৩ আশ্বিন ১৪২৫, বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

শীতলক্ষ্যায় ডুবলো ৪ পরিবারের ‘স্বপ্ন’ কাঁদছে পুরো মদনগঞ্জ


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:৪৪ পিএম, ১০ জুলাই ২০১৮ মঙ্গলবার


শীতলক্ষ্যায় ডুবলো ৪ পরিবারের ‘স্বপ্ন’ কাঁদছে পুরো মদনগঞ্জ

‘বাবা বলেছিল এসএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে নারায়ণগঞ্জের কলেজে ভর্তি করিয়ে দিবে। আর আমি যতক্ষন পর্যন্ত পড়তে চাই পড়াবে। কারণ তিনি পড়ালেখা করতে পারে নাই। এটাই ছিল বাবার স্বপ্ন।’

১০ জুলাই মঙ্গলবার দুপুরে বন্দর উপজেলার মদনগঞ্জ শান্তিনগর এলাকার ভাড়া বাসায় কথাগুলো বলছিলেন শীতলক্ষ্যা নদীতে ট্রলারের ছাউনি ভেঙে নদীতে ডুবে মারা যাওয়া আনোয়ার হোসেন ফালানের বড় মেয়ে আলমিনা মরিয়ম। সে বন্দরের ইব্রাহিম আলম চাঁন মডেল স্কুলের দশম শ্রেনির ছাত্রী।

আনোয়ার হোসেন ফালান (৩৫) একই এলাকার জিয়াবুল হকের ছেলে। স্ত্রী রাশেদা বেগম, বড় মেয়ে আলমিনা মরিয়ম (১৪), মেঝ ছেলে রাশেদ (১২) ও ছোট ছেলে আবিদকে (৯) নিয়ে বসবাস করতেন। বড় স্কুলে পড়ালেখা করলেও ছোট দুই ভাই স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে।

আলমিনা মরিয়ম আরো বলেন, আমরা খুব গরীব। মা অন্যের বাসায় কাজ করে আর বাবা হোসিয়ারীতে কাজ করতো। দুইজন খুব কষ্ট করে আমাদের তিন ভাই বোনকে পড়লেখা করাতো। না খেয়ে থাকলেও পড়ালেখা বন্ধ হতে দেয়নি।’

আনোয়ার হোসেন ফালানের শ্যালক সামসুল আলম বলেন, বোন আট মাসের গর্ভবতি ও তিন ভাগনে ভাগনিও পড়ালেখা করে। ওদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাবে। বোন এখন কি করবে কোথায় যাবে বলতে পারছি না। আমরাও এতো ভালো অবস্থা না যে সহযোগিতা করবো। সুন্দর সংসারটা শেষ হয়ে গেলো।

আনোয়ার হোসেন ফালানের পরিবারের মতোই এক মাত্র উপার্জনের ব্যক্তি এ ঘটনায় নিহত দীন ইসলাম। স্ত্রী ঝিনুক ইসলাম ও তিন বছরের মেয়ে দিনিয়া ইসলামকে নিয়ে বন্দর শান্তিনগর এলাকার নিজ বাড়িতে বসবাস করতেন তিনি। নিজের পরিবার ছাড়াও দেখতে হতো মা, দুই বোন ও অসুস্থ্য বড় ভাইয়ের পরিবারকেও। এখন পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

দীন ইসলাম সোমবার রাতে নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই তার স্ত্রী ঝিনুক ইসলামের আহাজারি কিছুতেই থামছে না। মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে বাসায় গিয়ে দেখা গেছে বিলাপের সুরে কাঁদছেন তিনি।

ঝিনুক ইসলাম বলেন, অন্যদিন কাজে যাওয়ার আগে মেয়েকে নিয়ে খেলাকরে আমার সঙ্গে কথা বলে কিন্তু সোমবার দিন কাউকে কিছু না বলেই চলে যায়। রাতে বাসায় আসার আগেও ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করে মেয়ের জন্য কিছু আনতে হবে কিনা। কিন্তু সোমবার রাতে ফোন দেয়নি। পরে ভাগনে সুমন এসে বলে মামী আসার সময় ট্রলার ডুবে গেছে মামাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

দীন ইসলামের বড় বোন উম্মে কলসুম বলেন, চার বছর আগেই পারিবারিক ভাবে দিন ইসলামের সঙ্গে ঝিনুকের বিয়ে হয়। এখনই এমন হবে কে জানতো। দুই বোন বিয়ের বাকি, বড় ভাই হৃদরোগে আক্রান্ত, মা অসুস্থ্য এখন কে দেখবে তাদের। আমাদের সংসারটাই শেষ হয়ে গেছে।

আনোয়ার হোসেন ফালান ও দীন ইসলামের মতো পরিবারের একমাত্র উপার্জন ব্যক্তি না হলেও বাবা মায়ের আদরের সন্তান ছিল রায়াত আহম্মেদ ইমন (২২)। অর্থ অভাবে পড়ালেখা বন্ধ করে নারায়ণগঞ্জের হোসিয়ারী কারখানায় চাকরি নেয়।

রায়াত আহম্মেদ ইমন মদনগঞ্জ শান্তিনগর এলাকার রমিজ মৃধার ছেলে। তিনি বলেন, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব) বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ অনার্সে ভর্তি হয়েও অর্থের অভাবে পড়ালেখা বন্ধ করে নারায়ণগঞ্জে চলে আসে। অনেক জায়গায় চাকরি পরীক্ষা দিয়েও কাজ না পেয়ে শেষে মাত্র দুই সপ্তাহ আগে হোসিয়ারী কারখানায় কাজে যোগদেয়। কিন্তু এটাই আমার ভুল ছিল। আজ ঢাকা কাজ করলে আমার ছেলেটাকে এভাবে হারাতে হতো না।

তিনি আরো বলেন, ছোট ছেলে হিসেবে মায়ের কাছে খুব আদরের ছিল ইমন। এখন সেই ছেলে হারিয়ে কয়েকবার অজ্ঞান হয়ে গেছে। ডাক্তার তাকে বিশ্রামে থাকতে বলেছে।’

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জে যাত্রীবাহী ট্রলার থেকে শীতলক্ষ্যা নদীতে পড়ে ৫ জন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় মঙ্গলবার চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আর এখনও পর্যন্ত ওসমান গণি ও সুজন নামের আরো দুইজন নিখোঁজ রয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল ৯টায় শহরের ফায়ার খেয়াঘাট থেকে ২ জন ও সেন্ট্রাল খেয়াঘাটের ৫০০ গজ দূর থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া সকাল সাড়ে ১০টায় একই স্থান থেকে আরো একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

মৃতরা হলেন মদনগঞ্জ এলাকার ছালা পাগলনি বাড়ি এলাকার কালাচাঁন মিয়ার ছেলে দীন ইসলাম (৩৫), মদনগঞ্জের ইসলামপুর এলাকার রমিজ উদ্দিনের ছেলে রায়াত আহমেদ ইমন (২২), একই এলাকার মৃত জিয়াবুল হকের ছেলে আনোয়ার হোসেন ফালান (৩৫) ও মদনগঞ্জ এলাকার ফকির চানের ছেলে জনি (২২)। তারা প্রত্যেকে হোসিয়ার কারখানার শ্রমিক।

উল্লেখ্য রোববার রাত সোয়া ৯টায় শহরের সেন্ট্রাল খেয়াঘাট থেকে ৮০ থেকে ১০০ জন যাত্রী নিয়ে মদনগঞ্জ খেয়াঘাটের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় ট্রলারটি মোড় ঘুরাতে গিয়ে ঘাটের পাশে আগে থেকে থামিয়ে রাখা লঞ্চের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এসময় ট্রলারের উপরের ছাউনী ভেঙ্গে কয়েকজন যাত্রী নদীতে পড়ে গেলেও সাঁতরে তীরে উঠে যায়। আর ঘাটে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য ট্রলার গিয়ে অন্য যাত্রীদের উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ৫ জন নিখোঁজ রয়েছে স্বজনরা সোমবার সকালে ফায়ার সার্ভিসকে জানালে তল্লাশী শুরু হয়। নিখোঁজরা হলো, ওসমান গণি (৪০), জনি (২২), সুজন (১৯), ইমন (২২) ও দিন ইসলাম (৩৫)।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ