সদর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন ডিএনডির খাল দখলে বাঁশের পাইলিং

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪৩ পিএম, ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ সোমবার



সদর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন ডিএনডির খাল দখলে বাঁশের পাইলিং

ঢাকা-নারায়নগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) সেচ প্রকল্প এলাকায় নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে এবং জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৫৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ডিএনডি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন (ফ্রেজ-২)’ শীর্ষক প্রকল্প। ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকার ৯৪ কিলোমিটার খালের মধ্যে অর্ধেক ৫০ কিলোমিটার খাল উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এর মধ্যেও থেমে নেই দখলদারদের দখলদারিত্ব।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয় সংলগ্ন কমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনে খালটি দখল করে বাঁশের আড়গাড়া দিয়েছে প্রভাবশালীরা। খাল দখলের পর চলছে ভরাটের মহোৎসব।

জানা গেছে, ইরি ধান চাষাবাদের জন্য ১৯৬৫ সালে ৮ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমি নিয়ে তৈরি করা হয় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ। ৩২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ডিএনডি বাধের ভেতর ৫৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ২০ লাখ লোকের বসবাস। তখন ডিএনডির ভেতর সেচ প্রকল্প ছিল পাঁচ হাজার ৬৪ হেক্টর। সূত্র জানায়, ডিএনডি বাঁধের ভেতর কংস নদ এবং নলখালী খালের মতো ৯টি খাল ছিল। যা ডিএনডির ইরিগেশন প্রজেক্টে সেচখাল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এসব খালের ছিল আরও ৯টি শাখা খাল। এছাড়াও ছিল ২১০টি আউটলেট, ১০টি নিষ্কাশন খাল। এসব খালের সর্বমোট দৈর্ঘ্য ১৮৬ কিলোমিটার। এ মধ্যে এক কিলোমিটার দীর্ঘ ইনটেক খাল, ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ মেইন ক্যানেল টার্ন আউট খাল রয়েছে। এর মধ্যে চ্যানেল-১ খালের র্দৈঘ্য ৭ দশমিক ৯০ কিলোমিটার, চ্যানেল-২ এর দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটার, পাগলা খাল ৩ কিলোমিটার, জালকুড়ি খাল ২ দশমিক ১০ কিলোমিটার, শ্যামপুর খাল ২ দশমিক ৭০ কিলোমিটার, ফতুল্লা খাল ১ দশমিক ৮০ কিলোমিটার ও সেকেন্ডারী চ্যানেলের দৈর্ঘ্য ১০ কিলোমিটার।

আশির দশকের পর থেকে লোকজন ডিএনডি বাঁধের ভেতর জমি কিনে অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর, ইটের ভাটা, ছোট-বড় শিল্প-কারখানা নির্মাণ করে। কিন্ত জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের রক্ষনাবেক্ষন না থাকায় খাল দখল ও ভরাট করে দোকানপাট, ঘরবাড়ি, কলকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করায় নিচু অঞ্চলের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য স্থাপনার কারণে কংস নদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক আগেই। এ সকল খালগুলোর অধিকাংশই ভরাট হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে অল্প বৃষ্টিতেই হাটু পানিতে তলিয়ে যায়। গেল বছরেও ডিএনডির বেশীরভাগ এলাকাই ছিল ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে। বছরের ৮ মাসই অনেক এলাকার সড়ক থাকে পানির নিচে। শীতকালে শুস্ক মৌসুমেও ডিএনডির অনেক এলাকাতে রয়েছে জলাবদ্ধতা।

এদিকে দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৬ বছরের ৯ আগষ্ট একনেকের সভায় ঢাকা-নারায়নগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) সেচ প্রকল্প এলাকায় নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে এবং জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ৫৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ডিএনডি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন (ফ্রেজ-২)’ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ২০১৭ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রকল্প কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। এসময় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান, ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ আবুল হোসেন বাবলাসহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরপরই প্রকল্পটির বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে সেনাবাহিনীর ২০ ইসিবি, ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ৫৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকার পানি নিস্কাশন ব্যবস্থায় একটি স্থায়ী সমাধান আনয়নের লক্ষ্যে তারা দখলকৃত খাল অবমুক্ত করার কার্যক্রম চালাচ্ছেন।

সম্প্রতি প্রকল্পটির পরিচালক সেনাবাহিনীর লে. কর্ণেল মাশফিক আলম ভূঞা জানিয়েছেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষে হবে আগামী ২০২০ সালে। ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের বেসিক সমস্যা সমাধান করার পর আর পানি জমবে না অর্থাৎ জলাবদ্ধতা থাকবেনা। আমরা সেই ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এছাড়াও এ কাজের জন্য ৫৫৮ কোটি টাকার যে ব্যয় ধরা হয়েছে সেটাও বাড়বে। ডিএনডি প্রকল্পের অধীনে ৯৪ কিলোমিটার খালের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাদের ৫৪ কিলোমিটার বুঝিয়ে দিয়েছে। এখনও ৪০ কিলোমিটার বুঝিয়ে দেয়ার বাকি। এর মধ্যে আমরা ৫০ কিলোমিটার খাল উদ্ধার করে ফেলেছি। ইতোমধ্যে ডিএনডিতে ২৪ দশমিক ৫০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। তবে মূলত এখানে ড্যাম্পিং নেই, খালগুলোর নিচ দিয়ে গ্যাস, বিদ্যুত, ওয়াসার সহ বিভিন্ন লাইন রয়েছে। যার জন্য পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এছাড়াও উচ্চ আদালত থেকে ২৬ জন অবৈধ স্থাপনার মালিক নিষেধাজ্ঞার আদেশ নিয়ে এসেছে। এ ২৬ জন অবৈধ দখলদারের জন্য ২২ লাখ লোকের সমস্যা হচ্ছে। আমরা এসব কিছুই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে কাজ করছি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয় সংলগ্ন কমরআলী স্কুল এন্ড কলেজের পেছনে জলাশয়টির মালিক জনৈক কাশেম জামাল গং। তাদের পক্ষ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামীলীগের একাধিক নেতা বালু ভরাটের কাজ করেছেন। কমরআলী স্কুল এন্ড কলেজের পাশ দিয়ে একটি সড়ক রয়েছে যা ইসদাইরের দিকে গিয়েছে। ওই সড়কে একটি ছোট সংযোগ সেতু রয়েছে যা খালের উপর নির্মিত হয়েছিল। ওই ছোট সংযোগ সেতুর ঠিক পেছনেই খালের মধ্যেই বাঁশের আড়গাড়া দেয়া হয়েছে। এখন সেখানে বালু ফেলা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে স্থানীয় লোকজন ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ। তারা জমির মালিক কাশেম জামাল শুনেছেন তবে তার বিস্তারিত পরিচয় তারা জানেন না। বালু কারা ফেলছে এ বিষয়ে তারা কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি।

জানতে সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসনে আরা বেগম বীনার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

এই বিভাগের আরও