৯ আশ্বিন ১৪২৫, মঙ্গলবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৯:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ল্যান্ডফোন ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শামীম ওসমানের এক ভোরের গল্প


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:২১ পিএম, ১৩ আগস্ট ২০১৮ সোমবার


ল্যান্ডফোন ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শামীম ওসমানের এক ভোরের গল্প

স্বাধীন বাংলার অবিসাংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে একটি স্মৃতিচারণ বারবারই করেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সভা সমাবেশ ছাড়াও জাতীয় সংসদেও একটি বক্তৃতায় শামীম ওসমান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। তিনি ওই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বার বার বলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনেক বড় মাপের মানুষ যা আমরা এখনো হতে পারি নাই। তাঁর আদর্শ অনুসরণ ও অনুকরণ করা আমাদের প্রয়োজন। তাহলেই সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।’

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে শামীম ওসমান বলেন, ‘ঘটনাটি ১৯৭৪ সালের। একদিন রাতে আমাদের বাসার ল্যান্ডফোন বেজে উঠল। আমি ধরে সালাম দিলাম। অপর প্রান্ত থেকে বেশ ধরাজ কণ্ঠে বললেন, ‘কে রে?’ আমি বললাম শামীম। আবার বললো ‘তোর বাবারে দে’। তখন আমি কথা শুনে কিছুটা থতমত খেয়ে গেলাম। বাবাকে (স্বাধীনতার পদক প্রাপ্ত একেএম সামসুজ্জোহা) বললাম কে যেন ফোন করে বলছে ‘তোর বাবাকে দে’। আমার বাবা কথা শুনেই বুঝতে পারলেন। বাবা বললো, বঙ্গবন্ধু ফোনটা দাও। পরে আমার বাবার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললেন বঙ্গবন্ধু। পরে জানতে পারলাম বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ওই সময়ের মিশরের প্রেসিডেন্ট আসবেন। আর নারায়ণগঞ্জ তখন মাছের জন্য বিখ্যাত। তাই বঙ্গবন্ধু আমার বাবাকে মাছ দিতে বলেছেন। পরে বাবা আমাকে বললো যাবে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। আমি শুনে তো রক্ত গরম হওয়ার মত অবস্থা। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আমি একা মাছ নিয়ে যাবো সেটা শুনে তো সারা রাত আর ঘুমুতে পারি নাই।

পরদিন ভোর ৪টার দিকে সাদা শার্ট আর সাদা প্যান্ট পড়ে আমি আর গাড়িচালক আজগর ভাই দুজন গেলাম ধানমন্ডিতে। ধানমন্ডির ৩২ নাম্বার বাড়ির গেটের সামনে গিয়ে দেখলাম মাত্র দুই জন প্রহরী। আমাদের গাড়ি চালক আজগর ভাইয়ের গলার কণ্ঠস্বর ছিল অনেক ভারী। তিনি বাড়ির সামনের গেটে দাঁড়িয়ে গেট খুলতে বললে পুলিশ খুলতে রাজী হচ্ছিল না।

আজগর ভাই তখন বলেন, আমারে চিন না গেট খুল’। পুলিশ তখন জানায়, আপনাদের চিনে কাজ নাই সাহেব এখনও ঘুমে, পিএস আসে নাই। আমাদের কথা শুনে দেখলাম ভবনের তৃতীয় তলায় বঙ্গবন্ধু সাদা চেকের একটি লুঙ্গি আর গেঞ্জি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে পাইপ। তৃতীয় তলা থেকে তিনি বললেন, কেরে। তখন আজগর ভাই বললো আমরা নারায়ণগঞ্জ থেকে আসছি। বঙ্গবন্ধু বললো কে আজগর রে। উত্তরে আজগর বললো, হু আপনি কী অহন আর আমাদের চিনবেন। এখন তো আপনি রাষ্ট্রপতি। বঙ্গবন্ধু ওপর থেকে বললেন আসছিস, দাঁড়া আমি নামতেছি। কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধু নিচে নেমে এলেন। নিচে এসে আমাকে বললেন কিরে লেখাপড়া ঠিক মত করিস তো। আমি উত্তর দিলাম জী করি। বঙ্গবন্ধু বললেন যা তোর চাচি রান্নাঘরে আছে মাছটি নিয়ে যা। তখন আমার এত রাগ উঠলো। আর মাছটির ওজন ছিল আমার চেয়েও বেশী। পরে পুলিশের সহায়তায় মাছ নিয়ে গেলাম রান্নাঘরে।

‘আমার ধারণা ছিল রাষ্ট্রপতির বাসায় যাচ্ছি, জাতির পিতার বাসায় যাচ্ছি, জাকজমক লাইট দেখবো ভিতরে ঘুরবো, দশটা পাঁচটা ডইংরুম দেখবো, সৌদি আরবের বাদশা যেমন থাকে দুবাইয়ে বাদশা যেমন থাকে আমাদের খালেদা জিয়া কয়দিন আগে যেমন থাকতেন বাথরুমে মধ্যে ফ্রিজ এসি এরকম কিছু একটা হবে ওইরকম চিন্তা করে আমি গেলাম। যে এমন কিছু একটা পাবো যেটা আমি দেখিনি। গেলাম গিয়ে দেখলাম না ওইরকম কিছু না। আমাদের এসপি সাহেব যেমন স্মার্ট ওইরকম পুলিশও দেখলাম না। যা দেখলাম মোটামুটি বেল্ট খুলে যায় এরকম পুলিশ দুই জন দুই’টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়া ওনার বাড়ির সামনে দাড়িয়ে আছে।

পরে আমি বঙ্গবন্ধুর কথায় মাছ নিয়ে গেলাম রান্নাঘরে। কিন্তু আমি অবাক হয়েছি। সেখানে গিয়ে দেখি বঙ্গমাতা রান্নাঘরে রান্না করছে। আমার মাছ নিয়ে তিনি নিজেই কাটতে শুরু করলেন। আমি আরো অবাক হলাম। বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী নিজে রান্না করছে। আমাকে বসতে দিলেন একটি পিড়িতে। আমি তখন বাধ্য হয়েই সেখানে বসলাম। পরে আমাকে নাস্তা হিসেবে খেতে দিল মুড়ি ও খেজুরের গুড়। এটা দেখে আমার কান্না হওয়ার মত উপক্রম হলো। অনেকক্ষন বসে থাকার পর সেগুলো খেলাম। তখন আমাকে আমার মায়ের খোঁজ খবর নিল। কারণ তিনি ও বঙ্গবন্ধু আমার মাকে ভালবাসতেন। যাওয়ার সময়ে আমাকে বঙ্গমাতা বললেন, ঠিক মত লেখাপড়া করিস। আমি চিন্তা করছিলাম বাড়িতে গিয়ে আব্বাকে বলবো আমাকে আর কখনও এ বাড়িতে পাঠাবেন না।’

‘আমরা বের হওয়ার সময়ে বঙ্গবন্ধুকে সালাম করলাম। তিনি আমার মাথায় হাত রেখে বললো ঠিকমত পড়ালেখা করিস কিন্তু। ওই সময়েও আজগর ভাইয়ের কাধে বঙ্গবন্ধুর হাত ছিল। পরে গাড়িতে উঠার পর আজগর চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম নাস্তা করেছেন কী দিয়ে বললো পাউরুটি দিয়ে। বললাম আপনাকে এত বঙ্গবন্ধু ভালোবাসেন কেন। জানালেন, ৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঢাকার কয়েকটি স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। তখন সঙ্গে ছিলেন আজগর। ৬৬ এর পর ৭৪ সালে প্রথম আজগরকে ভাইকে দেখেই চিনে ফেললেন। এটাই আসলে বঙ্গবন্ধু। তিনি কী জিনিস সেটা এখন বুঝেছি।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ