১৬ জুন : পা হারানো চন্দন-রতনের দুঃসহ জীবন

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৬:১৪ পিএম, ১৫ জুন ২০১৮ শুক্রবার

১৬ জুন : পা হারানো চন্দন-রতনের দুঃসহ জীবন

২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাড়া শহীদ মিনার ঘেষা আওয়ামী লীগ অফিসে তৎকালীন এমপি শামীম ওসমানের গণসংযোগ কর্মসূচিতে সাংগঠনিক কর্মকান্ডে জড়িত নেতৃবৃন্দরা জড়ো হতে থাকে। রাত ৭টার মধ্যে পুরো অফিস লোকে লোকারন্য হয়ে পড়ে। রাত পৌনে ৯টায় বিকট শব্দে বিষ্ফোরিত হয় বোমাটি। হামলায় শামীম ওসমান সহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। তার ব্যক্তিগত সচিব চন্দন শীল, যুবলীগ কর্মী রতন দাস দুই পা হারিয়ে চিরতরে বরণ করেছে পঙ্গুত্ব।

২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন চন্দন। ঘাতকের বোমা তাঁর দুটি পা চিরকালের জন্য কেড়ে নিলেও নেভাতে পারেনি জীবন প্রদীপ। তিনি বলেন, ‘বোমা হামলার পরদিন গুরুতর আহত আমি ও রতন দাস যখন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছি, সেদিন নারায়ণগঞ্জে আমাদের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। আর এ কারণেই ভুল করে অনেকে এখনো নিহতের সংখ্যা ২২ উল্লেখ করেন।

তিনি আরো বলেন, মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি, তাই একে আর ভয় পাই না। যারা চাষাঢ়াসহ সারা দেশে এ বর্বরোচিত বোমা হামলা চালিয়েছে, আমৃত্যু তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাব।`

চন্দন শীল বলেন, `২০০১ সালের বোমা হামলার ঘটনার পর অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। টাকার অভাবে জার্মানিতে পুরোপুরি চিকিৎসা করাতে পারিনি। যতটুকু হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন এমপি শামীম ওসমানের বদৌলতে। জার্মানি থেকে ফিরে ভারতে চিকিৎসারত অবস্থায় আর্থিক সংকটে পড়েছি। এমনও দিন গেছে তিন বেলার জায়গায় দুই বেলা খেয়েছি। বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়েছে। দেশে ফিরে আসার পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বিভিন্নভাবে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছে।`

স্ত্রী সুতপা শীল রমা বলেন, `পা হারালেও ও তো (চন্দন) বেঁচে আছে। আমার সিঁথির সিঁদুর তো আর মুছে যায়নি। এতেই আমি সুখী।`

চন্দন শীল বলেন, `আমার চোখের সামনে তরতাজা ছেলেগুলোর মৃত্যু ঘটল, কিছুই করতে পারলাম না। মশু, বাচ্চু দরাজ গলায় চমৎকার গান করত। মাঝেমধ্যে আমি গলা মেলাতাম। আর কখনোই শুনব না তাদের প্রিয় গানগুলো।`

নারায়ণগঞ্জে বোমা হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন রতন। কিন্তু পা দুটোকে সারা জীবনের জন্য হারাতে হয়েছে। হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয়েছে। কৃত্রিম পা লাগিয়ে কোনোমতো চলাফেরা করেন।

রতন কুমার দাস বলেন, প্রতি সপ্তাহের শনি ও সোমবার সাধারণ মানুষের কথা শুনতেন সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। সভার শেষ মুহূর্তে পায়ের একটু সামনে প্রচন্ড বিস্ফোরণ। চোখের সামনে আগুনের গোলা। কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। কোমরের নিচ থেকে দুই পা বিচ্ছিন্ন। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। শরীর থেকে মাংস বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল ক্লাবের সামনে। রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। নিথর দেহের পাশে আহতদের গোঙানির শব্দ যেন মৃতপুরী। পা নেই তবু সংজ্ঞা হারাইনি। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে দাদা স্বপন কুমার দাসকে জানাই, দাদা আমাকে বাঁচাও। আমি বোধহয় আর বাঁচব না! তাড়াতাড়ি এসো। আমার রাজনৈতিক সঙ্গী সাইফুল হাসান বাপ্পী আর আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই বাপ্পীর জীবন প্রদীপ নিভে গেল। আমি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, মৃত্যু শুধু সময়ের ব্যাপার। তবে মানুষের ভালোবাসায় বেঁচে গেলেও হারাতে হয় দুটি পা। সেই ঘটনার পর আমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শামীম ওসমান ভাই ও আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা জার্মানিতে পাঠান। এখন কৃত্রিম পা নিয়ে কিছুটা চলাফেরা করছি। তিনি বলেন, চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এসে আমাদের ওপর হামলা এবং মামলা করে বাড়িঘরছাড়া করে। বিভিন্নভাবে হয়রানি করে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও