সীমাহীন বিলাসিতায় অপমৃত্যু

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:১৪ পিএম, ৯ মার্চ ২০১৯ শনিবার

সীমাহীন বিলাসিতায় অপমৃত্যু

তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে দ্রুত বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে পৃথিবীর মানুষগুলোর মন, চিন্তা-চেতনা আর মূল্যবোধ। সেই সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে মানুষের চাওয়া পাওয়া। কখনও কখনও সেই চাওয়া পাওয়া সীমাহীন বিলাসিতায় পরিণত হয়। আর এই সীমাহীন বিলাসিতার পরিণাম ঘটছে অপমৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। গত কয়েক মাসের ব্যবধানের নারায়ণগঞ্জের দুইটি আলোচিত ঘটনা তারই প্রমাণ বহন করে।

মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে ছিলেন নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মাহমুদ পলাশ। পরিবারের চাহিদা মেটাতে বাবা পিয়ার জাহান দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান। স্বপ্ন দেখতেন দেশের বাহিরে গিয়ে বহু কষ্টে অর্জিত টাকা দিয়ে ছেলে সন্তানকে উচ্চ শিক্ষিত করবেন এবং শেষ বয়সে পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে দিন যাপন করবেন। কিন্তু তার ছেলে মাহমুদ পলাশ বাবার অর্জিত টাকা দিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। তার বাবার চেয়েও বেশি টাকা দরকার। ফলে দাখিল (এসএসসি) পাশ করার পরই তিনি বাবা মায়ের অবাধ্য বাড়ি ছেড়ে চলে যান।

মাহমুদ পলাশ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরই অনেক দিন কোন খোঁজ খবর ছিল না। হঠাৎ করেই তার পরিবার জানতে পারে যে তিনি চিত্র নায়িকা শিমলাকে বিয়ে করেছেন। পলাশের এই খবরে পরিবারের সদস্যরা কিছুটা স্তস্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু পলাশের কপালে সেই সুখ আর সইলো না। শেষ পর্যন্ত গত ২৪ ফেব্রুয়ারী বিমান ছিনতাইয়ের অভিযোগে সেনবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে নিহত হয়।

পরবর্তীতে পলাশ সম্পর্কে জানাতে গিয়ে তার বাবা পিয়ার জাহান জানান, মাহমুদ পলাশ তাহেরপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা থেকে ২০১২ সালে দাখিল পরীক্ষা দিয়ে পাস করে। দাখিল পাস করে সে সোনাগাঁও ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে পড়া অবস্থায় সে ঢাকায় চলে যায়। তারপর থেকে তার আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়। এক পর্যায়ে জানা যায়, পলাশ নাকি ঢাকায় চলচ্চিত্রে কাজ করার চেষ্টা করছে। তখন বাড়ির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না। মাঝে মাঝে বাড়িতে আসলেও এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশতো না, কথা বলতো না।

তিনি বলেন, পলাশ ২০১৪ সালে বগুড়া সদর উপজেলায় মেঘলা নামের এক মেয়েকে প্রথম বিয়ে করে। তাদের সংসারে আড়াই বছর বয়সি আয়ান নামে একটি পুত্র সন্তান আছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে শিমলা নামে এক মেয়েকে রাতের বেলা বাড়িতে নিয়ে আসে পলাশ। মেয়েটিকে চিত্রনায়িকা ও তার প্রেমিকা বলে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। দুই মাস পর আবার শিমলাকে বাড়িতে নিয়ে এসে বিবাহিত স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেয়। বিয়ের কথা শিমলাও আমাদের কাছে স্বীকার করে।

ওই রাতেই তারা আবার ঢাকায় চলে যায়। আমরা শিমলাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, তাকে বলেছি আমার ছেলেকে যেন ভালো পথে ফিরিয়ে আনে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেটি অবাধ্য ছিল। পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে প্রবাস থেকে আমার পাঠানো টাকা সে নানা পথে খরচ করেছে।

এদিকে মৃত্যুর পর চিত্র নায়িকা শিমলা জানিয়েছেন, কয়েক মাস আগেই পলাশের সাথে তার ডিভোর্স হয়ে গেছে। পলাশের ফেসবুক একাউন্ট থেকে দেখা যায় সর্বশেষ যে পোস্টটি তিনি করেছিলেন তা ছিলো কারো প্রতি প্রতি ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টা ৩মিনিটে শেষ পোস্টে তিনি লিখেছিলেন ‘ঘৃনা নিশ্বাসে প্রশ্বাসে’। তবে এখানে কার প্রতি তার এত ঘৃণা তার নাম উল্লেখ করনেনি তিনি।

ঠিক এরকম উচ্চ বিলাসিতার স্বপ্ন থেকেই মৃত্যু হয়েছে মডেল অভিনেত্রী মাহমুদা আক্তার ওরফে তানিশার। তিনিও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ছিলেন। স্বপ্ন দেখতেন অনেক বড় হওয়ার। আর সেই স্বপ্ন একসময় উচ্চ বিলাসিতায় পরিণত হয়। যার পরিণাম ঘটে অপমৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। গত বছরের ৩০  জুলাই রাতে গোগনগর আলামিন নগর এলাকার মোহাম্মদ আলী আকবরের তিন তলার ভবনের নিচ তলার ফ্ল্যাট বাসা পচন ধরা অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পুলিশ জানায়, মাহমুদা আক্তারের আগে একটি বিয়ে হয়েছিল। আগের সংসারে রিয়ানা রহমান জারা নামের ৪ বছরের এক মেয়ে সন্তান ছিল। পরবর্তীতে প্রথম স্বামী হাফিজুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে বিচ্ছেদের পর টপ টেনে চাকরির সুবাধে মাহমুদার সঙ্গে পরিচয় হয় সাগর ইসলাম বাপ্পীর সাথে। বাপ্পীও বিবাহিত ছিল। ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ক গভীর হয়। পরে দুই জনে মিলে গোগনগর আলামিন নগর এলাকার মোহাম্মদ আলী আকবরের তিন তলার ভবনের নিচ তলার ফ্ল্যাট বাসা নেয় তারা।

বাপ্পী মূলত মাহমুদাকে উচ্চবিলাসের স্বপ্ন দেখায়। তার মাধ্যমেই মাহমুদা জড়ায় মডেলিংয়ে। নামও পরিবর্তন করে তানিশা রাখেন। বাপ্পীর পরিচিত জনদের মাধ্যমে কাজ শুরু করে বিভিন্ন নাটকে। এর মধ্যে একাধিক গানেরও মডেল হয় সে। ধীরে ধীরে স্বপ্ন দেখে শোবিজ জগতে কিছু একটা করে আলোড়ন সৃষ্টি করবে। এসব কারণে একমাত্র মেয়ে জারাকেও সময় দিত না। তাকে রেখে দেয় মাহমুদার বাবা ও মায়ের কাছে। অথচ মাহমুদার বাবা ছিলেন দেওভোগ নাগবাড়ীতে ডায়াবেটিক হাসপাতালের প্রহরী।

কিন্তু মাহমুদার সেই আলোড়ন সৃষ্টি করার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। পরবর্তীতে পচন ধরা অবস্থায় পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। একই সাথে ওই বছরের ৩১ জুলাই পুলিশের অভিযানের সময়ে বাপ্পীও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও