ধর্ষণ গণধর্ষণের আড়ালে খুনের ঘটনা বাড়ছে

৫ ভাদ্র ১৪২৫, সোমবার ২০ আগস্ট ২০১৮ , ১২:৩৯ অপরাহ্ণ

ধর্ষণ গণধর্ষণের আড়ালে খুনের ঘটনা বাড়ছে


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:০৪ পিএম, ২৫ জুন ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০৩:০৪ পিএম, ২৫ জুন ২০১৮ সোমবার


ধর্ষণ গণধর্ষণের আড়ালে খুনের ঘটনা বাড়ছে

নারায়ণগঞ্জে ধর্ষণ গণধর্ষণের প্রবণতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। আর এসব অপরাধের তথ্য ধামাচাপা দিতে অপরাধীরা ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ধর্ষণ কিংবা গণধর্ষণের মত অপরাধ আড়াল করতে গিয়ে খুনের ঘটনা ঘটছে। এতে করে এক অপরাধকে আড়াল করতে গিয়ে অন্য অপরাধের হাতছানিতে সারাজীবন কলঙ্কের বোঝা সহ মৃত্যুদন্ডের মত শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে। আর সচেতনার অভাবে দিন দিন এসব অপরাধের চিত্র বেড়ে চলেছে।

এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জে ১০ বছরের শিশুকে গণধর্ষণ শেষে হত্যা মামলায় চার আসামীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। ১১ জুন সকালে নারায়ণগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক জুয়েল রানা এ আদেশ দেন। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তরা হলো নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক এলাকার সুমন, আলামিন, আবুল কালাম, শাহাদাত।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের পিপি রকিবউদ্দিন জানান, ২০০৩ সালের ১৩ জানুয়ারী সন্ধ্যায় সদর উপজেলার আলীরটেক এলাকার আলী আকবরের ১০ বছর বয়সী মেয়ে খাদিজাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায় একই এলাকার চার যুবক। পরদিন ১৪ জানুয়ারীর সকালে বাড়ির পাশে একটি সর্ষে ক্ষেত থেকে খাদিজার লাশ উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় খাদিজার বড় ভাই আনসার আলী বাদি হয়ে চারজনকে আসামী করে সদর থানায় হত্যা মামলা করে। ঘটনার পর থেকেই চারজন পলাতক থাকে। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি।

এই মৃত্যুদন্ডের মাত্র কিছুদিন পূর্বে নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্টকর্মীকে অপহরণের পর ধর্ষণ শেষে হত্যার ঘটনায় তিনজনকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেছে আদালত। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকরের আদেশ দেওয়া হয়েছে। তিনজনের প্রত্যেককে ১লাখ টাকা করে অর্থদন্ড করা হয়। জরিমানার টাকা নিহত পরিবারকে দিতে বলা হয়েছে। একই মামলায় খালাস পেয়েছে অপর চার আসামী। রায় ঘোষণার সময়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৩ আসামী আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীরা হলেন বন্দর উপজেলার কুশিয়ারা এলাকার নূর উদ্দিনের ছেলে নাসির উদ্দিন বিটল (৪০), আবু মিয়ার ছেলে ছফুন (৩৪), মৃত আব্দুস সালামের ছেলে খোকন মিয়া (৩২)। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের স্পেশাল পিপি রাকিবউদ্দিন আহমেদ রাকিব জানান, ২০০৮ সালের ১২ মার্চ রাতে রাজা মিয়ার মেয়ে গার্মেন্টস কর্মী আসমা আক্তার ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে বন্দরের কুশিয়ারা ভদ্রাসন সরবত বাড়ির সামনে থেকে আসামীরা আসমাকে অপহরণ করে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে তাকে হত্যা করে লাশ মাটিচাপা রাখে। 

এই দন্ডপ্রাপ্তির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজার উপজেলার পরকীয়া প্রেম করে গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। ওই গৃহবধূ নিজে বাদী হয়ে সম্প্রতি থানায় এ মামলাটি করেন। ধর্ষক মাসুদ (২৬) উপজেলার কৃষ্ণপুরা এলাকার জাহিদুলের ছেলে। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নারায়ণগঞ্জের আদালতে পাঠিয়েছেন।

পুলিশ জানায়, আড়াইহাজার পৌরসভার নাগেরচর এলাকার শাহাদাতের ছেলে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে ১০ বছর আগে বিয়ে হয় উক্ত মামলার বাদীর। তবে ৭ বছর ধরেই বাদীর সঙ্গে প্রবাসী মাসুদের ফেসবুকে কথা আদান প্রদান হয়ে আসছিল। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গৃহবধূর বেশ কিছু অশ্ল¬ীল ছবিও মাসুদের কাছে ছিল। এরই সূত্র ধরে সম্প্রতি বিদেশ থেকে দেশে ফিরেন। তার ডাকে সাড়া না দেয়ায় ইন্টারনেটে ওই ছবিগুলো ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে বেশ কয়েকবার তাকে ধর্ষণ করা হয়।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ষষ্ঠ শ্রেনির শিক্ষাথীকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ হত্যার ঘটনায় ওই শিক্ষার্থীর বাবা বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

ওই শিক্ষার্থীর বাবা রাকিব হোসেন জানান, তার মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেনির শিক্ষার্থী। গত ২ জুন তার মেয়ে রাত ১০ টায় কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তীতে ওই শিক্ষার্থীকে বিভিন্নস্থানে খোঁজাখুজির পরও তাকে পাওয়া যায়নি। গত ৩ জুন লোকজনের কাছে জানতে পারে তার মেয়ে ইছাপুরা খালের পাশে পড়ে আছে। পরে তিনি তার মেয়েকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান। তার মেয়েকে তাকে বলে আমি কেরির বড়ি খেয়েছি আমি আর বাচবো না আমাকে মাফ করে দাও। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষন পর ওই শিক্ষার্থী মারা যায়। পরবর্তীতে ওই শিক্ষার্থী জানতে পারে সাব্বির হোসেনসহ অজ্ঞাত ২ থেকে ৩ জনের সহায়তায় ইছাপুরা ব্রিজের নিচে নিয়ে গিয়ে তার মেয়েকে ধর্ষণ করে। পরে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য তার মেয়েকে জোর পূর্বক বিষপান করায়। এ ঘটনায় ঘটনায় বাবা রাকির মিয়া বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন।

তবে এই ধর্ষনের ঘটনা অন্য সব ঘটনা থেকে একটু আলাদা। কেননা, স্বামীর হাত পা বেঁধে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বামীর সামনেই এক গৃহবধূকে গণধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে । এ ঘটনায় ওই গৃহবধু বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন।

১৪ মে সোমবার দুপুরে সালাউদ্দিন নামে ধর্ষককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর আগে গত ১১ মে ভোর রাতে তারাব পৌরসভার দিঘী বরাব বৌবাজার এলাকায় ঘটে এ গণধর্ষণের ঘটনা। গ্রেফতারকৃত সালাউদ্দিন গণধর্ষণের সত্যতা স্বীকার করেছেন। সালাউদ্দিন দিঘী বরাব বৌবাজার এলাকার দ্বীন ইসলামের ছেলে।

রূপগঞ্জ থানার পরিদর্শক শহিদুল আলম জানান, ওই গৃহবধূর স্বামীর বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার কছাকাটা থানার বেগুনিপাড়া এলাকায়। তারা স্বামী স্ত্রী স্থানীয় একটি মেলামাইন কারখানায় কাজ করে উপজেলার তারাব পৌরসভার বরাব বাজার এলাকায় বসবাস করে আসছে। গত ৬ মে গৃহবধূ সহ তার স্বামী গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যান। বেড়ানোর শেষে গ্রামের বাড়ি থেকে ১০মে রওনা দিলে ১১ মে ভোর রাতে রূপগঞ্জের বরাব বাসস্টেশনে এসে নামেন। পরে দিঘীবরাব বৌবাজার এলাকায় যাওয়ার জন্য রিকশা বা কোন প্রকার বেবিট্যাক্সি না পেয়ে পায়ে হেটেই রওনা হন।

পরে দিঘীবরাব বৌবাজার এলাকায় পৌছা মাত্র মোগরাকুল এলাকার মৃত কুদ্দুস আলীর ছেলে আবুল হাসেম ও দিঘী বরাব বৌবাজার এলাকার দ্বীন ইসলামের ছেলে সালাউদ্দিন তাদের স্বামী স্ত্রীর পথ গতিরোধ করেন। এক পর্যায়ে স্বামীকে হাত-পা বেঁধে ফেলে। পরে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ওই গৃহবধূকে সালাউদ্দিন ও আবুল হাসেম গণধর্ষণ করে। শুধু তাই নয়, গণধর্ষণের পর ভয় দেখিয়ে স্বর্ণের নাক ফুল ও দুটি মোবাইল ফোন লুটে নেয়। এসময় তাদের ডাক চিৎকারে পার্শবর্তী লোকজন এগিয়ে আসলে ধর্ষকরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরে ওই গৃহবধূকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হয়। ওই পুলিশ পরিদর্শক আরো বলেন, গ্রেফতারকৃত সালাউদ্দিন গণধর্ষণের সত্যতা স্বীকার করেছেন। বাকি আসামীকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এর আগে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে একটি স্পিনিং মিলের এক নারী শ্রমিককে পরিত্যক্ত ইটাভাটায় আটকে রেখে ধর্ষণ ঘটনায় ধর্ষক আল-আমিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার সাত দিন পর ১২ মে ভোরে মাধবদী থানার কাঠালিয়া ইউনিয়নের চৌঘরিয়া এলাকা পুলিশ গ্রেফতার করে। গ্রেফতার আল-আমিন ওই এলাকার আফাজউদ্দিন মিয়ার ছেলে।

এদিকে বন্দরে ১২ বছরে এক প্রতিবন্ধী কিশোরী ধর্ষণের ঘটনার ২ দিন পর থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। সম্প্রতি ধর্ষিতা মা বাদী হয়ে বন্দর থানায় এ মামলা দায়ের করেন। ধর্ষণের ঘটনার পর থেকে লম্পট ধর্ষক ভটভটি চালক আবুল হোসেনসহ (৪০) তার পরিবার পলাতক রয়েছে। পুলিশ ধর্ষিতাকে উদ্ধার করে মেডিকেল পরীক্ষার জন্য নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করেছে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ৩ মে বৃহস্পতিবার সকালে বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নস্থ নরপরদী এলাকায় ১২ বছরে প্রতিবন্ধী কিশোরী মেয়েকে বিস্কুট দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে মিয়ারবাগস্থ আব্দুল খালেক মিয়ার লম্পট ছেলে আবুল হোসেন তার বসত ঘরে নিয়ে যায়। পরে লম্পট ভটভটি চালক আবুল হোসেন প্রতিবন্ধী কিশোরীকে একা পেয়ে ধর্ষণ করে। পরে ধর্ষিতা বিষয়টি তার পরিবারকে জানায়। ধর্ষণের ঘটনার ২ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর ধর্ষিতার মা বাদী হয়ে রোববার রাতে বন্দর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। ধর্ষণের ঘটনার পর থেকে লম্পট ভটভটি চালক আবুল হোসেন ও তার পরিবার বাড়ী ঘরে তালা ঝুঁলিয়ে রাতের আধাঁরে অজানার উদ্যেশে পালিয়ে যায়। এ ব্যাপারে থানায় মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ লম্পট ধর্ষককে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্নস্থানে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যহত রেখেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা এখন মহামারি আকার ধারণ করছে। ধীরে ধীরে এর প্রবণতা বেড়ে চলেছে। এতে করে মানবতার অবক্ষয় ঘটছে। নিতাপত্তাহীনতা ভুগছে নারী সমাজ। তবে অসচেতনতা ও বোপরোয়া চলাফেলার কারণে এর প্রবণতা আরো বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এসব অপরাধের আড়ালে খুনের মত ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠছে। এতে করে মান সম্মানের সাথে জীবনটুকু হারাতে হচ্ছে ধর্ষিতাকে।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ