৫ আশ্বিন ১৪২৫, বৃহস্পতিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ১২:০৯ অপরাহ্ণ

‘বিশুদ্ধ’ পানির জার যাচ্ছে রেস্তোরা ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকে


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:১৯ পিএম, ২১ মার্চ ২০১৮ বুধবার


‘বিশুদ্ধ’ পানির জার যাচ্ছে রেস্তোরা ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকে

নারায়ণগঞ্জের রেস্তোরা থেকে শুরু করে ফুটপাতের টংজাতীয় দোকানেও এখন জারভর্তি ‘বিশুদ্ধ’ পানি বিক্রি হয়। গ্লাস প্রতি দাম এক টাকা। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে সকল ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিকেও যাচ্ছে জারভর্তি ‘বিশুদ্ধ’ পানি। কিন্তু আসলেই এই পানি কতটা নিরাপদ, না তা বোধহয় কেউই জানেন না।

লাইসেন্স ছাড়াই নারায়ণগঞ্জে চলছে বেশীরভাগ ‘বিশুদ্ধ পানি’ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। লাইসেন্স বাতিল এবং ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে সিলগালা ও জরিমানা আদায়ের পরেও থামছেনা এসকল ‘বিশুদ্ধ পানি’ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্য। লাইসেন্স থাক বা না থাক এ ধরনের সবগুলো পানীয় জল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান একই অভিযোগে অভিযুক্ত। কোনোটিতেই পুরোপুরি স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পানি পরিশোধন করা হয় না।

বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ‘অর্থাভাবে’ তারা পানির মানের ওপর যথাযথ নজরদারি করতে পারে না। একারনে কোন প্রক্রিয়া ছাড়াই ওয়াসার পাইপ লাইনের পানি চুরি করে, নালা নর্দমার পানি আর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় নলকূপ, পুকুর, খালের পানি বোতলজাত করে বিশুদ্ধ পানি বলে বাজারজাত করা হচ্ছে।

বিশুদ্ধ মোড়কে দূষিত পানি
শিল্প ও বাণিজ্যের নগরী নারায়ণগঞ্জে জারের পানির প্রচুর চাহিদা তৈরি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শহর এলাকায় রয়েছে অন্তত ৮০টি হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুট ও চাইনিজ রেস্তোরা। এছাড়া শহরের বাহিরেও অসংখ্য খাবার হোটেল ও রেস্তোরা রয়েছে। এছাড়া অফিস আদালত, স্কুল-কলেজ, বসতবাড়িসহ প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও জারের পানির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শহরেই অন্তত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে অর্ধশতাধিক। ফলে এক রমরমা পানির বাজার তৈরি হয়েছে। সে বাজারকে কেন্দ্র করে বৈধ পানির কারখানার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের অলিগলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কারখানা। যার সঠিক পরিসংখ্যান নেই বিএসটিআই কিংবা জেলা প্রশাসনের কাছে।

অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। অতি মুনাফার আশায় এসব কারখানার মালিক পানি শোধন না করেই ওয়াসার লাইন থেকে সরাসরি নোংরা দূষিত পানি জারে ভরে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। মিনারেল ও বিশুদ্ধ পানির নামে বোতলজাত পানি কিনে ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি মুখোমুখি হচ্ছেন স্বাস্থ্য ঝুঁকির। এ ফিল্টার পানি কারখানাগুলোর পানির প্রধান উৎস হল ঢাকা ওয়াসার চোরাই পানির লাইন। অভিযোগ রয়েছে এসব পানির লাইন নেয়া হয় ওয়াসার অসাধু কর্মচারীদের মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিয়ে। অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায় চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রথমে বড় ট্যাংক থেকে পাইপের সাহায্যে ওয়াসার পানি ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নীল রঙের জারগুলোতে ভরা হয়। তারপর এতে ফিটকিরি অথবা ট্যাবলেট মিশিয়ে পানিকে দুর্গন্ধমুক্ত করা হয়। এরপর ট্যাগ না করে প্লাস্টিকের তৈরি মুখ দিয়ে জারের মুখ আটকানো হয়।

এরপর বিভিন্ন নামকরা ব্র্যান্ডের স্টিকার, মনোগ্রাম, ব্যাচ নম্বর লাগিয়ে ভ্যান অথবা পিকআপযোগে হোটেল, রেস্তোরা, অফিস, দোকান ও বাসাবাড়িতে সরবরাহ করে। অনেকে আবার জারের গায়ে কিছুই না লাগিয়ে বাজারজাত করছে। হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দিয়ে জারগুলো জীবানুমুক্ত করার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও খরচ বাঁচাতে শুধু হাতে ধুয়ে জারগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে। ফলে জারে জীবানু থেকে যাচ্ছে।

কম দাম হওয়ায় আগ্রহ প্রতিষ্ঠানের মালিকদের
এভাবে পানি উৎপাদনে ১৯ লিটারের একটি জারের পেছনে খরচ পড়ে ৮-১০ টাকা। কিন্তু এরপর তারা হোটেল রেস্তোরাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতি জার পানি বিক্রি করে ১৫-২০ টাকায়। এভাবে প্রতি গ্লাস পানি উৎপাদনের খরচ পড়ে মাত্র ২০ পয়সা। একটি জার থেকে ৮০ গ্লাস পানি পাওয়া যায়। অথচ ভোক্তারা প্রতি গ্লাস পানি বিক্রি ক্রয় করছে এক টাকায়। অন্যদিকে যথাযথ নিয়ম মেনে প্রতি জার পানি উৎপাদনে খরচ পড়ে ২৮ টাকা। অবৈধ ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ কম পড়ায় বিভিন্ন নামি ব্র্যান্ডের চেয়ে কিছু কম টাকায় পানি সরবরাহ করে বাজার দখল করে নিচ্ছে। ফলে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখে পড়ছে এবং গুণগত মান বজায় রাখতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। দূষিত পানির ব্যবসায় স¤প্রসারণের পেছনে দায় রয়েছে নারায়ণগঞ্জের ছোট-বড় হোটেল-রেস্তোরা, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের। তারা খরচ কমাতে অবৈধ পানির উৎপাদকদের কাছ থেকে কম টাকার বিনিময়ে জেনে শুনে দূষিত পানি ক্রয় করছে।

লাইসেন্স বাতিল, সিলগালার পরেও থেমে নেই দৌরাত্ম্য
বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, ঞ্জের ১৩টি ‘বিশুদ্ধ পানি’ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করে বিএসটিআই। এগুলো হল নারায়ণগঞ্জ শহরের জামতলার আরডি ফুড এ্যান্ড বেভারেজ, পশ্চিম দেওভোগের তুষার ওয়াটার প্ল্যান্ট, ফতুল্লার ইসলাম এ্যান্ড সন্স, এসআরপি ফুড প্রোডাক্টস, আইএমএম ইন্টারন্যাশনাল, পাগলার কেআর সন্স ফুডস এ্যান্ড বেভারেজ, সিদ্ধিরগঞ্জের সিদ্দিক ফুড এ্যান্ড এগ্রোবেজ ইন্ডা. লি., এএসটি বেভারেজ লি., ফেয়ার ফুড প্রোডাক্টস, ন্যাশনাল ফুডস এ্যান্ড বেভারেজ, মেগা ফুডস এ্যান্ড কেমিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজ, এমএএইচ ফুড এ্যান্ড বেভারেজ, সোনারগাঁয়ের রাতুল এন্টারপ্রাইজ। গত ২৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় ‘আড্ডা’ সংলগ্ন ‘মেসার্স আবেদীন কনজ্যুমার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ’ নামের একটি পানি ফিল্টারিং কারখানাকে ২৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড ও কারখানাটি সিলগালা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে এরপরেও তারা প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে পানি বিক্রি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ