৪৪ বছরে ২৩ খুন !

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০২ পিএম, ২৭ জুন ২০১৯ বৃহস্পতিবার

৪৪ বছরে ২৩ খুন !

নাম শুনেই অনেকে আঁতকে উঠেন। নতুন আগুন্তুকদের অনেকেনাকি এলাকায় প্রবেশে সূরা পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে ঢুকেন। দিনের বেলায় ঢুকতেও নাকি গা ছমছম করে। আর রাতের বেলায়, সেটা না-কি ভাবাই যায়না। খোদ পুলিশের লোকজনও বাহিনী ছাড়া এখানে প্রবেশ করেননা। এ এক আজব জগত। আজব নীলা-খেলা।

বারো রঙের মানুষের আনাগোনায় গড়ে উঠা স্থানটি ক্রমেই সারাদেশে সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে। এখানে দিনের আলোয় যেমন ক্রাইম হয়, তেমনি টাকাও ওড়ে। এলাকাটি এখন সবার কাছে ‘আলাদিনের চেরাগ’ হিসাবে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে এ এলাকায় বসবাস করলেই কেবল রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়া যায়। এখানে নেই কোন শিল্পকারখানা। নেই ব্যবসা কিংবা বাণিজ্য। তবুও এখানে প্রতিদিন কম করে হলেও কোটি টাকা ওড়ে। এ টাকা ধরতে গিয়ে কেউ ধনী হচ্ছে, আবার কেউ ধরা খাচ্ছে। কেউ আবার মারা পড়ছে।

পাঠক হয়তো আপনার তর আর সইছে না। জানতে ইচ্ছে করছে এ জগতটা আবার কোথায়? অদ্ভুদ এ জগত আর কোথাও নয়। রাজধানী ঢাকার সন্নিকটে ডেমরার পাশে রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া পূর্নবাসন কেন্দ্রে। এলাকার আধিপত্য বিস্তার, নানা অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার অসম প্রতিযোগীতা চলে এখানে রাত-দিন। আর এসবকে কেন্দ্র করেই গত ৪৪ বছরে ২৩ টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকান্ডের একটিরও বিচার হয়নি। ফলে হত্যাকারীরা দিনকে-দিন বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়রা দাবী করে বলছেন, যদি হত্যাকান্ডগুলোর বিচার হতো, তাহলে আর কেউ নতুন করে খুন করার সাহস করতো না। তবে চনপাড়াবাসীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, চনপাড়াবাসীকে রাজনীতির কাজে ব্যবহার করা হয়। ফলে সন্ত্রাসীরা প্রশ্রয় পায়। রাজনৈতিক শেল্টার বন্ধ হয়ে গেলে চনপাড়া শান্ত হয়ে যাবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৭৪ সালের জানুয়ারী মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নদী ভাঙ্গা, ঘর ভাঙ্গা মানুষদের শীতলক্ষ্যা নদ ঘেঁষা ওয়াসার ১২৬ একর জমিতে ঠাঁই দেন। ধীরে ধীরে চনপাড়া বস্তি হিসাবে রূপ নেয়। ১২ হাত বাই ১৫ হাতের কয়েক হাজার ঝুঁপড়ি ঘরে প্রায় দেড় লাখ লোকের বসবাস চনপাড়া পূর্নবাসনে। বিশ্বের অনেক দেশেই বস্তি থেকে উঠে আসা লোকেরা কালক্রমে বিখ্যাত হয়েছেন। মার্শাল টিটো, পেলে, ডিয়াগো ম্যারাডোনা ও রোনালদিনহোর মতো আরো অনেকে জগৎবিখ্যাত ব্যক্তির শৈশব কেটেছে বস্তিতে। কিন্তু চনপাড়া পূর্নবাসনের পরিচিতি হয়েছে কুখ্যাত সন্ত্রাসী, দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজ ও ভাড়াটে খুনি হিসাবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চনপাড়া পূর্নবাসনে গত ৪৪ বছরে ২৩ টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। তবে এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে স্থানীয়রা মনে করেন। ১৯৭৬ সালে বাদশা মিয়া খুনের মধ্য দিয়ে চনপাড়ায় খুনের শিল্পায়ন শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে খুনের শিকার হন খয়ের পার্টির সদস্য হাফেজ আলী, ১৯৮২ সালে খুন হন পারভেজ মিয়া, ১৯৯৪ সালে খুনের শিকার হয় চাঁন মিয়া, ২০০৩ সালে ফিরোজ সরকার, ২০০৪ সালে ফারুক মিয়া।

২০০৫ সালে খুন হয় পুলিশের এএসআই হানিফ মিয়া ও ক্রিকেটার ফালান মিয়া। ২০০৮ সালে খুন হন আব্দুর রহমান, ২০১১ সালে হত্যার শিকার হয় র‌্যাবের সোর্স খোরশেদ মিয়া। ২০১৬ সালের ১২ মার্চ প্রজন্মলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনির হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৭ সালের জানুয়ারী মাসে হত্যার শিকার হয় আসলাম হোসেন নামে এক স্কুল ছাত্র, গত ১৭ মাস আগে ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর থানা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক হাসান মুহুরিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৬ জুন খুন হন নিহত হাসান মুহুরির স্ত্রী ও সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য বিউটি আক্তার কুট্টি। পুলিশ সদস্য হানিফ মিয়া ছাড়া বাকী পুরনো সব হত্যাকান্ডের মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত স্বাক্ষীর অভাবেই মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে বলে এলাকাবাসী মনে করেন।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, চনপাড়ায় এসব হত্যাকান্ডের নেপথ্যে ৫ টি কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে। এর অন্যতম একটি হলো ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখা। এসব হত্যাকান্ডের জের ধরে রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষোভের দানা বেঁধে ওঠেছে। এ হিসাবে ভবিষ্যতে আরো হত্যাকান্ড ঘটতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারনা।

স্থানীয়রা জানান, এলাকার আধিপত্য, অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়িক ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব, পূর্ব শত্রুতা, রাজনীতিক প্রভাব, এসব কারণে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সূত্রমতে ও নিহতদের পরিবাররা জানান, এসব হত্যাকান্ডের অধিকাংশের বিচার হয়নি। কয়েকটি মামলার আসামীদের সাজা হলেও পরবর্তীতে আইনের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে বের হয়ে আসে। বেরিয়ে এসে সন্ত্রাসীরা আয়েসী জীবন-যাপন করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়া, মামলার এজাহারে সুনিদিষ্ট রেকর্ড না থাকা, স্বাক্ষী না থাকা ও জামিনে আসামিরা বেরিয়ে আসার কারণেই একর পর এক হত্যাকান্ড ঘটেছে। দুর্বল স্বাক্ষী ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পুলিশ হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো আজ অবধি উদ্ধার করতে পারেনি।

নিহতদের পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে পরিবারগুলো জানিয়েছেন, তাদের প্রিয় মানুষগুলো হারিয়ে তারা বিষণ। বোবা কান্না চার দেয়ালের বাহিরে বের না হলেও ঘরের পরিবেশ ভারী করে তুলেছে। পরিবারগুলো এ ভার আর সইতে পারছে না। তারা তাদের প্রিয়জনের হত্যার বিচার চায়। কিন্তু ৪৪ বছরে একটি খুনেরও বিচার হয়নি। কোনটি পুলিশের দুর্বল এজাহারের কারণে, কোনটি সাক্ষীর কারণে কিংবা কোনটি রাজনৈতিক চাপের কারণে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। কিছু হত্যাকান্ডের বিচার আদালতে প্রক্রিয়াধীন। তবে পরিবারগুলো বিচার পাবে কিনা তা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণছেন। পরিবারগুলো দাবী করে বলেছেন, এভাবে যেনো আর কোন মায়ের বুক খালি না হয়। নতুন করে যেনো কারো চোখের জল না ঝরে।

স্থানীয়রা বলেন, রক্তাক্ত জনপদ রূপগঞ্জের চনপাড়ায়  স্বাধীনতা  পরবর্তী আলোড়ন সৃষ্টিকারী ২৩ টি হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের নাম বাতাসে ভেসে বেড়ালেও অধিকাংশেরই কোনো শাস্তি হয়নি। খুনের পরিকল্পনা এতোই শিল্পরূপ লাভ করেছে যে, অভিযোগ প্রমাণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিটি হত্যাকান্ড অন্তত ৩ টি পক্ষ জড়িয়ে পড়ে। এক বা দুটি পক্ষ অর্থ জোগান দেয়। একটি পক্ষ রাজনৈতিক আশ্রয় নিশ্চিত করে। হত্যাকান্ডের নেপথ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গ্রুপ খুনিদের ভাড়া করার জন্য বেশ কয়েকটি হাত কাজে লাগায়। ফলে, হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী অধিকাংশ সময় অনায়াসে পার পেয়ে যায়।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, কোনো না কোন শত্রুতার জের ধরেই হত্যাকান্ডগুলো ঘটছে। এসব হত্যাকান্ডের সঙ্গে এক বা একাধিক প্রভাবশালী পরিবার বা ব্যক্তি জড়িত থাকায় মামলাগুলো আর এগোয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসামীরা ধরা পড়লেও সাক্ষী প্রমাণের অভাবে তারা ছাড়া পেয়ে যায়। এক্ষেত্রে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। আলোচিত খুনের বিচার না হওয়ায় খুনিরা পরবর্তীকালে আরো বেপোরোয়া হয়ে ওঠে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও