নারায়ণগঞ্জে ৬ মাসে ৮৭ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৩ পিএম, ১২ জুলাই ২০১৯ শুক্রবার

নারায়ণগঞ্জে ৬ মাসে ৮৭ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা

চলতি বছরে নারায়ণগঞ্জে ৮৭ জন নারী ও শিশুর ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে গেছে। গেল ৬ মাসে নারায়ণগঞ্জে ১৪৬ জন ধর্ষিতার মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে যার মধ্যে গত ৩ মাসেই ১০০ জন নারী ও শিশু ধর্ষিতার মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। অথচ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৭টি থানায় ধর্ষণ মামলা রেকর্ড হয়েছে মাত্র ৫৯টি। অর্থাৎ ৮৭ জন নারী ও শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় কোন মামলা দায়ের হয়নি।

জানা গেছে, সারাদেশ জুড়েই বর্তমানে আলোচিত ইস্যু ধর্ষণ। বিশেষ করে গত এপ্রিল মাসে আলোচিত নুসরাত হত্যাকান্ডের পর থেকে ধর্ষণের বিষয়টি আরো আলোচিত হয়। তবে বর্তমানে নারায়ণগঞ্জেও ধর্ষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গণধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে। নারীদের পাশাপাশি শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এমনিতে ধর্ষণের ঘটনা ন্যাক্কারজনক হলেও হিং¯্রতার দিক দিয়ে গণধর্ষণের ঘটনাগুলো বর্বরোচিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। যেকারণে এসব নারকীয় ঘটনায় ধর্ষককে ঘৃণ্যতার দৃষ্টিতে দেখা হলেও এই বর্বরতা কমছেনা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধর্ষণের শিকার দুই তৃতীয়াংশ শিশু। ধর্ষকদের সবচেয়ে বড় অংশ প্রতিবেশী। সাম্প্রতিক সময়ে সহপাঠী বা ফেসবুক বন্ধুদের বিরুদ্ধেও ধর্ষণের মামলা হয়েছে। বিয়ের প্রলোভনেও ঘটছে ধর্ষণের ঘটনা। বন্ধু ও বান্ধবীকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েও বেশ কিছু নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দু’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের দ্বারাও ঘটেছে ধর্ষণের ঘটনা যা দেশজুড়ে আলোচিত।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ষণে অভিভাবকেরা আতঙ্কে
গত ৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় বাইতুল হুদা ক্যাডেট মাদ্রাসার দশের অধিক ছাত্রীকে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় অধ্যক্ষ আল আমিনকে। পরে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দু’টি মামলা দায়ের করা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় অধ্যক্ষ আলআমিনকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আল আমিন বলেছে, শয়তান ভর করার কারণে ধর্ষণ করেছে সে। ২৭ জুন নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জে অক্সফোর্ড হাই স্কুলের বিশ এর অধিক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত শিক্ষক আশরাফুল আরিফ ও মদদদাতা প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জুলফিকারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গ্রেফতারকৃত শিক্ষক আশরাফুল আরিফের ২টি মামলায় তিনদিন করে ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। এছাড়াও আশরাফুল আরিফকে মদদ দেয়ার অভিযোগ গ্রেফতারকৃত একই স্কুলের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জুলফিকরের ১ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এদিকে নারায়ণগঞ্জে দু’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে দুইজন অধ্যক্ষসহ ৩ জন শিক্ষক গ্রেফতার হওয়ার পরে থেকে বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বিরাজ করছে ধর্ষণ আতঙ্ক। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ ও শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, যৌন নিপীড়নের ঘটনার পর অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বেশীরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেখানে মেয়ে আছে তাদের অভিভাবকেরাও হঠাৎ করেই তৎপর হয়ে উঠছেন। শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন নারী অভিভাবকদের উপস্থিতি বেড়ে গেছে।

নানা প্রলোভনে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে শিশু-কিশোরীরা
৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ১৬ বছরের কিশোরীকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকার মুগদার বাসায় নিয়ে প্রথমে ধর্ষণ এবং পরে যৌনকর্মীর পেশায় বাধ্য করানোর অভিযোগে ঢাকার উত্তর মুগদা মদিনাবাগের একটি বাসা থেকে ওই কিশোরীকে উদ্ধার এবং হেলেনা বেগম (৪২) নামে জড়িত একজনকে গ্রেফতার করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ। ২৫ জুন সিদ্ধিরগঞ্জে আইসক্রিম খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে ৯ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ২২ জুন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মাদরাসা ছাত্রী (১৩) ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ওই কিশোরীকে একটি ঘরে আটকে রেখে রাতভর ধর্ষণ করা হয়েছে। পরে পুলিশ ধর্ষক রাকিবকে আটক করেছে। ২১ জুন রাতে অপহরণের পরে ধর্ষণের শিকার দুই চাচাতো বোনকে উদ্ধার করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ। প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণ করা হয় চাচাতো দুই বোনকে। পরে একই কক্ষে ২০ দিন ধরে আটকে রেখে দুই বোনকে একাধিকবার ধর্ষণ করে দুই ধর্ষক। ১৭ জুন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এক প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মাদরাসা ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে।

৬ মাসে ধর্ষণের শিকার ১৪৬ জন
নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আসাদুজ্জামান জানান, চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত অত্র হাসপাতালে মোট ১৪৬ জন নারী ও শিশুর (ধর্ষিতা) মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। যার মধ্যে গত এপ্রিল মাসে ৩৪ জন, মে মাসে ৩১ জন ও জুন মাসে ৩৫ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালে সর্বমোট ১৫৭ জন নারী ও শিশুর (ধর্ষিতা) মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল। অপরদিকে ২০১৭ সালে ২১০ জন ধর্ষিতার মেডিকেল পরীক্ষা হয়েছিল।

মামলা রেকর্ড ৫৯টি, স্বীকারোক্তি ৩৩ ধর্ষকের
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক (ডিআইও-২) সাজ্জাদ রুমন জানান, চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত ৫৯টি ধর্ষণ মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। যার মধ্যে সবগুলো ঘটনারই মূল আসামী গ্রেফতার হয়েছে। সবগুলো ভিকটিমের মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্নের পাশাপাশি ২২ ধারায় তাদের জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া ৩৩ জন ধর্ষক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। তিনি আরো জানান, নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোঃ হারুন অর রশিদ জেলার ৭টি থানার ওসিদেরকে নির্দেশনা দিয়েছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নানা কর্মসূচী নেয়ার জন্য।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও