নারায়ণগঞ্জের ঐশ্বর্য আছে সৌন্দর্য নাই

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৮ পিএম, ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার

নারায়ণগঞ্জের ঐশ্বর্য আছে সৌন্দর্য নাই

নারায়ণগঞ্জ জেলা দেশের অন্যান্য জেলা থেকে একটু আলাদা। অর্থ-বিত্ত আর বৈভবে এই জেলার নাম উঠে আসে প্রথম সারিতে। অন্যান্য সুনামও রয়েছে এই জেলায়। অনেক ঘটনার জন্ম এই জেলা থেকেই হয়েছে। তাই নাম আর সুনাম ধরা দিয়েছে এই জেলার উপর।

সমালোচকদের মতে এই জেলার ঐশ্বর্যসহ অনেক কিছু রয়েছে। যা অন্যান্য জেলার মধ্যে নেই। কিন্তু ছোট ছোট অনেক বিষয় আছে যার কারণে এই জেলা ঢাকার অতি নিকটে হওয়ার পরও বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। এই ছোট বিষয়গুলো এমন যা আমরা উদ্যোগ নিলেই পারি। শুধু দরকার একটি সিদ্ধান্ত, সচেতনতা আর সদিচ্ছার।

সংসদ নির্বাচন গেল এক মাস হয়ে গেছে। অথচ পোস্টার আর পোস্টারে ছেঁয়ে আছে সারা নারায়ণগঞ্জ। সড়ক গুলোর পাশে ঝুলে থাকা এসব পোস্টারের পরদে পরদে পড়ছে ধুলা আর ময়লা। সাদা পোস্টারের উপরে যে পলি যোগ হয়েছে তাতে বিন্দু বিন্দ শিশির জমে মহাসিন্দু হয়ে যাচ্ছে। অথচ কারো সাধ্য নেই এসব পোস্টার নামানো। প্রার্থীর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে জেলাবাসী।

সড়কের প্রতিটি দোকানের উপর শোভা পাচ্ছে বড় বড় সাইনবোর্ড। যা জীবনে একবার লাগানোর পর আর কোন দিন হাতদেন না মালিক পক্ষ। এতে তাদের কষ্ট কমলেও কষ্ট বেড়ে গেছে পথচারীদের। যারা বাধ্য হয়ে দেখছে এবং দৃষ্টি নন্দনের পরিবর্তে দৃষ্টি কটুতে ভুগছে। অন্তর্জালা পোহালেও বলার কোন সুযোগ নাই। ‘আমার বাপের জায়গায় লাগাইছি আপনে বলার কে।’ এমন কথা শুনে কান ঝালাপালার চেয়ে দুষ্টি কটুই হাজার ভাল।

দোকানের উপরের সাইনবোর্ড না হয় বাদ দিলাম। সড়কের মোড়ে মোড়ে শোভা পাচ্ছে রং, বে-রং এর হাজার হাজার সাইনবোর্ড। যা কোনটা ছেঁড়া, কোনটা ঝুলে আছে ত্যাড়া বাঁকা হয়ে। কোনটা বানান ভুল, আবার কোনটার বিকৃত ছবি যুক্ত, কোন কোনটার কটকটে রং যা চোখের প্রশান্তির বদলে দেয় অশান্তি।

তার বাইরে অমুক নেতা, অমুক ভাই, অমুক কাউন্সিলর, অমুক সভাপতির শুভেচ্ছা তো নির্বাচনী পোস্টারের মত কোন কোন স্থানে বেঢক (অসুন্দর) দেখার প্রতিযোগীতায় নেমেছে। যা রীতিমত অসৌজন্য আচরণ করছে পথচারী এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে। এগুলো যে সস্তা প্রচার তা সবাই বুঝলেও বলতে পারছে না কেউ।

সরকারী অফিসের সাইনবোর্ডেতো নেই কোন সৌন্দর্য। একেকটার একেক সাইজ। একেকটার একেক রং এর। একেকটা একেক ধরণের নির্মাণ শৈলীর। যা তাদের রুচিকে কোথাও কোথাও খাটো করে দেয় দর্শনার্থীর কাছে।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-পাগলা সড়ক, শিমরাইল-আদমজী-নারায়ণগঞ্জ সড়ক, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ডেমরা-শিমড়াইল সড়ক, কাঁচপুর-সিলেট সড়ক, মদনপুর-মদনগঞ্জ সড়ক, মদনপুর-আড়াইহাজার সড়ক সহ সবগুলো সড়কে রয়েছে ময়লার ভাগাড়। এক জায়গা বা দুই জায়গায় নয়, সড়া সড়কেই ময়লা আর আবর্জনার ভাগাড়। কোথাও কোথাও ময়লা ফেলার জন্য প্রশাসনের স্বীকৃতিও রয়েছে। তার মানে সড়কে ময়লা ফেলার লাইসেন্সও দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

এসব কিছুর বাইরেতো সড়কের ধুলা-বালি রয়েছে। সড়ক দ্বীপের গাছ সহ ফুটপাতের গাছের পাতায় পাতায় বালুর আস্তরে বির্বণ হয়ে যাচ্ছে গাছ-পালা। ধুলার আবরণে গাছের প্রকৃতি বুঝা দায় হয়ে যায় মানুষের কাছে।

এই শ্রী এর জন্য জেলার অনেক কিছুই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। জেলার সৌন্দর্যতো হারাচ্ছেই বলতে গেলে জেলাকে অসুন্দর করে তুলছে আমাদের এসব অসচেতনতা। এর জন্য দায় আমাদের নেয়া ছাড়া কোন উপায় নাই। কারণ মেয়র এবং সংসদ সদস্যরাতো এই জেলার অধিবাসী। বাকীরা না হয় অন্য জেলা থেকে চাকরি সুবাধে এই জেলায় কিছু দিনের জন্য এসেছে।

ভাগ্যের কী পরিহাস মেয়রও এই দায় নিতে চান না। তিনি চাপিয়ে দিয়েছেন সংসদ সদস্যদের উপর। সংসদ সদস্যরাতো অনেক আগে থেকেই এই দায় মেয়রের উপর চাপিয়ে দিয়ে বসে আছেন। যত ঠেলাঠেলি সব সাধারণের উপর।

উল্লেখ্য নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী বলেছেন, বঙ্গবন্ধু রোডে হকাররা বসার পর ওরা যখন চলে যায়, তখন কি পরিমাণ পলিথিন পরে থাকে রাতের বেলা গেলে দেখা যায়। মনে হয় যেন পলিথিনের শহর পলিথিনের নগরী। আমার প্রশ্ন, এই হকার বসিয়ে সুবিধাভোগী কারা। কারা হকারদের থেকে চাঁদা তোলে। এই যে হকাররা বলে পলিথিন ফেলে রেখে। মনে হয় ও একজন জমিদার, এই জমিদার তার ইচ্ছানুযায়ী সবকিছু ফেলে রাখবে, আর আমরা সকালে উঠে পরিস্কার করবো। তাই হচ্ছে, এটা আমরা দেখছি। এটার জন্য আমাকে আক্রমন করা হলো এবং সিটি কর্পোরেশনকে দোষ দেয়া হল। কার এত বড় স্পর্ধা, এটা দেখার দায়িত্ব সকল নাগরিকদের।

৩১ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের ‘‘পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে ছাত্র সমাজের ভূমিকা’’ শীর্ষক রচনায় প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আইভী বলেন, সরকারী চাকরী যারা করে তারা মনে করে সরকারি একটা জব হয়ে গেলে তাদের কেউ ছাঁটাই করতে পারবে না। প্রাইভেট জবগুলোতে তো কথায় কথায় ছাঁটাই হয়। কিন্তু সরকারি চাকরী যারা করে তারা মনে করে একবার চাকরী পেয়ে গেলে আমাদের আর পায় কে।

সিটি কর্পোরেশনের জরিমানা বাড়ানো উচিত বলে উল্লেখ করে ডা. সেলিনা হায়াত আইভী বলেন, মার্কেটের লোকেরা সকালবেলা দোকান খুলে ময়লাগুলো রাস্তায় ফেলে। এটা বন্ধ করার জন্য আমি মার্কেটের লোকদের সাথে কথা বলেছি কয়েকবার। তারা কথা দিয়ে যায় কিন্তু কথা রাখে না। এইজন্য আমি মনে করি জরিমানার পরিমাণ বাড়াতে হবে। আমাদের সিটি কর্পোরেশনে ৫ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারিত আছে। ৫০ হাজার টাকা করার দরকার। জরিমানার উপরে কোন ওষুধ নাই। কারণ সিঙ্গাপুর এমনিভাবে সিঙ্গাপুর হয় নাই। যতই সচেতনতার কথা বলি না কেন কোন কাজ হচ্ছে না।

আইভী বলেন, ‘কাউন্সিলরদের অনুরোধ করছি আপনারা আপনাদের ওয়ার্ড পরিস্কারে নামেন। পুরস্কারের ঘোষণাও দিয়েছি। কিন্তু কাউন্সিলররা আমার কথা শুনে না। আমরা এত বেশি রাজনীতি পছন্দ করি, মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজেদের স্বার্থের কারণে রাজনীতিকে বেছে নেই। এই বেছে নেয়ার কারণে জনগণের চাহিদার প্রতি নজর না দিয়ে ব্যক্তিগত চাহিদার দিকে নজর দেই। আর ৫ বছর পরে গিয়ে নাগরিকদের হাতে পায়ে ধরে ভোট চাই। কাউন্সিলররা যদি মনে করে সে তার ওয়ার্ড পরিস্কার রাখবে, কারও ক্ষমতা নেই বাধা দেয়ার। আমি ২৭টি ওয়ার্ডে গিয়ে তো আর তদারকি করতে পারবো না। আমাদের সে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্দিষ্ট জায়গায় ময়লা রাখতে হবে। কর্মীদের সুবিধা হবে।’

সিটি কর্পোরশেনের ময়লা ফেলার জায়গা নেই উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ময়লা ফেলার নির্ধারিত জায়গার জন্য আমাকে অনেক ফাইট করতে হয়েছে। সকল সরকারেরই দায়িত্ব ছিল সিটি কর্পোরেশনকে ময়লা ফেলার জায়গা দেয়া। আমরা ডাম্পিং এর জায়গা পাই না। অথচ বড় বড় কোম্পানী চাইলে ঠিকই দিয়ে দেয়া হয়। খেলাধুলার জন্য জায়গা চেয়ে জায়গা পাই না। গ্রীণ শহরের ঘোষণা দেয় কিন্তু জায়গা পাই না।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও