৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫, মঙ্গলবার ২০ নভেম্বর ২০১৮ , ৬:২১ অপরাহ্ণ

rabbhaban

ফুটবলের কারিগর দোলনের স্বপ্ন মেসি, নেইমার, রোনালদো তৈরি করা


সোহেল রানা, স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৩২ পিএম, ১ নভেম্বর ২০১৮ বৃহস্পতিবার


ফুটবলের কারিগর দোলনের স্বপ্ন মেসি, নেইমার, রোনালদো তৈরি করা

ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল স্কাউটিং করার এবং বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত থাকার। সেই ইচ্ছেকে পূর্ণতা দিতে এলাকার যুবকদের একত্রিত করে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “মিশুক মুক্তি স্কাউট” সংগঠন। সে সময় বাংলাদেশে ফুটবল ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। সংগঠনের প্রতিটি সদস্যই সে সময় ফুটবলের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখাচ্ছিল। তাই তিনি সংগঠনের যুবকদের ধরে রাখতে ব্যবস্থা করেন ফুটবল খেলার। কিন্তু সবাই ফুটবল খেলতে পারতো না। তাদেরকে শিখাতেই ফুটবল কিনে শুরু করেন তাদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দেওয়া। সেই শুরু, আর কখনো পেছনে ফিরতে হয়নি তাকে।

তিনি হচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ ফুটবল প্রেমিদের পরিচিত মুখ খলিলুর রহমান দোলন। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় ১৯৬৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। খেলাধুলা জীবনে তেমন সাফল্য নেই তার। তবে ফুটবল প্রশিক্ষক হিসেবে তার রয়েছে বিশাল অর্জন। বাংলাদেশ জাতীয় পর্যায়ে তার হাতে গড়া ১৭ জন খেলোয়াড় খেলায় অংশগ্রহণ করেছে। রয়েছে আবাহনী, মোহামেডানের মত বড় ক্লাবগুলোতে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা।

পাঁচ ভাই পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ছোট বেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালবাসা। তবে খেলোয়ার জীবনে তার ছিলনা তেমন সাফল্য। ১৯৮৫ নিজের স্কাউট সংগঠনের সদস্যদের ফুটবল প্রশিক্ষনের মাধ্যমে শুরু করেন প্রশিক্ষক জীবন। ধীরে ধীরে প্রশিক্ষক হিসেবে ভালো সাড়া পান তিনি। পরবর্তিতে সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে “মিশুক ক্রিড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র” নামে ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন।

চাকরির জন্য ১৯৯০ সালে বাহরাইন চলে যান তিনি। তারপর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন তিনি। ততদিনে ক্লাবটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৮ সালে দেশে ফিরে আবারো শুরু করেন ফুটবল প্রশিক্ষণ। তখনো পর্যন্ত “মিশুক ক্রিড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র” নামেই ছিল ক্লাবটি। ২০০০ সালে নেপালে আয়োজিত একটি টুর্নামেন্টের জন্য ডাক পায় তার দল। কিন্তু নেপালের সংগঠকদের কাছে ক্লাবের নামটি পছন্দ হয়নি। যে কারণে তখন নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দেন “নারায়ণগঞ্জ ফুটবল একাডেমি”।

“নারায়ণগঞ্জ ফুটবল একাডেমি”তে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তিনি ২০০৫ সালে চিটাগাং মোহামেডানে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯-১০ সালে বি লীগে চিটাগাং আবাহনীতে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর সদস্যদের ফুটবল প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ ফুটবল ক্লাবটি থেকে বেরিয়েছে মিঠুন চৌধুরী, লিটন, শংকর চন্দ্র দাসের মত জাতীয় দলে খেলে আসা খোলোয়ার। এখন ক্লাবটিতে রয়েছে ১০০ জন ক্ষুদে খেলোয়ার। তিনি খেলোয়ার জীবনে সাফল্য না পেলেও স্বপ্ন দেখেন ক্ষুদে খেলোয়ারদেরকে মেসি, নেইমার, রোনালদোর মত বিশ্বমানের খোলোয়র তৈরী করার।

তার খেলোয়ার জীবন, প্রশিক্ষক জীবন, বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে তার ধারণা, তার স্বপ্ন ও নানান বিষয় নিয়ে কথা হয় এই প্রতিবেদকের সাথে। শুরুর দিনগুলো নিয়ে তিনি বলেন, যখন শুরু করেছিলাম তখন ভাবিনি এতটা সাফল্য পাবো। তখন সবার মাঝে ফুটবল নিয়ে ভালো আগ্রহ ছিল। সবাই খেলা শিখতে চাইতো। ভালোভালো খেলোয়ার তখন বেরিয়ে এসেছিল।

দোলন বলেন, ‘আমার খেলোয়ার জীবনে তেমন কোনো সাফল্য নেই। আমার যতটুকু পরিচিতি, পুরোটাই প্রশিক্ষক হিসেবে। তাদেরকে নিয়েই আমি স্বপ্ন দেখি মেসি, নেইমার, রোনালদো-এর মত খেলোয়ার তৈরী করার।’

পছন্দের দল ও খেলোয়ার নিয়ে তিনি বলন, আমি দল হিসেবে ব্রাজিলকে সাপোর্ট করি। দল হিসেবে ব্রাজিল বেশ ছন্দে খেলতে পারে তাই ব্রাজিলের খেলা আমার বেশ ভালো লাগে। তবে প্লেয়ার হিসেবে আমার রোনালদোকে ভালো লাগে।

এসময় তিনি আরো বলেন, এক সময় নারায়ণগঞ্জের ফুটবল ছিল অনেক উজ্জল। জাতীয় দল কিংবা যে কোনো ক্লাবে নারায়ণগঞ্জের খেলোয়ারদের আধিপত্য ছিল বেশি। সব জায়গায় অন্তত ৫০ থেকে ৬০ ভাগ খেলোয়ার থাকতো নারায়ণগঞ্জের। আন্ডার সেভেনটিনে বাংলাদেশ জাপানে গিয়েছিল তখন আমার ক্লাবের খেলোয়ার ছিল ৭ জন। আন্ডার ফরটিনে ৯ জন খেলোয়ার ছিল নারায়ণগঞ্জের ফুটবল একাডেমির। অথচ বর্তমানে মাত্র ২ জন খেলোয়ার জাতীয় পর্যায়ে খেলে। যা খুব দুঃখজনক।

এসময় তিনি আরো বলেন, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের ফুটবল প্রায় ধ্বংসের মুখে। নারায়ণগঞ্জের ফুটবলের কোথাও কোনো আধিপত্য নেই। এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে, তার অন্যতম হচ্ছে এখন নারায়ণগঞ্জের কেউ বাচ্চাদের ফুটবল খেলোয়ার বানাতে চায় না। যারা এখন খেলা শিখে তারা খুব গরিব পরিবারের সন্তান। ড্রেস কিনতে পারে না। বুট কিনতে পারে না। সে ক্ষেত্রে তাদেরকে সহযোগিতা করতে হয়। এখানে টাকা পয়সার একটা ব্যাপার আছে । এতদিন আমাদের কোনো স্পন্সার ছিল না। এখন নারায়ণগঞ্জের ফুটবল ক্লাবগুলোর জন্য স্পন্সার পাওয়া গেছে।

ইপিলিয়ন গ্রুপ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে নারায়ণগঞ্জের ১৫টি গ্রুপের সাথে চুক্তি হয়েছে। তারা খেলোয়ারদের জার্সি, প্যান্ট, বল, বুট এমনকি আমাদের বেতনও তারা প্রদান করবে। আশা করি নারায়ণগঞ্জ ফুটবল আবার আগের ঐতিহ্য ফেরত পাবে। আবারো কর্তৃত্ব করবে বাংলাদেশ ফুটবলে। আগামি পাঁচ বছরের মধ্যেই আমর ভালো একটি অবস্থানে যেতে পারবো।

বাংলাদেশ ফুটবল নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে মেয়েরা বেশ ভালো করছে। তাদের নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদি পরিবল্পনা করলে বেশ ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের ফুটবল বেশি দূর এগোচ্ছে না কারণ মাঠ পর্যায় থেকে পরিকল্পনা করা হচ্ছে না। যে সব খেলোয়ার স্ট্রাগল করে ভালো পর্যায়ে যেতে পারে তাদের দিয়ে খেলানো হয়। শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার জন্য, যে খেলতে হবে তাই খেলোয়াড় পাঠাচ্ছি। যদি ছোট থেকে খেলোয়াড় তৈরী করা পর্যন্ত সব ধরণের খেলোয়ারদের নিয়ে পরিকল্পনা করা হয় তবে ভালো ফলাফল আশা করা যায়। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ