যা ঘটেছিল সেই রাতে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৫ পিএম, ১৪ জুন ২০১৯ শুক্রবার

যা ঘটেছিল সেই রাতে

নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে যেসব হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলার ঘটনা। ১৮ বছর ধরে ঝুলছে আলোচিত বোমা হামলার মামলার বিচার।

সে রাতে যা ঘটেছিল
২০০১ সালে আওয়ামীলীগ সরকারের মেয়াদের শেষদিকে ১৬ জুন চাষাঢ়া আওয়ামীলীগ অফিসে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। রাতে পৌণে আটটার দিকে তখনকার এমপি শামীম ওসমান যখন জনগণের কথা শোনার জন্য সাক্ষাৎ দিচ্ছিলেন ঠিক তখুনি বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। সেই হামলায় আওয়ামীলীগের ২০ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারান। গুরুতর আহত হন শামীম ওসমানসহ অর্ধশতাধিক লোক। চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জেলার সভাপতি চন্দন শীল, স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রতন দাস আরো অনেকেই। সে ঘটনায় সেদিনই নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা দুটি মামলা (একটি বিস্ফোরক ও অন্যটি হত্যা) দায়ের করেন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে এ মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়। দুটি মামলায় ১৪ বছরে ৭ বার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন এবং ৮ম বার ১৩ বছর পর ২০১৩ সালের ২মে মামলার তদন্ত সংস্থা সিআইডি ৬ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করে।

আদালত সূত্রে জানাগেছে, মামলাটি বর্তমানে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতে বিচারাধীন আছে এবং তা সাক্ষী পর্যায়ে আছে। মামলার অন্যতম আসামী হুজি নেতা মুফতি হান্নানের একটি মামলায় ফাঁিস কার্যকর হওয়ায় এবং তার প্রতিবেদন আদালতে জমা না দেওয়ায় বার বার মামলার তারিখ পড়ছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যেমন মুফতি হান্নান ও ক্রসফায়ারে নিহত যুবদল নেতা ডেভিডের ছোট ভাই শাহাদাৎ উল্লাহ জুয়েল আসামী তেমনি ১৬ জুনের বোমা হামলা মামলায়ও এদুজন চার্জশীটভুক্ত আসামী।

যা বললেন পিপি
যা বললেন পিপি
নারায়ণগঞ্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, ১৬ জুনের বোমা হামলার ঘটনার প্রধান আসামী হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের বিরুদ্ধে সারাদেশে ৫১টি। সে কারণে ২০১৭ সালের এপ্রিল তার মৃত্যুদন্ড কার্যকরের আগে যথা সময়ে তাকে নারায়ণগঞ্জ হাজির করা হয়নি। এ কারণে বার বার সাক্ষ্য গ্রহণ পেছানো হয়। আর এতে করে মামলার দীর্ঘসূত্রিতাও বাড়ে।

তবে আমরা চেষ্টা করছি নারায়ণগঞ্জের বোমা হামলার মামলাটি যেন দ্রুত শেষ করা যায়। অচিরেই এর দৃশ্যমান কাজ পরিলক্ষিত হবে। আমরা চাই দ্রুত চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচারও যেন শেষ হয়।

ওয়াজেদ আলী খোকন আরো জানান, আমরা সরকারের কাছে আবেদন করেছি যেন দ্রুত ভারতের কারাগারে থাকা দুইজনকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

মামলা
বোমা হামলার পর দিন খোকন সাহা বাদি হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় দুইটি মামলায় (একটি বিস্ফোরক অন্যটি হত্যা) জেলা বিএনপির তৎকালীন সাধারন সম্পাদক তৈমুর আলম খন্দকারকে প্রধান করে বিএনপি ও এর অঙ্গ দলের মোট ২৭ জনকে আসামী করা হয়। ঘটনার দীর্ঘ ২২ মাস পর ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে বোমা ট্রাজেডি মামলা দুটির ফাইনাল রিপোর্টে বলা হয়, ‘উল্লেখিত ২৭ জনের কেউই চাষাড়া আওয়ামীলীগ অফিসে ১৬ জুন ২০০১ সালের বোমা হামলায় জড়িত নয়। যদি ভবিষ্যতে অত্র মামলার তথ্য সম্বলিত ক্লু পাওয়া যায় তবে মামলাটি পুনরুজ্জিবীত করার ব্যবস্থা করতে হবে।’ দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর মামলাটি হিমাগারে থাকার পর সিআইডির আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ২ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে মামলাটি নিষ্পত্তি করার জন্য সরকারকে আদেশ দেয়। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঘটনায় নিহত চা দোকানী হালিমা বেগমের ছেলে আবুল কালাম বাদী হয়ে শামীম ওসমান, তার ভাই নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমান সহ আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি ও এর সহযোগি সংগঠনের ৫৮ নেতাকর্মীকে আসামী করে একটি মামলা করেন। পরবর্তিতে উচ্চ আদালত এ মামলাটি খারিজ করে দেয়।

ঘটনার দীর্ঘ ১২ বছর পর দু’টি মামলায় ২০১৩ সালের ২ মে ৬ জনকে অভিযুক্ত ও ৩১ জনকে অব্যাহতি প্রদান করে  নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দু’টি মামলার প্রত্যেকটির ৯৪৭ পাতার চার্জশীট দাখিল করা হয়। এতে মামলা থেকে চার্জশীট থেকে তৈমূর আলম খন্দকার সহ ৩১জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর অভিযুক্ত ৬ জন হলেন নারায়ণগঞ্জে ক্রসফায়ারে নিহত যুবদল ক্যাডার মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভোট ভাই শাহাদাতউল্লাহ জুয়েল, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান, ওবায়দুল্লাহ রহমান, ভারতের দিল্লী কারাগারে আটক সহোদর আনিসুল মোরসালিন, মুহিবুল মুত্তাকিন এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু। অভিযুক্তদের মধ্যে জামিনে থাকা কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু ও ওবায়দুল্লাহ রহমান ছাড়া অন্যরা গ্রেপ্তার রয়েছে।

যারা নিহত হয়
সেদিন নিহত হয়েছিল শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুল হাসান বাপ্পী, সহোদর সরকারী তোলারাম কলেজ ছাত্র-ছাত্রী সংসদের জিএস আকতার হোসেন ও সঙ্গীত শিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু, সঙ্গীত শিল্পী নজরুল ইসলাম বাচ্চু, ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, নারায়ণগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক এ বি এম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ মোল্লা, মহিলা আওয়ামীলীগ নেত্রী পলি বেগম, ছাত্রলীগ কর্মী স্বপন দাস, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, পান সিগারেট বিক্রেতা হালিমা বেগম, সিদ্ধিরগঞ্জ ওয়ার্ড মেম্বার রাজিয়া বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, আব্দুস সাত্তার, আবু হানিফ, এনায়েতউল্লাহ স্বপন, আব্দুল আলীম, শুক্কুর আলী, স্বপন রায় ও অজ্ঞাত এক মহিলা। নিহত মহিলার পরিচয় পেতে তেমন কোন চেষ্টা করেনি প্রশাসন। হামলায় শামীম ওসমান সহ অর্ধশতাধিক আহত হয়। তার ব্যক্তিগত সচিব চন্দন শীল, যুবলীগ কর্মী রতন দাস দুই পা হারিয়ে চিরতরে বরণ করেছে পঙ্গুত্ব।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও