৬ কার্তিক ১৪২৫, সোমবার ২২ অক্টোবর ২০১৮ , ৬:২০ পূর্বাহ্ণ

UMo

মাদক বিরোধী অভিযানে শিথিলতা : ফিরেছে টপ টেনের অনেকেই


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৩২ পিএম, ৩০ জুন ২০১৮ শনিবার


মাদক বিরোধী অভিযানে শিথিলতা : ফিরেছে টপ টেনের অনেকেই

গত মে মাসের মধ্যভাগে সারাদেশের ন্যায় নারায়ণগঞ্জেও শুরু হয় মাদক বিরোধী সাড়াশি অভিযান। তবে গত দেড় মাসে নারায়ণগঞ্জে গ্রেফতার হয়নি কোন আলোচিত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। গত ৩৬ দিনে নারায়ণগঞ্জে ঘটেনি কোন বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও। নারায়ণগঞ্জের ‘টপ টেন লিস্ট’ ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের ৭টি থানার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই অধরা। গত এক মাসে আলোচিত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের বেশীরভাগই আইনের আওতায় না আসায় মাদক বিরোধী অভিযানে যেন অনেকটাই শিথিলতা দেখা দিয়েছে বলে অভিমত সচেতন নারায়ণগঞ্জবাসীর। আর এ সুযোগে এলাকায় ফিরছে টপ টেন লিস্টের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরাসহ ৭টি থানার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের শিথিলতার সুযোগে তারা এলাকায় ফিরে আবারো অনুগামীদের সংগঠিত করছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

জানা গেছে, প্রতিটি জেলার শীর্ষ ১০ মাদক ব্যবসায়ীর নামের একটি তালিকা তৈরী করেছে সরকার। তালিকায় মাদক ব্যবসায়ীদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা, মামলার সংখ্যা, ব্যবসার ধরন এবং কারও কারও ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মুঠোফোনসহ জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরও উল্লেখ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী বজলুর রহমান ওরফে বজলু মেম্বার রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় থাকেন। তার বাড়ি রূপগঞ্জের চনপাড়া এলাকায়। বন্দর থানার মদনপুর গোকুল দাসেরবাগ এলাকার কবীর মোবাইল ফোনে ইয়াবার কারবার চালাচ্ছেন দীর্ঘদিন।

জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা শুধু মাদক ব্যবসায়ী নয়, এদের অনেকের কাছে বিপুল সংখ্যক অবৈধ অস্ত্রও আছে, যার প্রমাণ মিলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময়। গ্রেফতার অভিযানের সময় এরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে উল্টো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে রীতিমতো বন্দুকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। সিদ্ধিরগঞ্জে ১৫ মে ভোরে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে রাজ মহল রিকন নামের মাদক পাচারকারী নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে র‌্যাবের তিন সদস্য। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পাইনাদি এলাকায় ওই বন্দুকযুদ্ধের পর ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে দুই রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশী পিস্তল, দশ হাজার পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট এবং নগদ দুই লক্ষাধিক টাকা। এছাড়া একটি ট্রাকও আটক করা হয়েছে। নিহত রিকন মেহেরপুর জেলা সদরের কাঁসারী পাড়া এলাকার নিহাজউদ্দিন তুফানের ছেলে। ২২ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শিমুলতলী এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ক্রসফায়ারে পড়ে বাচ্চু খান (৩৫) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। র‌্যাবের দাবি নিহত বাচ্চু গাজীপুর ও টঙ্গী এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৯টির বেশি মাদক মামলা রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি প্রাইভেটকার ও এতে থাকা প্রায় ৯ হাজার ইয়াবা বড়ি, দুই রাউন্ড গুলিভর্তি একটি বিদেশী পিস্তল ও গুলি খালি খোসা। গত ২৪ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জের দক্ষিণ নিমাইকাসারী ক্যানেলপাড় এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সেলিম ওরফে ফেন্সি সেলিম (৩২) নামের এক মাদক বিক্রেতা নিহত হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি শ্যূটার গান, ৬ রাউন্ড গুলি, একটি ছুরি, ৫ বোতল ফেন্সিডিল ও ৬শ’ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসিসহ ৬ পুলিশ সদস্য আহত হন।

গেল মে মাসের শেষ দিকে মাদক বিরোধী সাড়াশি অভিযানের ফলে গা ঢাকা দেয় শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা। জানা গেছে, জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ৭টি থানার প্রতিটিতেই শীর্ষ মাদক বিক্রেতার তালিকায় রয়েছে ৩০ থেকে ৪০ জন। এছাড়া প্রতিটি থানা এলাকায় খুচরো বিক্রেতা রয়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ জন। এর মধ্যে অনেক শীর্ষ মাদক বিক্রেতা গ্রেফতারের পর জেলহাজতে রয়েছে। ইতিমধ্যে ছয়টি সংস্থা পৃথকভাবে তাদের মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা সরকারের জমা দিয়েছে। এসব তালিকা থেকে একটি সমন্বিত তালিকা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে ঘোষণা দিয়ে মাদক নির্মূলে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করে র‌্যাব-পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। প্রতিটি জেলার শীর্ষ ১০ মাদক ব্যবসায়ীর নামের একটি তালিকা তৈরী করেছে সরকার। অভিযান শুরুর পরে বেশীরভাগ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ক্রসফায়ার আতঙ্কে গা ঢাকা দিয়েছিল।

এদিকে গত ২৪ মে এর পরে নারায়ণগঞ্জে মাদক বিরোধী তেমন কোন সাড়াশি অভিযান দেখা যায়নি। এর মধ্যে কক্সবাজারের আলোচিত কাউন্সিলর একরাম বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনাটি দেশজুড়ে ছিল আলোচিত। আর ওই ঘটনার পরেই মূলত সারাদেশের ন্যায় নারায়ণগঞ্জেও অভিযানে শিথিলতা দেখা যায়। যে কারণে ইতিমধ্যে বেশ কিছু শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী এলাকায় ফিরে আসতে শুরু করেছেন। যার মধ্যে টপ টেনের অন্যতম বন্দরের ধামগড় ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের মেম্বার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী কবির হোসেন ওরফে ফেন্সী কবিরকে এলাকায় প্রকাশ্যেই দেখা গেছে বলে জানা গেছে। সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ম্যানেজ করে এলাকায় ফিরেছে বলেও সর্বত্র প্রচার করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী জানান, কবির হোসেন ওরফে ফেন্সী কবিরের বাবা ছিলেন দাড়োয়ান ও মা ফেরী করে কাপড় বিক্রি করতেন। তবে মাদক বিক্রির মাধ্যমে ফেন্সী কবির বর্তমানে অঢেল অর্থের মালিক বনে গেছেন। তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জেই ১৮টি মাদক মামলা বিচারধীন রয়েছে। তবে কুমিল্লা, ব্রাক্ষনবাড়ি ও মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া থানাতেও তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের কয়েকদিন পূর্বে জামিনে বেরিয়ে এসে নির্বাচনে অংশ নেন কবির হোসেন ওরফে ফেন্সী কবির। ওই সময় এলাকাবাসীর কাছে আকুতি মিনতি করে অনেক মুরব্বীর হাতে পায়ে ধরে তাদের কাছে ভোট প্রার্থনা করেন এবং একবারের মতো সুযোগ চান। পরে নারায়ণগঞ্জের বন্দরের ধামগড় ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের মেম্বার নির্বাচিত হন চিহিৃত মাদক ব্যবসায়ী ফেন্সী কবির। তবে এলাকাবাসী জানান সুযোগ পেয়েও বদলায়নি ফেন্সী কবির। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পরে তার দাপট যেন আরো বেড়েছে। সে গড়ে তুলেছে মাদকের একটি বিশাল সিন্ডিকেট। আর ওই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রন করছে সাগর, প্রদীপ, সজীব, শাহীন, জিলানী, শাহআলীসহ ১৫ জনের একটি দল। এদিকে আগে ফেন্সী কবির বিক্রি করতো ফেন্সিডিল। বর্তমানে সে ইয়াবার কারবার গড়ে তুলেছে। এলাকাবাসী আরো জানান, সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার হরিপুরে একটি ইয়াবা তৈরির কারখানা থেকে সরঞ্জামাদিসহ এক নারীকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর মাদক ব্যবসায়ী ঘর তল্লাশী করে ২’শ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট ও ইয়াবা তৈরি লাল, গোলাপী, সবুজ, হলুদ ও সাদা রং এর ২ কেজি পাউডার, ৩’শ গ্রাম ক্যামিকেল, ২’শ মিলি তরল পদার্থ, ৩টি ডাইস মেশিন, ২টি সিসি ক্যামেরা, ১টি মনিটর, ১টি ডিভাইস ও ১টি মোবাইল সেট উদ্ধার করে। অভিযানে নেতৃত্বদানকারী নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (এডি) বিপ্লব কুমার বলেন, অভিযানে টিনসেড বাড়ির তিনটি কক্ষের প্রত্যেকটিতে ইয়াবা তৈরির উপকরণ মজুদ পাওয়া গেছে। একটি কক্ষে পাওয়া যায় ইয়াবা তৈরির মেশিন। পুরো বাড়িটি সিসি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ওই বাড়ির বাসিন্দা হাবিবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা তৈরি করে আসছিল। তিনি নিজ নেটওয়ার্কে ইয়াবা সাপ্লাই দিতেন। তাকেও ধরার চেষ্টা চলছে। অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে মূলহোতা হাবিবুর রহমান হবি পালিয়ে গেলেও ধরা পড়ে তার স্ত্রী লাকী আক্তার। পলাতক ওই হাবিবুর রহমান হবি হচ্ছে ফেন্সী কবিরের সমন্ধী। অর্থাৎ হাবিবুর রহমান হবির বোনকে বিয়ে করেছিল ফেন্সী কবির।

এছাড়া শহরের নিতাইগঞ্জ শীতলক্ষ্যা এলাকার সালাউদ্দিন বিটু, চাষাঢ়া এলাকার তবলা রিপন, দেওভোগের পোড়া মামুন, ফতুল্লার ফেন্সি রনিসহ বেশীরভাগ মাদক বিক্রেতা বর্তমানে এলাকাতেই অবস্থান করছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তাদের সকলের বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিতে তারা এলাকায় দীর্ঘসময় অবস্থান করেনা বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসী।

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (এডি) বিপ্লব কুমার বলেন, তাদের কাছে টপ টেনের লিষ্ট রয়েছে। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় শীর্ষ মাদক বিক্রেতাদের তালিকা রয়েছে। মাদক বিক্রেতাদের গ্রেফতারে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 

র‌্যাব-১১ এর সিনিয়র সহকারি পরিচালক মো: আলেপ উদ্দিন জানান, নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীসহ মাদক বিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক অঞ্চল) মোঃ শরফুদ্দিন জানান, তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী ছাড়াও মাদক বিরোধী অভিযান চলমান রয়েছে। পলাতক থাকায় বেশ কয়েকজন মাদক বিক্রেতাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তবে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ