৬ কার্তিক ১৪২৫, সোমবার ২২ অক্টোবর ২০১৮ , ৬:২২ পূর্বাহ্ণ

UMo

বজ্রপাতের ঝুঁকি ঠেকাতে ব্যবস্থা নাই নারায়ণগঞ্জে


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:১২ পিএম, ২০ এপ্রিল ২০১৮ শুক্রবার


বজ্রপাতের ঝুঁকি ঠেকাতে ব্যবস্থা নাই নারায়ণগঞ্জে

বজ্রপাতে নারায়ণগঞ্জে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। মৌসুমি ঝড়-বৃষ্টির শুরুতে বজ্রপাত মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত কয়েকদিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাত আঘাত হানতে শোনা গেছে তবে মৃত্যুর কোন খবর আসেনি।

জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ফতুল্লা, বন্দর, আড়াইহাজার, সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ। বর্তমানে মৃত্যুর পাশাপাশি বহু মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়, বৈদ্যুতিক পাম্প নষ্ট হয়ে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়, ভারী বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, বজ্রঝড়ে ঘর-বাড়ি ধ্বংস হয়, ফসলের ক্ষতি হয় এবং বহু গবাদিপশু মারা যায়। মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ মারা যায় কৃষি জমিতে, হাওরে, পুকুরে বা নদীতে বিভিন্ন প্রকার কার্যরত অবস্থায়। অথচ জেলায় এই বজ্রপাতের ঝুঁকি ঠেকাতে কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি প্রশাসনকে। এমনকি প্রচার প্রচারনায়ও পিছিয়ে আছে জেলা দুর্যোগ কর্তারা।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালে শুধুমাত্র এপ্রিল-মে মাসেই বজ্রপাত বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। ২০১৬-২০১৭ সালের তথ্য এখনো পাওয়া না গেলেও আবহাওয়াবিদরা ধারণা করছেন, শুষ্ক মৌসুমে বজ্রপাতের পরিমাণ ২০১৫ সালের চাইতে বেড়েছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তাপমাত্রা যখন চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে তখন বজ্রপাতের হার সাড়ে ১২ শতাংশ বাড়বে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত জাতীয় পরিকল্পনায় মোট ১২টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা উল্লেখ থাকলেও জীবনসংহারী বজ্রপাতের কথা দুই বছর আগেও ছিল না। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বজ্রপাতের বিপর্যস্ততায় প্রাকৃতিক এই আপদটিকে ‘দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।

বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আশির দশকে মে মাসে গড়ে ৯ দিন বজ্রপাত হতো। অথচ ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সারা দেশে পাঁচ হাজার ৭৭২টি বজ্রপাত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১১ সালে ৯৭৮টি, ২০১২ সালে ১২১০টি, ২০১৩ সালে ১৪১৫টি, ২০১৪ সালে ৯৫১টি ও ২০১৫ সালে ১২১৮টি বজ্রপাতের কথা বলা হয়েছে। বিগত ২০০০ হতে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গড়ে প্রতিবছর ১৫১ দিনে ৪৬৮টি বজ্রপাত হয়েছে, যা ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত গড়ে ১৪৫ দিনে ৪৩৯টি বজ্রপাত অপেক্ষা বেশি।

বজ্রপাতে মৃত্যুর সঠিক পরিসংখ্যান আজ অবধি কোনো সংস্থা বা সরকারের কোনো বিভাগ হতে পাওয়া দুষ্কর, যদিও ‘ডিজাস্টার ফোরাম’ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বজ্রপাতে মৃত্যুর সংবাদ অনুযায়ী কিছুটা তথ্য সংগৃহীত রাখে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ২০১০ সালে ১২৪ জন, ২০১১ সালে ১৭৯ জন, ২০১২ সালে ৩০১ জন, ২০১৩ সালে ২৮৫ জন, ২০১৪ সালে ২১০ জন, ২০১৫ সালে ২৭৪ জন এবং ২০১৬ সালে প্রায় ৩৫০ জন বজ্রপাতে মারা গেছে। বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, ২০১৩ হতে ২০১৬ পর্যন্ত উপরোল্লিখিত মৃত্যুসংখ্যার যথাক্রমে ১২৮ জন, ৭৯ জন, ৯১ জন ও ১৩২ জন শুধুমাত্র মে মাসেই বজ্রাঘাতে মারা গেছে।  তন্মধ্যে ২০১৩ সালের ৫-৬ মে ৩৩ জন, ২০১৫ সালের ২-৩মে ১৯ জন এবং ২০১৬ সালের ১১-১২মে ৫৭ জনের মৃত্যু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রাকৃতিক কারণে এতো অল্প সময়ে এত লোকের মৃত্যুর নজির সাম্প্রতিক সময়ে নেই। বজ্রপাতের মতো মৌসুমি দুর্যোগে এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়া খুবই মর্মান্তিক। এ অবস্থায় বজ্রপাত থেকে মানুষকে নিরাপদে রাখতে সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই।

বজ্রপাতের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রাথমিক সম্ভাব্য কারণগুলো মধ্যে রয়েছে গাছ কেটে ফেলা, মোবাইল ফোনের ব্যবহার, জলাভূমি ভরাট করা, নদী শুকিয়ে যাওয়া, কলকারখানা ও মোটরগাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মোবাইল ফোন ও বৈদ্যুতিক টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি কাজে ভারী যন্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদি হতে পারে।

ভয়ংকর ও প্রাণসংহারী দুর্যোগের হাত থেকে মানুষকে রক্ষায় সচেতন করার কোনো বিকল্প আপাতত নেই। এই প্রচেষ্টায় বজ্রঝড়ের সময় বাড়ির ভেতরে অবস্থান করা, উঁচু ভবনে আর্থিং-এর ব্যবস্থা করা, বসতবাড়ির চারপাশে উঁচু গাছ লাগানোসহ প্রচুর বৃক্ষরোপণ, কৃষিতে ভারী যন্ত্রাংশ ও কীটনাশকের ব্যবহার সীমিত রাখার চেষ্টা করতে হবে।

বজ্রপাতের মতো এমন জীবনসংহারী ঘটনায় আর নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই। পরিবেশ দূষণ রোধ, বৃক্ষনিধন রোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানামুখী কর্মসূচি থাকা জরুরি। আর মানুষ একটু সচেতন হলেই বজ্রাঘাতে মৃত্যুর হার অনেক কমে আসবে। তাই বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা এখনই চালানোর দাবি ভুক্তভোগীদের।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ