৬ কার্তিক ১৪২৫, সোমবার ২২ অক্টোবর ২০১৮ , ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ

UMo

সপ্তাহের নারায়ণগঞ্জ

ধর্ষণ গণধর্ষণে শিশু বুড়োও রেহাই পাচ্ছেনা


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৪৫ পিএম, ৫ আগস্ট ২০১৮ রবিবার


ধর্ষণ গণধর্ষণে শিশু বুড়োও রেহাই পাচ্ছেনা

নারায়ণগঞ্জে ধর্ষণ, গণধর্ষণের হাত থেকে শিশু বৃদ্ধারাও রেহাই পাচ্ছে না। তবে  নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জুয়েল রানার বিরুদ্ধে ঘর্ষণের অভিযোগের বিষয়টি অন্য সব ঘটনাকে ছাপিয়ে গেছে। কারণ এ ঘটনায় ধর্ষণের পরও দফায় দফায় ধর্ষিতাকে হয়রানির নানা চিত্র এতে রচিত হয়েছে। তাছাড়া বিচারক যখন আসামী রুপে দৃশ্যমান হয় তখন বিচারপ্রার্থীরা অবাক।

২৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের লোমহর্ষক নানা ঘটনার তথ্য তুলে ধরা হলো।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার কুতুবপুরের দেলপাড়া এলাকায় মজা খাওয়ানোর প্রলোভন দিয়ে পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে সজল নামের একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত ৪ আগষ্ট বিকেল সাড়ে ৫টায় এ ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছে। মামলার অভিযোগে জানা যায়, ৪আগষ্ট বিকেল সাড়ে ৫টায় একই বাড়ির খোকনের ছেলে সজল ৫ বছরের শিশু কন্যাকে মজা খাওয়ানোর প্রলোভন দিয়ে তার বাসায় নিয়ে ধর্ষন করেছে। শিশুটি তার মায়ের কাছে ধর্ষণের কথা বললে সে তার স্বামী কে জানিয়ে থানায় এসে তারা মামলা করেছে। এই মামলায় লম্পট সজলকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে।

৩১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় ১৩ বছরের এক শিশুকে গণধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে ওই শিশুর খালা বাদী হয়ে ৩জনকে আসামী করে মামলাটি দায়ের করেন। তবে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

আড়াইহাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম জানান, উপজেলার সদর পৌরসভার দাসপাড়া গ্রামে খালার বাড়িতে গত এক বছর ধরে বসবাস করে আসছে শিশুটি। তার বাবা মারা গেছে। আর মা জর্ডান প্রবাসী। ৩০ জুলাই সোমবার রাত ৮টায় দাসপাড়া গ্রামের লিটন মিয়ার ছেলে সাব্বির (১৮) ওই শিশুটিকে বাড়ী থেকে ডেকে রাস্তায় নেওয়ার চেষ্টা করে। তখন শিশুটি যেতে অস্বীকার করলে সাব্বির তাকে মুখ চেপে ধরে। তখন উৎপেতে থাকা সাব্বিরের সহযোগি দাসপাড়া গ্রামের আনোয়ারের ছেলে শাহআলম (১৮) ও মোসলেহ উদ্দিনের ছেলে রানাসহ (২০) অজ্ঞাত আরো ২ থেকে ৩ জন এসে দাসপাড়া একটি বাগানে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। লম্পটরা ধর্ষণ শেষে শিশুকে ফেলে চলে যায়। পরে ধর্ষিতার চিৎকারে আশেপাশের লোকজন এসে তাকে উদ্ধার করে।

পুলিশ পরিদর্শক আরো জানান, থানায় মামলা হয়েছে। আসামীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ধর্ষিতাকে ডাক্তারী পরীক্ষা করার জন্য মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় ৪ বছরের শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে লম্পট বাড়িওয়ালা জব্বার মাষ্টার (৬০) এর বিরুদ্ধে। সন্ধ্যায় শিশুটির খালা বাদী হয়ে বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।

অভিযোগে জানা গেছে, ফতুল্লার সেহাচর তক্কার মাঠ এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসাবে শিশুর পরিবার দীর্ঘদিন যাবৎ বসবাস করে আসছে। শিশুর মা স্থানীয় একটি গার্মেন্টে কর্মরত রয়েছে। আর বাবা অসুস্থ ব্যক্তি। প্রতিদিনের মত শিশুর মা গত ৩১ জুলাই সকালে গার্মেন্টে কাজে চলে যায়। বাড়িতে শিশু অসুস্থ বাবার সাথে ছিল। সকাল ১১টার দিকে শিশুর বাড়ির মালিক শিশুটিকে প্রলোভন দেখিয়ে তার বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ডেকে নিয়ে যায়। এরপর শিশুটির যৌন হয়রানীর চেষ্টা করে। একপর্যায়ে শিশুটি চিৎকার করলে বাড়িওয়ালা শিশুটির মুখ চেপে ধরে কামভাব চরিতার্থ করে। রাতে শিশুটির মা বাসায় এসে শিশুটিকে অসুস্থ দেখতে পায়। শিশুটি তার মাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে। পরে শিশুর খালা বিষয়টি স্থানীয় ব্যক্তিদের জানিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় ফতুল্লা মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।

এব্যাপারে ফতুল্লা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ শাহ মোহাম্মদ মঞ্জুর কাদের পিপিএম বলেন, বাদীর অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

২৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ৭ বছরের শিশুকে হাত পা বেঁধে ধর্ষণের চেষ্টার মামলার অভিযুক্ত কিশোর আবির হোসেনকে (১৫) গ্রেফতার করেছে পুলিশ।  দুপুর ১২টায় সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী কমদতলী নাভানা ভূইয়া সিটি এলাকা থেকে এসআই আবু বকর সিদ্দিক তাকে গ্রেফতার করে।

শিশুটি স্থানীয় কিন্ডার গার্টেন স্কুলের ১ম শ্রেনীর ছাত্রী। ২৮ জুলাই শুক্রবার বিকেলে সিদ্ধিরগঞ্জের চৌধুরী বাড়ি ভূইয়াপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটলে শনিবার দুুপুরে ওই শিশুর মা বাদী হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে ঐ রাতেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগের একটি মামলা দায়ের করা হয়।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার (এসআই) আবু বকর সিদ্দিক জানান, শিশুটির স্বপরিবারে সিদ্ধিরগঞ্জের চৌধুরী বাড়ি ভূইয়াপাড়া এলাকার দীল মোহাম্মদের বাড়ির ভাড়াটিয়া। বাড়ির মালিকের ভাই আলী হোসেনের ছেলে আবির হোসেন শুক্রবার বিকেলে সবার অজান্তে শিশুটিকে তার ঘরে নিয়ে হাত পা বেঁধে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করে। শিশুর চিৎকারে শিশুর মা সহ আশেপাশের লোকজন ছুটে আসলে দৌড়ে পালিয়ে যায় আবির হোসেন।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আব্দুস সাত্তার টিটু জানান জানান, অভিযুক্ত কিশোর আবির হোসেনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগের মামলা নেওয়া হয়েছে।

২৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জুয়েল রানাকে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে আইন মন্ত্রণালয়ের সংযুক্ত করা হয়েছে। একজন নারীর ধর্ষণের অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (২৬ জুলাই) তাকে ট্রাইব্যুনাল থেকে প্রত্যাহার করে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

শনিবার (২৮ জুলাই) আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে একজন নারী ধর্ষণের মামলা করেছেন। সে কারণে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। যদি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত থাকবেন।’

আইন সচিব আরও বলেন, ‘এই বিচারকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে আদালতে মামলা হয়েছে। কোর্ট মামলা আমলে নেওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।’

মামলার অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত বিচারক মো. জুয়েল রানা এর আগে ঢাকা জজকোর্টে অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৫ সালে তার আদালতে একটি পারিবারিক রিভিশন মামলা বিচারাধীন ছিল। পরবর্তীতে বিচারক নিজেই বাদিনীকে ফোন করে ওই আদালতে অস্থায়ী স্টেনোগ্রাফার হিসেবে চাকরি দেন। এর পর তিনি ওই নারীকে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে সাঁটলিপি শেখাসহ বিভিন্ন সদুপদেশ দেন। এর মাধ্যমেই তিনি বিশ্বাস অর্জন করেন।

পরবর্তীতে ওই নারী আদালতে নিয়োগ পরীক্ষা দিলেও চাকরি না হওয়ায় একটি কোম্পানিতে চলে যান। তবে বিচারক জুয়েল রানা তাকে ফোন করে আসতে বলেন। না এলে পারিবারিক মামলায় ক্ষতি করবেন বলে হুমকি দেন। তাই বাধ্য হয়ে অফিসে আসেন এবং বিচারকের অধীনে কাজ করতে থাকেন। ২০১৫ সালের ৮ জুন জুয়েল রানা স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কথা বলে ওই নারীকে তার বাসায় নিয়ে যান। অথচ বাসায় কেউই ছিল না। এ সুযোগে মাথায় রিভলবর ঠেকিয়ে জোর করে তাকে তিনবার ধর্ষণ করেন বিচারক। সেই সঙ্গে বিষয়টি কাউকে জানালে খুন করে ফেলবেন বলেও হুমকি দেন।

এর পর বাদিনী ওই বাসা থেকে বের হয়ে ঢাকা মেডিক্যালে গিয়ে চিকিৎসা করান। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ৩ নভেম্বর বাদিনী অসুস্থ হলে তাকে বিয়ে করে চিকিৎসা করাতে বলেন বিচারককে। উল্টো পাঁচ দিন পর এক র‌্যাব কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে ধর্ষণ সংক্রান্ত সব কাগজপত্রসহ বাসা থেকে ওই নারীকে আসামির কাছে নিয়ে আসেন। এর পর খিলক্ষেত থানায় ২০ ইয়াবার একটি মিথ্যা মামলায় তাকে জেলে পাঠান।

জামিনে মুক্তি পেয়ে ধর্ষণের কাগজপত্রের ডুপ্লিকেট কপি তোলার চেষ্টা করলে ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই অজ্ঞাত লোক দিয়ে তাকে আবারও তুলে আনেন জুয়েল রানা। রমনা থানায় নিজে বাদী হয়ে বাদিনীর বিরুদ্ধে তথপ্রযুক্তি আইনের একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় বাদিনী ২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে। আর এসব ঘটনায় শিশু ও বৃদ্ধারাও বাদ পড়ছে না। এরুপ পৈশাচিক ঘটনায় বেড়েই চলছে। তবে একজন বিচারকের বিরুদ্ধে যখন ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে তখন বিচারপ্রার্থীরা কোথায় যাবে। সবাই অপরাধের বিচারের দাবিতে বিচারকের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু বিচারক যখন আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ায় তখন বিচার প্রার্থীদের হতাশ হওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ