৩ আশ্বিন ১৪২৫, মঙ্গলবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ১০:২৬ অপরাহ্ণ

নারায়ণগঞ্জে সোনালী আঁশের একাল সেকাল


এস এম শহিদুল্লাহ || লেখক: একজন সমাজকর্মী ও কলাম লেখক।

প্রকাশিত : ০৮:৪০ পিএম, ৫ মার্চ ২০১৮ সোমবার


নারায়ণগঞ্জে সোনালী আঁশের একাল সেকাল

৬ মার্চ জাতীয় পাট দিবস। এ বছর পাট দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘সোনালী আঁশের সোনার দেশ পাট পণ্যের বাংলাদেশ।’

সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশে পাট চাষ হয়ে আসছে। প্রায় চল্লিশ রকমের পাট আছে। তন্মধ্যে এদেশে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সাদা ও তোষা পাটের চাষ বেশি হয়ে থাকে।

পুরাকালে পাট বলতে বাগানের এক উদ্ভিদ বলে গন্য হতো। এর পাতা সবজি বা ওষুধরূপে ব্যবহৃত হতো। অবশ্য এখনও হয়। আজকাল পাটের চাষ হয় মুখ্যত তন্ত্তুর জন্যে।

প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় পাট উৎপাদিত হত। কিন্তু পাটভিত্তিক শিল্প স্থাপনের অনুপ্রেরণা আসে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি থেকে। ১৮২০ খ্রীস্টাব্দে অক্সফোর্ডের নিকটবর্তী এবিংডনে পরীক্ষামূলকভাবে সর্বপ্রথম পাটের আঁশ দিয়ে সুতা পাকানোর চেষ্টা চলে। সেই সময় স্কটল্যান্ডের ডান্ডি অঞ্চলে পাটের সুতা পাকানোর কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। বিশেষ করে ডান্ডির বেলফুর ও মেলড্রাম কোম্পানি পাটের সুতা প্রস্তু করতে সক্ষম হয়। নেপোলিয়নের সময়কার যুদ্ধের পর রাশিয়া হতে লিনেন ও শনের আমদানী বন্ধ হওয়ার পর ১৮২২ খ্রীস্টাব্দে ডান্ডির উৎপাদকগণ পাটের আঁশ হতে সুতা পাকাতে বাধ্য হয়।

এভাবে ডান্ডি থেকে পাটশিল্প বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। তখন পূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশের ওপর কাঁচা পাট সংগ্রহের ভার পড়ে। সেই থেকে পাট ও পাটশিল্পের সাথে নারায়ণগঞ্জ জড়িয়ে পড়ে। তখন নারায়ণগঞ্জে বিদেশি বণিক এবং এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাটের মহাজন ও ফড়িয়াদের আনাগোনাও বেড়ে যায়। এ জনপদ তখন পাট ব্যবসার কারণে মুখরিত হয় ওঠে।

তখন নারায়ণগঞ্জের খ্যাতি ও গুরুত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশের পাটের বাজারজাতকরণ কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এখানকার কাঁচা পাটের ওপর নির্ভর করে ইংল্যান্ডে এক নতুন শিল্পজগৎ গড়ে ওঠে। পাট ব্যবসার সুখ্যাতির জন্য স্কটল্যান্ডের পাট ও লিলেন শিল্পের  সুবিখ্যাত ডান্ডি শহরের সাথে তুলনা করে তখন নারায়ণগঞ্জকে ‘প্রাচ্যের ডান্ডি শহর’ বলা হয়।

সেসময় পাট এদেশের প্রধান রপ্তানী পণ্য হিসেবে গণ্য হয়। পাট বিদেশে রপ্তানী করে প্রচুর বৈদিশিক মুদ্রা অর্জন করে। তখন থেকে পাটকে `সোনালী আঁশ` বলা হয়ে থাকে।

সেকালে ইংরেজরাই সরকারের আনুকূল্যে একচেটিয়া এদেশে পাট ব্যবসা করতো। এ ব্যাপারে গ্রিক বণিকরা ছিল অগ্রগামী। তারাই সর্বপ্রথম ১৮৩০ সালে নারায়ণগঞ্জে রেলী ব্রাদার্স নামে পাটের একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। এই প্রতিষ্ঠানটি বিদেশে কাঁচা পাট রপ্তানি করতো।

অতঃপর কলকাতার কিছু মাড়োয়ারি কোম্পানি যেমন ডেভিড কোম্পানি, আর সিম অ্যান্ড কোম্পানি, বার্ড কোম্পানি, সিনকেয়ার মারে লেজারাস কোম্পানি লি. লেন্ডেন অ্যান্ড কার্ক, এম সার্কাস ইত্যাাদি কোম্পানি এখানে পাট ব্যবসা শুরু করে। ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকে পাটশিল্পের উল্লেখযোগ্য উন্নতির কারণ হলো ভারতীয় মারোয়ারি উদ্যোক্তাদের এই শিল্পে ক্রমবর্দ্ধমান হারে অংশগ্রহণ। তাঁরা একচেটিয়াভাবে পাট ব্যবসা চালিয়ে গেছে।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পাকিস্তানের তৎকালীন পুঁজিপতি আদমজী গ্রুপ, বাওয়ানী গ্রুপ, ইস্পাহানী গ্রুপ, ও দাউদ গ্রুপ নারায়ণগঞ্জে এসে পাটের ব্যবসা শুরু করে। এতে করে ইংরেজ কোম্পানিগুলো মার খেতে থাকে। ফলে ইংরেজ কোম্পানিগুলো তাদের পাট ব্যবসা আস্তে আস্তে গুটিয়ে নেয়।

এদেশের প্রথম পাট মিল ‘দি বাওয়া জুট মিলস লিমিটেড’ ১৯৫১ সালের ১৮ মে এবং পৃথিবীর বৃহত্তম পাট মিল ‘আদমজী জুট মিলস লিমিটেড’ ১৯৫১ সালের ১২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের শীতলক্ষা নদীর তীরে গড়ে ওঠে। আদমজী জুট মিল প্রতিষ্ঠার ফলে নারায়ণগঞ্জের গুরুত্ব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এ মিল ছিল নারায়ণগঞ্জের গর্ব। কোন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান যখন রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসতেন তখন আদমজী জুট মিল পরিদর্শন তাঁর ভ্রমণতালিকায় অন্তর্ভূক্ত থাকতো। এ মিলের আশেপাশের এলাকাটি আজও ‘আদমজী নগর’ হিসেবে পরিচিত।

১৯৬৫ সালের পাক-ভারতের যুদ্ধের আগ পর্যন্ত হিন্দু মারোয়ারি যথা, তোলারাম সুরুজ মল, নাগর মল, চম্পালাল প্রমুখ কোম্পানিগুলো পাট ব্যবসাকে উন্নতির চরম শিখড়ে নিয়ে যায়।

এসময় নগন্য কিছু বাঙালি কোম্পানি অল্প পুঁজি নিয়ে পাট বেচা-কেনায় এগিয়ে আসে। এদের মধ্য উল্লেখযোগ্য কোম্পানি হলো, নারায়ণগঞ্জ ফাইবার্স, ইসলাম জুট বেলিং, মান্নান ব্রাদার্স, ওয়াহেদ জুট, কাজী আজহার ব্রাদার্স, পপুলার জুট এক্সচেঞ্জ, ইস্টার্ন জুট এক্সপোর্টার্স প্রভৃতি। এসময় নারায়ণগঞ্জের কর্মচাঞ্চল্য পূর্ববাংলার অন্যন্যা অঞ্চলের চেয়ে অনেকগুণ বেড়ে যায়। এটি তখন পাটের শহরে পরিণত হয়।

নারায়ণগঞ্জের পাট ব্যবসার সুনাম দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার শত্রু সম্পত্তি আইন জারি করার কারণে মারোয়ারি পাট ব্যবসায়ীদের যাবতীয় সম্পত্তি ও মালামাল শত্রু সম্পত্তি হিসেবে সরকরের অনকূলে চলে যায়। ফলে ব্যবসায়ীরা রাতারাতি ভারতে পাড়ি জমায়। এসময় পাট ব্যবসা আরেকবার মার খায়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাটের ব্যবসায় অনেক উত্থান-পতন ঘটে। তখনকার সরকার জুটমিলগুলো এবং বেসরকারি খাতে পাট বিদেশে রফতানিককরণ প্রক্রিয়াকে জাতীয়করণ করে। এরপর সরকারি বিধিনিষেধের জটিলতায় বিদেশি ক্রেতারা সময়মতো পাট সরবরাহ না পাওয়ায় তারা ‘কৃত্রিম আঁশ’ (সিনথেটিক)-এর প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এসময় বাংলার পাট বিদেশি বাজার হারায়।

যদিও ১৯৭৫ সালের পর সরকার আবার বিদেশে পাট রফতানি করার অনুমতি দেয়। তথাপি সোনালী আঁশের সোনালী অতীত আর ফিরে আসেনি। এসময় নারায়ণগঞ্জে পাটের বাজারেও একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। খুলনা ও দৌলতপুর হতে বিদেশে পাট রপ্তানিকরণ প্রক্রিয়া তুলনামূলক সস্তা ও সুবিধাজনক হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের পাট ব্যবসার কোম্পানিগুলো খুলনায় চলে যায়। তাছাড়া ২০০২ সালের জুন মাসে সরকার এই খাতের সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজি জুট মিল বন্ধ ঘোষণা করে। ফলে নারায়ণগঞ্জ পাটবিহীন শহরে পরিণত হয়। তখন এ শহরের কর্মচাঞ্চল্য স্থবির হয়ে পড়ে।

এক সময় শীতলক্ষা নদীর তীর ঘেঁষে কদমতলী, গোপচর, শীতলক্ষা; মদনগঞ্জ, সোনাকান্দা, বন্দর, নবীগঞ্জ এবং আদমজী হয়ে ডেমরা পর্যন্ত ছিল অসংখ্য পাটের গুদাম। পাটের ব্যবসা না থাকার কারণে এখন আর সে দৃশ্য নেই। আসবে কি আবার সে দৃশ্য ? কে জানে ?

তাই কবি গুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে হয়, ‘শেষ কহে, একদিন সব শেষ হবে, হে আরম্ভ, বৃথা তবে অহঙ্কার তবে। আরম্ভ কহিল, ভাই, যেথা শেষ হয়, সেইখানে পুনরায় আরম্ভ-উদয়।"

আশার কথা, সোনালী আঁশের সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বর্তমানে সরকার পাট পণ্যের বহুবিধ ব্যবহার বাড়ানোর দিকে নজর দিয়েছে। এভাবে পাট পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো হলে পাটের সোনালী অতীত ফিরে না আসলেও উৎপাদিত পাটকে এদেশের অন্যতম কৃষি পণ্য হিসেবে টিকিয়ে রাখা যাবে বলে মনে করি।

আরোও মনে করি, ইতিহাসে নারায়ণগঞ্জের নাম দুটি কারণে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তন্মধ্যে একটি হলো পাটের ব্যবসা আর অপরটি হলো রাজনীতি। ছোট এই শহরে পাটকে কেন্দ্র করে কত যে কর্মযজ্ঞ হয়েছিল তা প্রত্যক্ষদর্শীমাত্রই জানেন। আর রাজনীতির কারণে একসময় বিখ্যাত রাজনীতিবিদদের পদচারণায়ও মুখরিত ছিল এ জনপদ।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ