পাঠাগার থাকবে। আমরা ভাইয়েরা প্রতিমাসে কিছু কিছু টাকা দেই ওইটা দিয়ে মার খরচ চলে।

ছোট ছেলে শফিক উদ্দিন টিটু বলেন, ‘টাকার অভাবে অষ্টম শ্রেণির বেশি পড়ালেখা করতে পারি নাই। এখন গাড়ি চালিয়ে সংসার চলে। এর মধ্যেই মাকে বলেছিলাম চলে আসতে। মা রাজি না। যখনই বলি তখনই বলে ভাইয়ের স্মৃতি গুলো মনে পড়ে আর পাঠাগার ছেড়ে আসবে না। তাই আমরা ভাইয়েরাও চাই মা যতদিন পর্যন্ত এ পাঠাগার চালিয়ে যেতে পারে ততদিন এভাবেই চলুক। আমরা কেউ বাধা দিবো না। তবে প্রতি মাসে সবাই ১ হাজার কিংবা ২ হাজার করে টাকা দেই খরচের জন্য।

নারায়ণগঞ্জ জেলা গণগ্রন্থাগারের গ্রস্থাগারিক (লাইব্রেরিয়ান) বলেন,‘শাপলা পাঠাগারটি টিনের তৈরি। যে বই আছে তা খারাপ না। মূলত শাপলা পাঠাগারটি যেখানে গঠিত সেখানে নিম্ন শ্রেণির মানুষ বসবাস করে। যাদের অনেকেই পড়ালেখা জানেন না এমনকি পড়তেও পাড়ে না। এসব কারণে সব সময় পাঠক থাকে না। তবে আমরা মাঝে মাঝে পর্যবেক্ষনে যাই তখন ৫ থেকে ৭ জন থাকে। আবার কোন কোন সময় থাকেও না।’

তিনি আরো বলেন,‘সাফিয়া বেগমের শিক্ষাগত যোগ্যতা তেমন নেই। তারপরও এমন একজন বয়স্ক নারী এ উদ্যোগ নিয়ে পাঠাগারটি চালিয়ে যাচ্ছেন এজন অবশ্যই তিনি ধন্যবাদের প্রাপ্য। এছাড়াও তিনি একজন আদর্শ।’


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও