চাষাঢ়া-শিমরাইল সড়কে দূরন্ত : বাস না বরং খাঁচা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:২৩ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০১৮ রবিবার

চাষাঢ়া-শিমরাইল সড়কে দূরন্ত : বাস না বরং খাঁচা

‘‘এ যেন বাস নয় একটা খাঁচা। নেই কোন ভালো বসার আসন। যা আছে সেগুলো ময়লা ও ধুলা উড়ে আবার কখনো ছাঁড়পোকা কামড়ায়। তার উপর বসতে গেলে পা গুটিয়ে রাখতে হয়। নেই কোন ফ্যান কিংবা লাইট। জানালাগুলোও একটার কাঁচ থাকলে অন্যটার নেই। আর যেগুলো আছে সেগুলোও ভাঙা জোড়া তালি দেওয়া। আর ভিতরের নোংরা ময়লা তো আছেই।’

এবার যাই বাসের বাইরের দিকে। এদিকে তাকালে প্রথমেই নজরে আসে রঙ উঠে যাওয়ায় দেখাচ্ছে বডির ঝং ধরা টিন আর তার উপরে অসংখ্য স্পট। রয়েছে বিভিন্ন দিকে বাসের বডিতে টেপও। এ যেন দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া বাসটিকে কোনভাবে সোজা করা হয়েছে। নেই কোন ইন্ডিকেট লাইট কিংবা স্পষ্ট কোন হর্ণ। সামনের গ্লাসও রয়েছে ভাঙা ও ফাটলের চিহ্ন। আর এসব গাড়িগুলোই চলছে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে শিমরাইল সড়কে অহরহ।

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া থেকে শিমরাইল সড়কে চলাচলকারী দূরন্ত পরিবহন ও শীতলক্ষ্যা পরিবহনের গাড়িগুলো সম্পর্কে বলা হচ্ছিল এতোক্ষণ ধরে। এখানেই শেষ নয় এসব গাড়িতে চড়ে যাত্রীরা যে আরাম আয়েশে থাকেন সেটা হয়তো আর ব্যখা করা প্রয়োজন হবে না। তবে এ দুই পরিবহনে সেবার মান না বাড়লেও বেড়েছে ভাড়া ও ভোগান্তি। প্রতিনিয়ত মানুষ বিভিন্ন ভাবে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

দূরন্ত পরিবহনের চলাচলকারী ২নং ঢাকেশ্বরী এলাকার তাহমিনা আক্তার বলেন, পুরানোর দিনের মুড়ির টিন বাসের মতোই হয়ে গেছে দূরন্ত। ভালোভাবে সিটি বসা যায় না। তার উপর গায়ের উপরে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে। এতো গরম একে তো পাখা নেই তার উপর অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে বাসের ভিতর থেকে ভ্যাপসা গন্ধ বের হয়। যেখানে সেখানে যাত্রী উঠানামা করা হয়।

তিনি আরো বলেন, নারীদের জন্য নিধারীত সিটি থাকলেও সেখানে পুরুষ বসে থাকে। এসব বলতে গেলে প্রতিনিয়ত অপমান অপদস্থ হতে হয়। তাছাড়া ভাড়া ছিল ১০ থেকে ১২টাকা সেখানে বাড়িয়ে করেছে ১৫ টাকা। তারপর আবার বাড়িয়ে করেছে ১৭ টাকা ।কিন্তু ১৭টাকার পর কোন ঘোষণা ছাড়াই ১৮ টাকা করে ভাড়া নেয়। এছাড়াও এক কিলোমিটার রাস্তার যে ভাড়া ৫ কিলোমিটার গেলেও সেই ভাড়াই রাখে। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে বলে বাস থেকে নেমে যান। এসব কিছু কারণে তেমন কোন প্রতিবাদ করা হয় না।

দূরন্ত পরিবহনের অন্য যাত্রী তাজউদ্দিন বলেন, নামেই সিটিং সার্ভিস। আসলে পুরাই চিটিং করছে। যে সিট আছে তাদের একজন বসতে পারবে কিন্তু সেখানে দুইজন বসানো হচ্ছে। বাসে যাত্রী উঠতে পারবে ২০ জন সেখানে যাত্রী নেয় ৩০ থেকে ৩৫ জন। ফলে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা বসে থাকা যাত্রীদের শরীরের উপরে চলে আসে।

শীতলক্ষ্যা পরিবহনের যাত্রী তোফায়েল হোসেন বলেন, এ সড়কের একটি পরিবহনও ভালো না। সবগুলোর গাড়িরই ফিটনেস নেই, মেয়াদ উর্ত্তিন, গাড়ি কিংবা চালকের কারো কোন লাইসেন্স নেই। এসবের কারণে রাস্তার মধ্যে হয়ে যাচ্ছে গাড়ি বিকল। মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। সেই সঙ্গে বিকল গাড়ির কারণে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু আমাদের প্রশাসনের সেই দিকে কোন নজর দিবে না। এসব যানবাহনগুলো বিরুদ্ধে অভিযান চললে ভালো গাড়ি আসবে নাহলে আসবে না।

তিনি বলেন, পরিবহনই আছে এ কয়েকটা। জানি এগুলো একটাও মানসম্মত না। কিন্তু কিছু করার নেই এর চেয়ে ভালো কোন যানবাহন নেই। কিন্তু এগাড়িতেই মাত্র ৭ থেকে ৮ কিলোমিটারের রাস্তায় ভাড়া নেয় ১৮ টাকা। মাঝে মধ্যে ভাংতি নেই বলে ২০টাকাই রেখে দেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ থেকে শিমরাইল পর্যন্ত দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার। এক লেনের রাস্তায় দুই সাড়িতে গাড়ি চলাচল করে। যেখানে রয়েছে বাস, লেগুনা, টেম্পু, সিএনজি, ইজিবাইক ও রিকশা সহ বিভিন্ন ছোট বড় যানাবাহন। আর এসব যানবাহনের ভাড়াও ভিন্ন। তবে অন্য যানবাহনের মধ্যে দূরন্ত ও শীতলক্ষ্যা পরিবহনের যাত্রীদের চলাচল বেশি। এর দুই পরিবহনের ভাড়া নেয়া হয় ১৮ টাকা।

পরিবহন শ্রমিকদের সূত্রে জানা গেছে, দূরন্ত পরিবহনের ৩০ থেকে ৪০টি বাস রয়েছে। এছাড়াও শীতলক্ষ্যা পরিবহনের ১৫ থেকে ১৬টি। এর মধ্যে বিশেষ কিছু পরিবহন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় সময় বিকল হয়ে পরে থাকে রাস্তায়। দুই পরিবহনের অর্ধশতাধিক গাড়ি হলেও নেই কোন নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড। সর্বক্ষনিক রাস্তার উপরে যানবাহন ফেলে রাখা হয়। যার মধ্যে চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের সামনে দূরন্ত পরিবহন ও কালীবাজার এলাকায় শীতলক্ষ্যা পরিবহন। এ দুই জায়গা ছাড়াও রাস্তার বিভিন্ন মোড়েও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

চাকরি চলে যাওয়ার শংকায় নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক দূরন্ত ও শীতলক্ষ্যা পরিবহনের গাড়ি চালকেরা জানান, পরিবহন মালিকেরা ভালো গাড়ি রাস্তা না বের করায় তারাও বাধ্য হয়ে এসব ভাঙাচুরা গাড়িতে কাজ করছেন। এসব গাড়ি প্রায় সময় রাস্তায় অচল হয়ে পরে। যার জন্য যাত্রীদের গালিগালিও তাদের শোনতে হয়। গাড়ি ছোট হওয়ায় ভোগান্তি বেশি কিন্তু মালিক টাকা যায় মানুষের এগুলো দেখা চায় না।

চালকেরা বলেন, গাড়ির ফিটনেস, লাইসেন্স কিছুই নেই। যখনই বিআরটিএ থেকে অভিযান শুরু হয় তখন গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। আবার যখন অভিযান বন্ধ হয়ে যায় তখনই চলে। শুধু মাত্র ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের গাড়ি বলে চলতে পারছে না হলে এগুলো কবেই ডাম্পিংয়ে চলে যেতো। গাড়ি সমস্যা নিয়ে আমরা বলতে গেলে আমাদের গালাগালি করে ও চাকরি ছেড়ে চলে যেতে বলে। তাই আমরা কিছু বলি না।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও