৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫, বুধবার ২১ নভেম্বর ২০১৮ , ১২:৩০ অপরাহ্ণ

rabbhaban

কাঁদছে লক্ষ্যার পাড়


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৩:০৪ পিএম, ১১ জুলাই ২০১৮ বুধবার


কাঁদছে লক্ষ্যার পাড়

নারায়ণগঞ্জ শহরের শীতলক্ষ্যা নদীর দুইপাশে লাশের বন্যায় স্বজনদের আহাজারি আর কান্নার রোল পড়ে গেছে। একদিকে শহরের আমলাপাড়া এলাকায় নিখোঁজ স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষের টুকরো টুকরো লাশ উদ্ধার করা হয় একটি ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে। অন্যদিকে যাত্রীবাহী ট্রলার থেকে শীতলক্ষ্যা নদীতে পড়ে ৫ জন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহতরা সবাই শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড় মদনগঞ্জ এলাকায় বসাবাস করে। শীতলক্ষ্যা নদীর দুপাড়ের বসবাস করা জলজ্যান্ত মানুষগুলো লাশ হয়ে ঘরে ফিরলো প্রিয়জন হারানো বেদনায় স্বজনরা পাগল প্রায়। প্রিয়জন হারানোর বেদনা স্বজনদের চোখে সারা জীবনের কান্নায় পরিণত হয়। তবে স্বজনদের লাশ কাঁধে নিয়ে দুঃখের সাগরে পতিত হওয়া কান্নার রোল এক আবেগঘন দৃশ্যপট তৈরি করে।

নিখোঁজের ২১ দিন পর ৯ জুলাই রাত ১১ টায় শহরের আমলপাড়া এলাকার একটি ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের কালিরবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পরিবারের আশা ছিল ফিরবে প্রবীর চন্দ্র ঘোষ। একই প্রত্যাশা ছিল সহযোগি আর ব্যবসায়ীদেরও। কয়েকদিন আগে প্রকাশ্যে মানববন্ধন করে স্বজন না থাকার কষ্ট আর বেদনার চিত্র তুলে ধরেছিলেন চোখের নোনা জলে। কিন্তু ২১ দিন পর জানা গেলে প্রবীর চলে গেছে না ফেরার দেশে। তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। টুকরো টুকরো করে লাশ ফেলে দেওয়া হয় একটি ভবনের সেপটিক ট্যাংকে। পঁচন ধরে যায় লাশের মধ্যে। প্রবীরকে হত্যা করা হয়েছে মাথা, পা, দুই হাত, কোমর ও শরীরকে বিচ্ছিন্ন করে। হত্যার পর অংশগুলো ব্যাগে ভরে ফেলে দেওয়া হয়।

স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষের লাশের সন্ধান পেয়ে শহরের আমলাপাড়া এলাকাতে ছুটে আসে পরিবারের লোকজন। বাবা ভোলানাথ দাস তাৎক্ষনিক না আসতে পারলেও এসেছিল মা দীপা রাণী ঘোষ। তিনি সেখানে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

বলতে থাকে ‘আমাদের কেন এমন সর্বনাশটি করলে। আমার দুই নাতিকে কেমন করে এতিম করে দিল। কেন এমন হলো। আমরা তো কারো ক্ষতি করি নাই। কেন আমাদের এত বর্ড় সর্বনাশ হলো। আমরা এর বিচার চাই। আমি ওই খুনীদের ফাঁসি চাই। ফাঁসি না হলেও প্রবীরের আত্মা শান্তি পাবে না। আমাদের সব শেষ করে দিছে।’

কান্না জড়িত কণ্ঠে স্ত্রী রূপা ঘোষ বলেন, দুইটা মেয়েই সব সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করে তাদের বাবা কবে আসবে। কোথায় গেছে। বাসায় আসছে না কেনো। কোন উত্তর দিতে পারি না। ওদের কাছে বাবাই ছিল সব। এখন স্কুলে যায় না ঠিক মতো খেতে চায় না। দুইটা মেয়ে নিয়ে আমি কি করবো কোথায় যাবো বুঝতে পারছি না।

প্রবীর ঘোষ কালীরবাজার ভোলানাথ জুয়েলার্সের মালিক। গত ১৮ জুন থেকে সে নিখোঁজ ছিল। তাঁর সন্ধান দাবীতে ২১ দিন ধরে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী, নিহতের স্বজন, বিভিন্ন সংগঠন ও পরিবারের লোকজন মানববন্ধন ও সমাবেশ করে আসছিল। এর মধ্যে নিহতের পরিবার প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপিও প্রদান করেছিল।

প্রবীর নিখোঁজের ঘটনায় বাবা ভোলানাথ দাস বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় জিডি করেছিল। ওই জিডির তদন্ত পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে দেওয়া হয়। ডিবি পুলিশ বিষয়টির তদন্ত করে পিন্টু ও বাপেন ভৌমিক বাবু নামের দুইজনকে আটক করে। তার মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং ও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে পিন্টু স্বীকার করে প্রবীর ঘোষের বিষয়টি। পরে তার দেখানো মতেই সোমবার রাতে শহরের আমলপাড়া এলাকার ঠান্ডু মিয়ার ভবনের সেফটিক ট্যাংক থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। কয়েকটি ব্যাগে করে ট্যাংকিতে লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়।

এদিকে ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জে যাত্রীবাহী ট্রলার থেকে শীতলক্ষ্যা নদীতে পড়ে ৫ জন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় গত ১০ জুলাই চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে পরিবারের লোকজন আরো দুইজন নিখোঁজ দাবী করলেও গতকাল তাদেরকে দেখা যায়নি। তবে ফায়ার সার্ভিস বলছে অভিযোগ দিলে তাদের তল্লাশী অভিযান চলবে।

১০ জুলাই  ৯টায় শহরের ফায়ার খেয়াঘাট থেকে ২ জন ও সেন্ট্রাল খেয়াঘাটের ৫০০ গজ দূর থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া সকাল সাড়ে ১০টায় একই স্থান থেকে আরো একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

মৃতরা হলেন মদনগঞ্জ এলাকার ছালা পাগলনি বাড়ি এলাকার কালাচাঁন মিয়ার ছেলে দ্বীন ইসলাম (৩৫), মদনগঞ্জের ইসলামপুর এলাকার রমিজ উদ্দিনের ছেলে রায়াত আহমেদ ইমন (২২), একই এলাকার মৃত জিয়াবুল হকের চেলে আনোয়ার হোসেন ফালান (৩৫) ও মদনগঞ্জ এলাকার ফকির চানের ছেলে জনি (২২)। তারা প্রত্যেকে হোসিয়ার কারখানার শ্রমিক।

এর আগে পরিবার দাবী করেছিল ওসমান গণি ও সুজন নামের আরো একজন নিখোঁজ রয়েছে।

মামুনুর রশিদ আরো জানান, আপাতত আর কেউ নিখোঁজ থাকার খবর না থাকলেও বিকাল পর্যন্ত শীতলক্ষ্যায় তল্লাশী চালানো হবে।

স্বজনদের লাশ পাওয়ার পরে নিহতের স্বজনদের আহাজারিতে এক আবেগঘন পরিবেশ, স্বজনদের কান্নার রোলে পুরনো নানা স্মৃতি ভেসে বেড়াচ্ছে। বেদনায় উন্মাদ প্রায় স্বজনেরা এখনো প্রিয়জনদের অপেক্ষার প্রহর গুণছে। আবার কেউ কেউ বোবা কান্নায় স্তব্ধ হয়ে বাবরুদ্ধ প্রায়। হাজারো স্বজনের ভিড়ে তার প্রিয়জনকে চোখদুটো খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু লাশ হয়ে ফেরার ঘটনা কিছুতেই মনকে মানানো যাচ্ছেনা। তাই চারদিকে স্বজনদের কান্নার রোল সবাই দেখলেও বোবা কান্না অনেকেরই চোখে পড়েনা। তবে স্বজনদের অনেকে তাদের আহাজারিতে শীতলক্ষ্যা নদীকে দায়ী করে নানা প্রলাপ বকছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘নারায়ণগঞ্জ শহরের শীতলক্ষ্য নদীর দুপাড়ে দুটি ঘটনায় একে একে ৫ জনের জীবন হারিয়েছে। এর মধ্যে একজন নির্মমভাবে বন্ধুর হাতে খুন হলেও বাকিরা শীতলক্ষ্যা নদীতে পড়ে দিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। এসব ঘটনা দুটোতে প্রাণ হারানো ব্যক্তিরা শীতলক্ষ্যা নদীর দুপাড়ে বসবাস করে। তাই স্বজনদের কান্না নদীর দুপাড়ে জোয়ারের মত বয়ে যাচ্ছে। আর স্বজন হারানোর বেদনা সেই কান্নাকে আরো জোরালো রুপ দিচ্ছে।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ