৮ কার্তিক ১৪২৫, বুধবার ২৪ অক্টোবর ২০১৮ , ৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ

UMo

দুই রাণীতে চার খুন!


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০২:০৬ পিএম, ১৮ জুলাই ২০১৮ বুধবার


দুই রাণীতে চার খুন!

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত একটি চরিত্র এখন পিন্টু দেবনাথ। দুইজন জলজ্যান্ত মানুষকে ফিল্মী স্টাইলে হত্যার পর ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। একজনের লাশ ব্যাগে ভরে ফেলে দেওয়া হয় শীতলক্ষ্যা। আরেকজনের লাশ রেখে দেয় নিজ বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে। ট্যাংকে লাশ রেখেই দুই তলার ফ্লাটে ২১দিন ঘুমিয়ে ছিলেন পিন্টু। আর তার গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসছে এর আগেও আরেক নারীর সঙ্গে পরকীয়ার ঘটনা। ধারণা ওই নারীর স্বামী ও ছেলের মৃত্যুর পেছনেও হাত থাকতে পারে পিন্টুর। এসব ঘটনা যোগ করলে হতে পারে ৪ খুনের ঘটনার নায়ক পিন্টু। এসব ঘটনায় নাম এসেছে দুইজন নারীর। একজনের নাম শীলা রাণী। ও অপরজন রত্মা রাণী কর্মকার। দুইজনের মধ্যে রত্মা ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন। আর শীলা গেছেন পালিয়ে। সেটাও গত ৯ জুলাই পিন্টু দেবনাথ গ্রেফতারের পর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেফতারকৃত রত্মা রাণীর বাড়ি শহরের মাসদাইর এলাকাতে। সে ছিল পিন্টু দেবনাথের ঘনিষ্ঠ বান্ধবীদের একজন। আর পিন্টুর হাতেই খুন হওয়া স্বপন কুমার সাহার বান্ধবী ছিল রত্মা। কয়েক বছর আগে পিন্টুর সাথে রত্মাকে পরিচয় করিয়ে দেন স্বপন। পরে ধীরে ধীরে স্বপনের সঙ্গে রত্মার দূরত্ব সৃষ্টি হয়। পরে রত্মার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাড়ে পিন্টু দেবনাথের।

জানা গেছে, কালীরবাজার স্বর্ণপট্টি এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, পিন্টু দেবনাথ ছিল প্রচন্ড নারী আসক্ত। সে কারণে সে বিয়ে করেনি। বিভিন্ন স্থানে নারীদের সঙ্গে সময় কাটাতো সে। ছিল মারাত্মক পরকীয়া আসক্ত। এ কারণে আমলাপাড়া ও কালীরবাজার স্বর্ণ পট্টিতে সে ছিল ‘লেডিকিলার’ হিসেবে পরিচিত।

কালীরবাজার স্বর্ণপট্টি এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী জানান, পিন্টু দেবনাথ প্রায় ২০ থেকে ২২ বছর যাবৎ এই স্বর্ণ পট্টিতে রয়েছে। তার বাড়ী কুমিল্লা চন্দ্রনপুর। নারায়ণগঞ্জে তিনি একা আসেন এবং সুচতুর বুদ্ধিতে আজ দুই দোকানের মালিক এবং কোটিপতিও বটে। স্বর্ণপট্টি’র স্বর্ণের নকশা মাস্টার খ্যাত প্রয়াত অপু’র সহকারী ছিলেন পিন্টু দেবনাথ। দেখতে সুদর্শন পিন্টু দ্রুত নকশা কাজ বুঝে যাওয়ায় অপু তাকে দিয়ে অনেক স্বর্ণ তৈরি কাজ করাতেন। স্বল্পভাষী ছিলেন পিন্টু। কিন্তু তার কথায়ও অনেক সময়ে টনক নড়ে যেত সহকর্মীদের। পিন্টু আমলাপাড়া এলাকাতে রাশেদুর ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার যে ফ্লাটে থাকেন এক সময়ে ওই ফ্লাটেই থাকতেন অপু। প্রায় পনের বছর পূর্বে অপু রায় পরলোক গমন করলেও সে বাড়িতেই অপু রায়ের স্ত্রী সন্তানদের সঙ্গে থেকে যায় পিন্টু। পিন্টু থাকা সময়েই পরকীয়ার খবর রটে যায়। ঘটনা ব্যাপক জানাজানি হলে শীলা রানীকে শহরের টানবাজারে ফ্লাট ভাড়া করে দেয় পিন্টু। এতে বাধ সাধে অপু কর্মকারের ছোট ছেলে রনি। কিছুদিন পরে রনিও মারা যায়। তখন পিতা পুত্রের মৃত্যুর বিষয়টি প্রচার চালায় "ক্যান্সার" বলে। আর নিজের অপকর্ম ধামাচাপা দিয়ে তাতে জোরালো সমর্থন দেয় সুন্দরী পরকীয়া প্রেমিকা দুই সন্তানের জননী শীলা রানী। যিনি এখনো পর্দার আড়ালেই রয়েছে।

মামলার এজাহারে বাদী স্বপনের বড় ভাই অজিত কুমার সাহা জানান, স্বপন কুমার সাহা ছিলেন খুচরো কাপড় ব্যবসায়ী। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে। গত ৯ জুলাই প্রবীর ঘোষের লাশ উদ্ধারের পর পিন্টুর প্রতি আমাদের সন্দেহ বাড়ে। পরে ১৫ জুলাই বিষয়টি ডিবিকে জানালে রিমান্ডে থাকা পিন্টুর সহযোগি বাপন ভৌমিক বাবু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। সে তখন পিন্টু দেবনাথের এক বান্ধবী রত্মা রাণী চক্রবর্তীর সন্ধান দেন। তার মোবাইল নাম্বার পর্যালোচনা করে জানা গেছে স্বপনের মোবাইলটি রত্মা ব্যবহার করছে। ১৫ জুলাই রোববার রাতে তাকে আটকের পর তার কাছ থেকে স্বপনের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল উদ্ধার করে। মূলত পিন্টুর টাকা নিয়ে স্বপন ভারতে একটি ফ্লাট বাসা ক্রয় করে। ওই ফ্লাট বাসা পিন্টুকে না দিয়ে বরং উল্টো হুমকি দিচ্ছিল স্বপন। এসব কারণেই ২০১৬ সালের মার্চে আমলাপাড়া এলাকার মোল্লা মামুন নিজেই পিন্টুকে হুমকি দিত। তখন থেকেই স্বপন সাহা ও প্রবীর ঘোষকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকে পিন্টু। পরে ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর স্বপনকে বাসায় ডেকে নেয় পিন্টু। পরে তার ফ্লাটে সে রাতে চাপাতি দিয়ে আঘাত ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে মৃতদেহ খন্ড খন্ড করে ব্যাগে ভরে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেয়।

এছাড়া  ঘাতক পিন্টু আদালতকে জানিয়েছে, অর্থ, বন্ধকী স্বর্ণালংকার ও দোকান আত্মসাতের পরিকল্পনায় এবং ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে সে নিজ বন্ধু প্রবীরকে হত্যা করেছে। ১৮ জুন রাতে বিয়ার পানের পার্টির কথা বলে তার বাসা থেকে বের করি। পরে আমার ফ্ল্যাট বাসায় নিয়ে বসাই। সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে থাকি একত্রে। ওই সময়ে আগে নেওয়া স্প্রাইট পান করে প্রবীর। খেয়েছিল বিস্কুটও। খাওয়ার সময়েই আমি তাকে পিছন থেকে আগে থেকে কেনা চাপাতি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করি। তখন প্রবীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় প্রবীর আমাকে কয়েকদফা লাথি মারতে থাকলে ওরে আবারো লাঠি ও দা দিয়ে আঘাত করতে থাকি। এ সময় প্রবীর রক্তাক্ত অবস্থায় টিভি রুমের খাটে লুটে পড়ে। শরীর ঢেকে দেওয়া হয় বালিশ ও চাদর দিয়ে। পরে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দেহ’কে ৭ টুকরো করা হয়। মাথা, দুই হাত, দুই পা, বডি, পেট ও পাজর ৭টি খন্ড করে বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৭টি নতুন আকিজ সিমেন্টের ব্যাগের মধ্যে ৪টিতে টুকরো টুকরো লাশ ভরি। আরেক ব্যাগে বালিশ, খাটের চাদর, ব্যবহার করা জামা ও দা প্যাকেট করি। পরে ঘরের বাথরুমে রক্তাক্ত ও নিজে গোসল করি। পরিবেশ শান্ত অবস্থায় আনুমানিক সাড়ে ১২টায় বাসা নিচে পরিত্যক্ত সেফটি ট্যাংকটিতে ৩ ব্যাগে থাকা ৫ টুকরো ঢুকাতে শুরু করি। আরেকটি ব্যাগ বাড়ির উত্তর পাশে ময়লাস্তূপে সাথে ড্রেনে মাথায় ফেলে দেই। কাজ শেষ করে বাসায় হাত পরিস্কার করে ফের প্রবীর চন্দ্র ঘোষের বাড়িতে রাত দেড়টার দিকে ছুটে যাই। রাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে এসে ফেলে দেই চাপাতি, বিছানার চাদর আর বালিশ।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ