৮ আশ্বিন ১৪২৫, রবিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৯:০০ অপরাহ্ণ

দূষণে বিপন্ন শীতলক্ষ্যা


এস এম শহিদুল্লাহ || লেখক : একজন সমাজকর্মী ও কলাম লেখক।

প্রকাশিত : ০৯:২৪ পিএম, ১৩ মার্চ ২০১৮ মঙ্গলবার


দূষণে বিপন্ন শীতলক্ষ্যা

আজ ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক নদী রক্ষা দিবস। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ আমাদেরই প্রয়োজনে নদীকে ব্যবহার করে একে দূষণমুক্ত রাখা। কিন্তু আমরা কি তা করতে পারছি ? তা পারছি না। কারণ আমাদের প্রয়োজনে আমরা নদীকে অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করছি। কিন্তু এগুলোকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি না। ফলে নদীগুলো দূষণ হয়ে পড়ছে।

বর্তমানে দূষণের মাত্রা এত বেড়েছে যে, যা আমাদের পরিবেশের জন্য তা হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। দিন দিন দূষণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা ভবিষ্যতে আমাদের জন্য এটি এক মহাসংকট হয়ে দেখা দিবে। তাই এখনই এ ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে। নদীগুলোকে রক্ষায় আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

অধিক সংখ্যক নদী থাকার কারণে বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। এ দেশের সর্বত্র জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নদীগুলো।

বাংলাদেশকে বলা হয় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ, যার সৃষ্টি নদীবাহিত পলি থেকে। পদ্মা , মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশের প্রধান নদ-নদী। ছোট বড় অনেক উপনদী এসে এসব নদীতে মিশেছে। এসব নদ-নদী বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বৈচিত্র্য দান করেছে। বলতে গেলে এ নদীগুলোই বাংলাদেশের প্রাণ। সে জন্যই নদীর সাথে বাঙালির রয়েছে নাড়ীর টান। তাইতো গীতি কবি লিখেছেন- "এই  পদ্মা এই মেঘনা এই যমুনা সুরমা নদী তটে, আমার রাখাল মন গান গেয়ে যায়, এই  আমার দেশ এই আমার প্রেম"।

বাংলাদেশের নদীগুলোর অধিকাংশই উত্তর থেকে দক্ষিণমুখি হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

শীতলক্ষ্যা নদী হলো ব্রহ্মপুত্র নদের প্রধান শাখা নদী। ব্রহ্মপুত্র নদ হিমালয় পর্বতের কৈলাস শৃঙ্গের নিকটে মানস সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রথমে তিব্বতের উপর দিয়ে পূর্ব দিকে ও পরে আসামের ভিতর দিয়ে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

নারায়ণগঞ্জ শহর এ নদীর তীরে অবস্থিত। শীতলক্ষ্যা তার পানির স্বচ্ছতা এবং শীতলতার জন্য একদা বিখ্যাত ছিল। নদীটি প্রায় ১১ কিলোমিটার লম্বা এবং নারায়ণগঞ্জের নিকটে এর সর্বোচ্চ প্রস্থ প্রায় ৩০০ মিটার।

কৃষি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের চাষাবাদ ব্যবস্থা অনেকটাই নদীর সেচ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। কৃষির উন্নয়নে নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নদীমাতৃক এ দেশটি স্মরণাতীতকাল থেকে মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধশালী। আর তাইতো বাঙালিকে বলা হয় `মাছে ভাতে বাঙালি।`

বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শিল্পায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের শিল্প কারখানাগুলো বিভিন্নভাবে নদীর পানি ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া নদীপথে কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে খরচ কম হওয়ায় বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় বড় শিল্প-কারখানা নদী তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠেছে।

বৈচিত্রেভরা এই বাংলাদেশে বয়ে চলেছে অসংখ্য নদী। এসব নদী এদেশকে করেছে সুজলা-সুফলা,শস্য-শ্যামলা। তাই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু আজ অনেক নদী মারাত্মক দূষণের শিকার। এর মধ্যে শীতলক্ষ্যা নদী অন্যতম। শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য, ডাইং ফ্যাক্টরীর বর্জ্য এবং গৃহস্থালী পয়ঃবর্জ্য অনবরত নির্গত হচ্ছে এ নদীতে। এর ফলে শীতলক্ষ্যা নদী  হয়ে পড়েছে মারাত্মক দূষণযুক্ত। পানি হয়ে পড়েছে বিবর্ণ কালো।

গত বছর ২১ অক্টোবর শনিবার `গতি পাচ্ছে না পাঁচ নদী সংস্কার প্রকল্প` শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটিতে বলা হয়- "আতুড়ঘরেই পড়ে আছে রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী সংস্কারের কাজ।---এ পাঁচ নদ-নদী খনন, সংস্কার, দখল ও দূষণমুক্ত করে পরিবেশবান্ধব করার একটি উদ্যোগ গত বছর নিয়েছিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।---প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নৌবাহিনীকে কাজ না দিয়ে সরকারের পদস্থ আমলারা এটিকে ঝুলিয়ে রেখেছেন।" এ সম্পর্কে আমি `শীতলক্ষা নদীকে বাঁচান` শিরোনামে একাধিক কলাম লিখে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি দূষণ মুক্তির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলাম। আশা করেছিলাম প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখবে কিন্তু বাংলাদেশের মহান! আমলাতন্ত্র বলে কথা। প্রকল্পটি আজও আলোর মুখ দেখেনি।

আমরা সংশ্লিষ্ট আমলাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। নদী ও বাংলাদেশ একই সূতোয় গাঁথা। এদেশের মাটি ও মানুষের সাথে নদী ওতপ্রতোভাবে জড়িত। ঠিক তেমনিভাবে আমরা নারায়ণগঞ্জবাসীও শীতলক্ষ্যা নদীর সাথে একই সূতোয় গাঁথা। এক সময় এই শীতলক্ষ্যা নদী থেকেও মাছ ধরা হতো কিন্তু নদী দূষণ-দুর্গন্ধের কারণে মাছ ধরাতো দূরের কথা এখন শীতলক্ষ্যা নদীতে নামাই যায় না।

এক সময় এ নদীর পানি দিয়ে মানুষজন প্রয়োজনীয় গৃহস্থালী কাজ সারতো, নদীপাড়ে বিকেলে ঘুরে বেড়াতো। এখন বেড়ানোতো দূরে থাক দুর্গন্ধের কারণে নদী পারাপার হতে হয় নাকে রুমাল দিয়ে। এ নদীর পানি দিয়ে এখন গৃহস্থালী কাজও করা যায় না।

দূষণের মাত্রা এতই বেড়েছে যে, নদীর পানি ড্রেনের পানির মতো কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। বর্তমানে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি এবং একটি ড্রেনের পয়ঃযুক্ত পানি দুটি পাত্রে রাখলে কেউ বলতে পারবে না কোনটি নদীর পানি।

ড্রেন এবং কারখানার পয়ঃবর্জ্য সরাসরি যাতে নদীতে না পড়ে তার ব্যবস্হা করতে হবে। ঢাকার মতো পয়ঃবর্জ্য শোধন করে নদীতে ফেলতে হবে। তাই অনিতিবিলম্বে শীতলক্ষ্যা নদীসহ পাঁচ নদী সংস্কার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি দূষণ মুক্তির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে নদী বাঁচলে বাঁচবে জনগণ ও দেশ।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ