৮ আশ্বিন ১৪২৫, সোমবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ

‘আমাগো বাড়ি থেইক্যা আমাগোরেই বাইর কইরা দিসে’


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৭:৪০ পিএম, ২১ আগস্ট ২০১৮ মঙ্গলবার


‘আমাগো বাড়ি থেইক্যা আমাগোরেই বাইর কইরা দিসে’

পথশিশু।  গায়ে ধুলোবালি মাখা আর পড়নে শতচ্ছিন্ন পোষাকই যার পরিচয়। উষ্কখুষ্ক চুলে এদিন ওদিন দৌড়ে বেড়ানো আর পথচারীদের কাছে ভিক্ষে করেই দিন কাটে তাদের। উঠতি বয়সীদের পা ধরে বসে টাকা আদায় করা কিংবা নারীদের হেনস্থা করার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। কেউ কেউ বিরক্ত মুখে টাকা দিয়ে আপদ বিদায় করে আবার কেউ কড়া ধমকে তাড়িয়ে দেয়। এসকল পথশিশুদের কাছে ঈদ অন্য সাধারণ ৮-১০টি দিনের মতই কেটে যায়।

বুধবার ২২ আগস্ট মুসলমানদের ২য় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব সবার মাঝে উৎসাহ কাজ করলেও পথশিশুদের জন্য তা মোটেও আনন্দের বিষয় নয়। তাদের নেই কোন পরিবার কিংবা উৎসব করার সামর্থ। কেউ পথে ঘাটে আর কেউবা কারো আশ্রয়ে বড় হচ্ছে। ঈদে সমবয়সী ছেলে মেয়েদের গায়ে নতুন জামার দিকে তাকিয়ে তাদের দিন কাটে। মনের ভেতর গোপন ব্যাথা কেউ না পারে বুঝতে কিংবা অনুভব করতে। নির্মম ব্যস্ত পৃথিবী যেন আতœতুষ্টিতেই সদা ব্যস্ত।

নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অন্যান্য পথশিশুদের মতই একজন সোহাগ। গায়ে ধুলোয় ধূসরিত সবুজ শার্ট আর পড়নে কালো প্যান্ট। ডান হাতের কবজিতে পোড়া দাগ খুব সহজেই নজর কেড়ে নেয়। নারায়ণগঞ্জ শহরে বসবাসকারীদের অর্ধেক যখন ঈদের আনন্দ উদযাপন করতে মা-বাবার কাছে ছুটছেন। তখন শহীদ মিনারে বন্ধুদের সাথে ছোটাছুটি করেই নিজের আনন্দ খুঁজে ফিরছে অনাথ সোহাগ। কাছে ডেকে ঈদে কি করবে জানতে চাইলে সোহাগের হাসিমুখ মলিন হয়ে উঠে। ক্ষীণস্বরে জানায় বন্ধুদের নিয়ে মাংশ টোকাতে যাবে।

সোহাগ জানায়, ৫/৬বছর আগেও তাদের বাড়ীতে ঈদের আয়োজন চলত জমজমাট ভাবে। ফতুল্ল¬ায় দোতালা বিল্ডিং ছিল তাদের। ২ বছরের ভেতর তার দাদা ও বাবা মারা যাবার পরে সচ্ছল পরিবার থেকে জীবনযাত্রা নেমে দাঁড়ায় তলানীতে। সোহাগের ভাষায়, দাদা মইরা যাওয়ার পরে আমাগোরে বিল্ডিং থাইক্যা বাইর কইরা দিসে। হেরপরে আব্বায় মইরা যাওয়ার পর আম্মায় কার লগে জানি মিরপুর গেছে গা। এখন আমি আমার নানীর কাছে থাকি।

সোহাগের নানী তাকে নিয়ে ফতুল্লা রেলস্টেশনের পেছনে একটি বস্তিতে বসবাস করে। সোহাগের মায়ের নাম শাহিদা ও বাবার নাম সোহেল। তার খালা গার্মেন্টসে কাজ করার পাশাপাশি তাদের কে কিছু টাকা দিয়ে ভরণ পোষনে সহায়তা করে আসছিল। কিন্তু বেতন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় তার নানী বাধ্য হয়ে এলাকার অন্যান্য পথশিশুদের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ পাঠায়। এখন এই শহীদ মিনারেই ভিক্ষে করে দিন কাটে সোহাগের।

স্কুলে যেঁতে ইচ্ছে করে কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘আমিতো আগে স্কুলে পড়তাম। পাইলট স্কুলের লগে একটা প্রাইমারী স্কুল আছে অই স্কুলে গেছিলাম। কয়েকমাস পড়ে নানী আর যাইতে দেয় নাই। স্কুলের পোলাপানরা আমারে দেখলে এহন টোকাই টোকাই কইয়া ক্ষেপায় তাই আর যাই না। আব্বায় মইরা যাওনের পর কেউ আমার আর খোঁজ নেয় না। আমার লগের বন্ধুগো লগেই আমি থাকি সারাদিন।’

সারাদিনে কত আয় হয় জানতে চাইলে বলেন, প্রতিদিন একশ দেড়শ টাকা আয় হয়। টাকা নিয়া নানীরে দেয়া লাগে। মাঝে মাঝে খিদা লাগলে কিছু কিন্না খাই। তয় এখানে একটা বড় পোলা আছে অয় দেখলে টাকা রাইখ্যা দেয়। টাকা জমায়া রাখছি ঈদের লিগা জামা কিনমু। খালায় কইসে বিকালে আইয়া জামা কিন্না দিব। আর ঈদে কোথায় ঘুরতে যাবে জানতে চাইলে জানায়, এলাকায় কোন আত্মীয় নেই তার। অনেক আগে এক খালার বাসায় গেলেও এখন তার কোন কথা মনে নেই। এখন পাড়ার বন্ধুরাই তার সকল সময়ের সাথী।

তবে ঈদ-উল-আজহার প্রধানতম শিক্ষা হচ্ছে ত্যাগ। মানুষ তার প্রিয় সম্পদ গরীব অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার ভেতরেই আনন্দ খুঁজে পায়। কোরবানীর পশুর সাথে সাথে মনের পশুটাকেও কোরবানী করে অহামিকা দূর করতে পারলে তবেই কোরবানী স্বার্থক। কোরবানী দেয়ার পরে যদি সে পশুর মাংশ পথশিশু বা গরীবদের ঘরে না পৌঁছায় তবে ঈদের পরিপূর্ণ স্বার্থকতা আড়ালেই থেকে যায়। এই ঈদে হাসি ফুটুক গরীবের ঘরে আর তা বজায় থাকুক বছরের সব কয়টি মাস জুড়ে। এমন প্রত্যাশাতেই ঈদ শুভ হয়ে উঠুক ধনী গরীব সকল শ্রেনীর মানুষদের।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ