৮ শ্রাবণ ১৪২৫, সোমবার ২৩ জুলাই ২০১৮ , ১২:১১ অপরাহ্ণ

আর কত মানুষ লাশ হলে শীতলক্ষ্যায় নির্মাণ হবে সেতু


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:১৭ পিএম, ১০ জুলাই ২০১৮ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৩:১৭ পিএম, ১০ জুলাই ২০১৮ মঙ্গলবার


আর কত মানুষ লাশ হলে শীতলক্ষ্যায় নির্মাণ হবে সেতু

নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে ট্রলার দুর্ঘটনার তৃতীয় দিন ১০ জুলাই মঙ্গলবার ৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতের স্বজন হারানোর আহাজারি আর্তনাদে শীতলক্ষ্যা পাড়ের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। জীবন জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন বন্দর থেকে শহরের বিভিন্ন স্থানের গন্তব্যে যাতায়াত করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ নানা দুর্ঘটনায় কবলিত হয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনা কবলিত মানুষের মৃত্যু দেহ রীতিমত লাশের মিছিলে পরিণত হয়েছে। যা পরিসংখ্যন করলে প্রায় হাজারে গিয়ে পৌছাবে। নারায়ণগঞ্জ ও বন্দরবাসী প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে লাশের সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাড়ালে এই ঝুঁকিপূর্ন যাতায়াতের মৃত্যুকূপ থেকে রেহাই পাবে বন্দরবাসী। আর কত মায়ের বুক খালি হলে শীতলক্ষ্যা নামক মানুষ খেকো নদীটি নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বন্দরবাসী কপালে জুটবে সেতু?

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার আরিফুর রহমান জানান, রোববার রাত সোয়া ৯টায় শহরের সেন্ট্রাল খেয়াঘাট থেকে ১০০ থেকে ১৫০ জন যাত্রী নিয়ে মদনগঞ্জ ঘাটের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় একটি ট্রলারটি মোড় ঘুরাতে গিয়ে ঘাটের পাশে আগে থেকে থামিয়ে রাখা লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এসময় ট্রলারের উপরের ছাউনী ভেঙ্গে কয়েকজন যাত্রী নদীতে পড়ে গেলেও সাঁতরে তীরে উঠে যায়। আর ঘাটে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য ট্রলার গিয়ে অন্য যাত্রীদের উদ্ধার করে। তবে রাতে নিখোঁজের কোন অভিযোগ না থাকায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল কয়েক ঘন্টা তল্লাশী চালিয়ে অভিযান সমাপ্ত করে।

তিনি আরো জানান, পরে ওই ঘটনায় ৫ জন নিখোঁজ রয়েছে তাদের স্বজনরা ফায়ার সার্ভিসকে জানালে সোমবার সকাল ৬টা থেকে ১৩ জনের একটি ডুবুরী দল শীতলক্ষ্যা নদীতে তল্লাশী শুরু করে।

অবশেষে মঙ্গলবার সকালে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৪ জনের মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়। মৃতরা হলেন মদনগঞ্জ এলাকার ছালা পাগলনি বাড়ি এলাকার কালাচাঁন মিয়ার ছেলে দ্বীন ইসলাম (৩৫), মদনগঞ্জের ইসলামপুর এলাকার রমিজ উদ্দিনের ছেলে রায়াত আহমেদ ইমন (২২), একই এলাকার মৃত জিয়াবুল হকের চেলে আনোয়ার হোসেন ফালান (৩৫) ও মদনগঞ্জ এলাকার ফকির চানের ছেলে জনি (২২)। তারা প্রত্যেকে হোসিয়ার কারখানার শ্রমিক।

জানাগেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪০ বছর পরেও বন্দরবাসী ছিল অনেকটাই পরাধীন। জীবিকার উদ্দেশ্যে তাদের প্রতিদিন বন্দর থেকে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে আসতে হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা শীতলক্ষ্যা নদী পারাপার হয়ে আসছিল। নদীতে খেয়া পারাপারে জীবনের ঝুঁকি সহ ছিল ঘাটের ইজারাদারদের দুব্যর্বহার। উক্ত ঘাট দিয়ে নদী পার হতে প্রতিজন যাত্রীকে ৫০ পয়সা টোল দিতে হতো। এমনকি যাত্রীদের সাথে সুটকেস অথবা মুরগির জন্য অতিরিক্ত টাকা আদায় করতো ঘাটের ইজারাদাররা।

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান বন্দরবাসী নদী পারাপারে জীবনের ঝুঁকি কমাতে ২০১৩ সালের দিকে ৫নং ঘাট হতে বন্দর সেন্ট্রাল খেয়াঘাট পর্যন্ত ফেরী সার্ভিস চালু করে ছিলেন। কিন্তু নানা জটিলতায় ফেরী সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের অকাল মৃত্যুতে উপনির্বাচনে তাঁর শূন্য আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তাঁর ছোট ভাই সেলিম ওসমান। তিনি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর জনগনের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর সম্পূর্ন ব্যক্তিগত উদ্যোগে বন্দর খেয়াঘাট দিয়ে যাত্রী পারাপার সম্পূর্ন টোল ফ্রি করে দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ যাত্রী পারাপারে ১০টি ট্রলারের ব্যবস্থা করেন। যার মধ্যে ৫টি ট্রলার দিয়ে যাত্রীদের সম্পূর্ন বিনা খরচে নদী পারাপার করে আসছে।

বন্দর ও নবীগঞ্জ খেয়াঘাট দিয়ে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটলে নদী পারাপারের যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান নবীগঞ্জ খেয়াঘাট দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সেতু নির্মাণ এবং সেতু না হওয়া পর্যন্ত হাজীগঞ্জ-নবীগঞ্জ এবং ৫নংঘাট-বন্দর ঘাট দিয়ে ফেরী সার্ভিস চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে চাহিদা পত্র প্রেরণ করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর বন্দরে এমপি সেলিম ওসমানের ব্যক্তিগত অর্থায়নে নির্মিত ৩টি স্কুলের উদ্বোধন করতে এসে আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ১৫ দিনের মধ্যে উক্ত ঘাট গুলো ফেরী চালু করার ঘোষণা দিয়ে ছিলেন।

মন্ত্রীর ঘোষণার পর পর উক্ত ঘাটগুলোতে ফেরী চলাচলের জন্য নদীর উভয় পাড়ে রাস্তা নির্মাণ হলেও ফেরী সার্ভিস চালু হতে কালক্ষেপন হতে থাকে। অবশেষে এমপি সেলিম ওসমানের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর দীর্ঘ ৬ মাস পর ১৪ মে হাজীগঞ্জ-নবীগঞ্জ খেয়াঘাট দিয়ে ফেরী সার্ভিস চালু করা হয়। এদিকে হাজীগঞ্জ-নবীগঞ্জ খেয়াঘাটের সাথে ৫নংঘাট-বন্দর খেয়াঘাট দিয়ে ঈদ-উল-ফিতরের পূর্বে একইদিনে ফেরী সার্ভিস উদ্বোধনের কথা থাকলেও সরকারী নির্দেশে ৫নংঘাট-বন্দর ঘাটের জন্য বরাদ্দকৃত ফেরী দুটি আপদকালীন সময়ের জন্য মেঘনা ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। যা এখনো পর্যন্ত ফেরত না পাঠানোয় উক্ত ঘাট দিয়ে ফেরী সার্ভিস এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। এদিকে নবীগঞ্জ-হাজীগঞ্জ খেয়াঘাট দিয়ে ফেরী সার্ভিস চালু করা হলেও তা যাত্রীদের কাঙ্খিত সেবা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই ফেরীর ইঞ্জিনে নানা ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে পড়ছে। যার ফলে ফেরী সার্ভিস দিনে কয়েক দফায় বন্ধ রাখা হচ্ছে।

এলাকাবাসীর দাবী যদি পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক ঈদের পূর্বে একই দিনে নবীগঞ্জ ঘাটের ন্যায় বন্দর ঘাট দিয়েও ফেরী সার্ভিসটি চালু করা সম্ভব হতো তাহলে হয়তো আজকে এই ৪জন মানুষকে লাশ হতে হতো না। নিহত ৪ জনের পরিবারকে আজ স্বজন হারানোর বেদনায় আহাজারি করতে হতো। তাই বন্দর সহ নারায়ণগঞ্জবাসী প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে আর কতজন মানুষ লাশে পরিনত হলে বন্দরবাসীর নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বন্দর ঘাট দিয়ে ফেরী সার্ভিস ও নবীগঞ্জ খেয়াঘাট দিয়ে শীতলক্ষ্যায় আরো একটি সেতু পাওয়া যাবে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ