প্রশাসনের অভিযানেও নগরীর অভিজাত ক্লাবগুলোতে জুয়া বন্ধ হচ্ছে না

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:২৪ পিএম, ৯ মার্চ ২০১৯ শনিবার

প্রশাসনের অভিযানেও নগরীর অভিজাত ক্লাবগুলোতে জুয়া বন্ধ হচ্ছে না

দেড় বছরের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জের একাধিক ক্লাব সহ বিভিন্ন স্পটে হানা দিয়ে অসংখ্য জুয়ারীকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়া সিটি ক্লাব, ইয়ার্ন মার্চেন্ট ক্লাব সহ কয়েকটি অভিজাত ক্লাবে হানাও দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত ও পুলিশ প্রশাসন। তবে প্রশাসন দফায় দফায় অভিযান চালালেও বন্ধ হচ্ছেনা জুয়ার আড্ডা। বরং প্রশাসনের অভিযানের পর পরই আবারো বসছে জুয়ার আড্ডা। এছাড়া বেশ কিছু জুয়ার আড্ডায় জুয়া খেলা ছাড়াও অবাধে মাদক সেবনও চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই সকল জুয়ার আড্ডা পরিচালনাকারীরা সমাজে ভাল মানুষের মুখোশ পড়ে প্রশাসনের অসাধু কর্তাব্যক্তিদের ম্যানেজের মাধ্যমে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে ওইসকল জুয়ার আড্ডা পরিচালনাকারীরা বার বারই রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরেই। জুয়া চক্রের খপ্পড়ে পড়ে সর্বশান্ত হচ্ছে অনেক পরিবার।

সর্বশেষ ৮ মার্চ সন্ধ্যায় সুতা ব্যবসায়ীদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের টানবাজারস্থ কার্যালয়ে অবস্থিত ইয়ার্ন মার্চেন্ট ক্লাব থেকে ১২ জুয়ারিকে গ্রেপ্তার করে সদর মডেল থানা পুলিশ। এসময় কার্যালয়ের ৫ম তলায় অবস্থিত হোটেলের ৩ কর্মচারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার উপ-পরির্দশক রুপম ও সহকারী উপ-পরির্দশক সামসুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি টিম বিশেষ অভিযান চালিয়ে এদেরকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তারকৃতরা  হলো আয়কর অফিসের চাকরীজীবি মেহেদী হাসান ও রহমতউল্লাহ, ডাচ বাংলা ব্যাংকের চাকরীজীবি শুভ সাহা, আটা ময়দা ব্যবসায়ী মোঃ শামীম, হোসিয়ারী ব্যবসায়ী মজিবুর রহমান, সুতা ব্যবসায়ী রুহুল আমিন, সাঈদ, আব্দুর রহমান, খবির ও সুমন, ইট বালু ব্যবসায়ী লিটন, ড্রাইভার আবুল হোসেন, ক্লাবের বাবুর্চি আনোয়ার, কিচেনের কর্মচারী জয়, ক্লাবের স্টাফ রানা।

অভিযান পরিচালনাকারী সদর মডেল থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. সামসুজ্জামান বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ইয়ার্ন মার্চেন্টের অভিযান চালিয়ে ১৫জনকে গ্রেপ্তার করি যাদের মধ্যে কয়েকজন স্টাফও রয়েছেন। কোন টাকা পেয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই টাকা ও প্লেইং কার্ড পেয়েছি তবে টাকার পরিমানটা না গুনে বলতে পারবোনা। ওই ঘটনায় এএসআই সামসুজ্জামান বাদি হয়ে সদর মডেল থানায় মামলা দায়েরের পর গ্রেফতারকৃতদের শনিবার সকালেই আদালতে পাঠানো হয়েছে। এদিকে ৫ মার্চ মাদক ব্যবসায়ী ও জুয়ারীদের হাত থেকে রেহাই পেতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ ও নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা ওসির কাছে অভিযোগ করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ঋষিপাড়া এলাকাবাসী। এসময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা হামিদুর রহমান বাঙালী, মো: মোস্তফা, কাশীনাথ বাবু, মো: নঈম উদ্দিন, মো: সফুর, সূর্য দাস, সুমন মোল্লা ও শ্যামল দাস সহ গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। অভিযোগে বলা হয়, মাদক ব্যবসায়ীরা জামিনে বের হয়ে ফের এলাকায় মাদক ব্যবসা শুরু করেছে। তারা প্রকাশ্য ইয়াবা, গাজা, বিক্রি করছে। একই সাথে রাতে জুয়ার আসর অব্যাহত রেখেছে। এ ব্যাপারে পঞ্চায়েত কমিটি বাধা দিলে তাদেরকে বহিরাগতদের দিয়ে নানা রকম ভয়ভীতি দেখায়।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারী রাতে ডিবি পুলিশের ব্লক রেইড পরিচালিত হয়। উক্ত অভিযানে  নারায়ণগঞ্জ শহরের ৫ নং ঘাট এলাকা, কালিরবাজার, বঙ্গবন্ধু সড়কের আশে পাশের এলাকায় এবং সাইনবোর্ড এলাকায় বিভিন্ন জুয়ার আসর হতে ৪০জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ হতে ৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া সাইনবোর্ড এলাকার শাপলা আবাসিক হোটেলে অভিযান পরিচালনা করে অসামাজিক কার্যকালাপের জন্য ৩ জন নারী সহ মোট ১০ জন পুরুষ আটক করা হয়। ৪০ জুয়ারী গ্রেফতারের ঘটনায় ডিবির এস আই আলমগীর কবির বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারী দুপুরে তাদের আদালতে পাঠানো হয়। পরে আদালতে শুনানী শেষে প্রত্যেককে এক হাজার টাকা করে অর্থদন্ড করে জামিন প্রদান করা হয়। মামলায় জুয়া বোর্ডের প্রধান শাহজাহান সহ অজ্ঞাত ১০-১৫জনকে আসামী করা হয়েছে।
 
২০১৮ সালের ১০ মার্চ সকালে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের (বিবি রোড) কালিরবাজার এলাকায় অবস্থিত আমান ভবনে একটি জুয়ার স্পটে অভিযান চালিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় জুয়াড়িরা পালিয়ে গেলেও তাদের ফেলে যাওয়া তাস জব্দ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওই স্পটটি নিয়ন্ত্রন করে ডিস ব্যবসায়ী শামীম ওরফে পিজা শামীম। তার বাড়ি চাষাঢ়া এলাকাতে। তিনি প্রভাবশালী একজন এমপির বন্ধু পরিচয় দেন নিজেকে। এছাড়া তিনি ওই বন্ধুর পরিচয়ে একটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতেও ছিলেন।

ওই সময়ে জেলার এনডিসি জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র জানান, অভিযানকালে অনেকগুলো তাসকার্ড পাওয়া গেছে এবং এখানে জুয়া খেলা হয় বলে আমাদের কাছে সংবাদ ছিল। পরবর্তী এ ধরনের কোন কিছু পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরো জানান, অভিযানের সংবাদ পেয়ে সকলেই পালিয়ে গেছে। দুজন ম্যানেজারকে পাওয়া গিয়েছিল তাদের সতর্ক করা হয়েছে। কোন ধরনের অপকর্ম অন্যায় যেন এখানে না হয়।  

২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের কালিরবাজার স্বর্নপট্টিতে জুয়া খেলাসহ অনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধের দাবিতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে স্মারকলিপি দেন স্বর্ণপট্টি এলাকার ব্যবসায়ীরা। স্মারকলিপিতে ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করেন, স্বর্ণপট্টি এলাকায় কতিপয় ব্যাক্তি একাধিক বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে জুয়ার আসর বসিয়েছে। ওইসকল জুয়ার আসরে জেলার বিভিন্ন থানা এলাকার সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজসহ নানা ধরনের অপরাধীরা প্রতিনিয়ত আসা যাওয়া করছে। এছাড়া গভীর রাতে মদ পান করে হৈ চৈ করে এলাকার শান্তি নষ্ট করছে। বাঁধা দিতে গেলে বিশেষ পেশার পরিচয় এমনকি এমপি রাজনৈতিক নেতাদের লোক বলে পরিচয় দিচ্ছে ও ভয়ভীতিসহ হুমকী দিচ্ছে।
 
গত ২০১৭ সালের ৮ অক্টোবর রাতে কালিরবাজার সিটি ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ২১ জুয়ারীকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পরে গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় ১৮৬৭ সনের জুয়া আইনের ১১ ধারায় মামলা দায়ের করে পুলিশ। ওই সিটি ক্লাবের পরিচালনাকারী হলেন ডিস ব্যবসায়ীদের নেতা শামীম ওরফে পিজা শামীম। ওই সময়ে গ্রেফতারকৃতরা হলো সোনারগাঁয়ের হামসাদী এলাকার জয়নালের পুত্র মোঃ শান্ত (৩২), শহরের খোয়ারপট্টি এলাকার শাহআলমের পুত্র আরমান (২৫), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের পশ্চিম সুবিখালীর আমিজ আকন্দের পুত্র ও ফতুল্লার পোষ্টঅফিস ইছাখালির বাড়ির ভাড়াটিয়া দুলাল (৩৬), ফতুল্লার কানাইনগর এলাকার কদম আলী মিয়ার ছেলে সৈয়দ হোসেন (২৮), বরিশালের ধোপাকাঠি এলাকার শাহজাহানের ছেলে ও উত্তর চাষাঢ়া নিবাসী রিয়াদ (২৮), বন্দর রেললাইন এলাকার মৃত মজিদ শেখের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (৪০), বন্দরের কুশিয়ারা এলাকার মৃত জালাল উদ্দিনের ছেলে পনির হোসেন (৩৮), ফতুল্লার ভূইগড় এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে শরীফ হোসেন (২৫), শহরের কিল্লারপুল এলাকার মোঃ সুলতানের ছেলে রুবেল হোসেন (২০), ফতুল্লার চিতাশাল মুসলিমপাড়া এলাকার আব্দুল মালেকের ছেলে আলাউদ্দিন (৪৬), ফতুল্লার কাইউমপুর এলাকার মৃত সোনাব আলীর ছেলে মুসা (৪৮), ফতুল্লার চিতাশাল এলাকার জাহাঙ্গীরের ছেলে মোহাম্মদ আলী (২৬), ফতুল্লার নয়ামাটি এলাকার মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ ইব্রাহীম (৪৪), ফতুল্লার সবুজবাগ এলাকার আলী হোসেনের ছেলে রানা (২০), শহরের মিশনপাড়া এলাকার মৃত মিলন খানের ছেলে আউয়াল (৩৬), শহরের মিশনপাড়া এলাকার চান মিয়ার ছেলে ইসলাম (৩৫), ফতুল্লার লালপুর এলাকার তোতা মিয়ার ছেলে মোঃ নাসির হোসেন (৩০), শহরের নিউ খানপুর এলাকার মোঃ হোসেনের ছেলে রমজান মিয়া (৩৪), দিনাজপুর ভবানীপুর এলাকার মৃত চান মিয়া শেখের ছেলে ও মিশনপাড়া নিবাসী মাইনুল হোসেন (২৭), শহরের খানপুর এলাকার মৃত অমূল্য রতন সাহার ছেলে দুলাল কৃষ্ণ সাহা (৪০), বন্দরের একরামপুর এলাকার মৃত সিকিম আলীর ছেলে বাবুল (৪৫)।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন অভিজাত ক্লাব ও ফ্ল্যাটবাসায় বিভিন্ন সংগঠনের কার্যালয়ে অবাধে চলছে জুয়ার আড্ডা। শহরের নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন ও বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকাতেও একাধিক জুয়ার স্পট রয়েছে। এছাঢ়া শহরের চাঁদমারী, ঋষিপাড়াসহ শহরতলীতেও রয়েছে অসংখ্য জুয়ার স্পট।  জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালত কিংবা পুলিশ প্রশাসন অভিযান চালানোর কয়েকদিন পর থেকেই আবারো ওইসকল জুয়ার আড্ডাতে জমজমাটভাবেই জুয়ার আসর বসছে। অভিযানের পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তারা ওই সকল জুয়ার আড্ডা পরিচালনাকারীদের থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের মাধ্যমে শেল্টার দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও