ফের কালচে পানি শীতলক্ষ্যায়

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪৮ পিএম, ৭ জানুয়ারি ২০১৯ সোমবার

ফের কালচে পানি শীতলক্ষ্যায়

বর্ষা শেষ হয়েছে বেশ কয়েক মাস আগে। এর মাঝে নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যার পানি অনেকটাই ছিল টলমলে। তবে গত কয়েকদিন ধরে আবারো সেই পানি কালচে রং ধারণ করতে শুরু করেছে। ফের বের হচ্ছে দুর্গন্ধ।

নদীর আশেপাশে ঘুরে দেখা গেছে, নদীর তীরে মানুষের ঠাঁই দাঁড়ানোও বেশ কষ্টসাধ্য। নাকে রুমাল দিয়েও আটকে রাখা যায় না গন্ধ।

নদীতে শুধু বিভিন্ন কলকারখানার পানি না বরং বিভিন্ন এলাকার লোকজনও বর্জ্য নিয়ে ফেলে দিচ্ছে নদীর তীরে। আর সেগুলোও ধীরে ধীরে গিয়ে পড়ছে নদীতে। বর্ষাকালে নদীর পানি থাকায় পানির বিবর্ণ রঙ কিছুটা মিইয়ে আর কালো রঙ না থাকলেও শীতকালে নদীরে পরিধি যেমন ছোট থাকে তেমনি নদীর পানিও একেবারে ব্যবহারের তো অযোগ্য বটেই পানির সামনেও দাঁড়ানো যায় না।

ব্যবসায়ীদের সূত্র মতে, নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ও আশেপাশ অন্তত ২শ শিল্প কারখানা সহ ডাইং রয়েছে। এছাড়া নদী থেকে দূরে অনেক কারখানারও পানি নিস্কাশনের ড্রেন করে নদীতে ফেলার স্থান তৈরি করা হয়েছে। এসব কারখানার বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই এসব নদীতে এসে পড়ে। তার সঙ্গে এ নদীতে পড়ছে নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলির নাগরিক বর্জ্য।

নারায়ণগঞ্জ সেন্ট্রাল খেয়াঘাট এলাকার ৬০ বছর বয়সী রমজান মিয়া এক সময়ে মাছ ধরতো। তিনি জানান, তিনি ২০ বছর আগেও তিনি মাঝ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে তিনি আর নদীতে মাছ ধরেন না। নদীর যে অবস্থা তাতে মাছ থাকাটাই একেবারে অসম্ভব। সে কারণেই এখন তিনি নৌকা চালান। আর নৌকা চালাতেও বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বর্ষাকালে গন্ধ কম থাকলেও শীতকালে কখনো কখনো বমি আসার উপক্রম হয়।

নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সমন্বয়ক মোস্তফা করিম বলেন, ‘বিভিন্ন শিল্প কারখানা, ব্যক্তি মালিক সহ আমরা সবাই কোন না কোনভাবে শীতলক্ষ্যাকে দূষণ করছি। নির্ধিদ্বায় আমরা বর্জ্য, বাড়ির সুয়ারেজের পানি নদীতে ফেলে দূষণের মাত্রা বাড়াচ্ছি। আর যেসব সরকার প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মকর্তারা ‘নদীকে বাঁচাতে হবে’ বার বার বলে তারাও কাজের ক্ষেত্রে যথার্থভাবে এগিয়ে আসতে পারছে না। দূষণ রোধে আমাদের সকল সরকারী দফতর, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্প কারখানা মালিকদের সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’

শীতলক্ষ্যা দূষণ রোধে নিয়মিত কর্মসূচী পালন করা পরিবেশবাদী সংগঠন নির্ভীকের প্রধান সমন্বয়ক এটিএম কামাল জানান, আমরা বহু বছর ধরে আন্দোলন করলেও কার্যত কোন সুফল পাচ্ছি না। বরং দিন দিন দূষণ বেড়েই চলেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও কারখানা স্থাপনের কারণেই এ দূষণ হচ্ছে। আমরা শুধু বক্তব্য, গোলটেবিল বৈঠক, সভা সেমিনার করে দূষণের কারণ বললেও এগুলো রোধে কোন উদ্যোগ নেই।

পরিবেশ অধিদফতর নারায়ণগঞ্জ জোনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, অনেক কারখানার ইটিপি প্লান্ট তৈরি করা আছে। জরিমানা কিংবা প্রশাসনিক ঝামেলা এড়াতে ইটিপি প্লান্ট নির্মাণ করে রাখলেও সেটা ব্যবহার করে না। কারণ অনেক মালিকের দাবী, এটা ব্যবহার করলে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা খরচ হয়। সে খরচ বাঁচাতেই বিকল্প পাইপ দিয়ে অনেক ডাইং ও শিল্প কারখানা মালিকেরা তাদের কেমিক্যালযুক্ত পানি সরাসরি নদীতে ফেলে দিচ্ছে। আর রাতে এ কাজটি বেশী করায় প্রায়শই তাদের ধরা যাচ্ছে না। আমরা যখন দিনের বেলায় কারখানা পরিদর্শনে যাই তখন দেখানো হয় ইটিপি প্লান্ট আছে। আর অনেক কারখানা এখন প্লান্টের পাশে বিশাল আকৃতির ট্যাংকি করে রাখে। এখানে দিনের বিষাক্ত পানি জমা করে রাখে যা সন্ধ্যার পর কিংবা গভীর রাতে নদীতে ছেড়ে দেয়।

নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদফতর সূত্র মতে, নারায়ণগঞ্জে ৩৬৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে তরল বর্জ্য নিস্কাশন হয়। এর মধ্যে এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বা ইটিপি আছে ২৪৭টির। ২৮৭ ডাইং কারখানার মধ্যে ইটিপি নির্মাণাধীন ২৯টির। বাকি কারখানার দূষিত পানি গিয়ে পড়ছে নদীতে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও