‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ বছরান্তেও সড়কে কিছু বদলায়নি

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৩২ পিএম, ২ আগস্ট ২০১৯ শুক্রবার

‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ বছরান্তেও সড়কে কিছু বদলায়নি

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ইতিহাসে সারা দেশকে নাড়িয়ে দেয়ার মত একটি আন্দোলন হচ্ছে স্কুল কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’। যে আন্দোলনে রিকশা চালক, বাস চালক, কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে ব্যাংকার, পুলিশ, এমপি, মন্ত্রী সহ প্রতিটি স্তরের মানুষের একাত্মতা ছিল। ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ রাজধানী থেকে শুরু হয়ে আন্দোলনটি ছড়িয়ে পরে সারা দেশে। সকলের দাবি ছিল একটাই সেটা হচ্ছে সবাই যেন নিরাপদে সড়কে চালাচল করতে পারে সেই নিশ্চয়তা দেয়া।

এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১ আগস্ট সকাল ১০টা হতে নারায়ণগঞ্জ সরকারী তোলারাম কলেজ, নারায়ণগঞ্জ কলেজ, কমার্স কলেজ, মডেল কলেজ সহ বেশ কয়েকটি কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা দলে দলে চাষাঢ়া মোড়ে এসে অবস্থান নেয়। কয়েক শ শিক্ষার্থী অবস্থান করে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে রাজধানী সহ আশেপাশের জেলার সকল যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। আটকে দেয় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের ট্রেন চলাচল। এছাড়া বন্ধ ছিল ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে সকল প্রকার যান চলাচল। এছাড়া সাইনবোর্ড ও শিমরাইল মোড়ে ছাত্ররা অবস্থান নিয়ে আটকে দেয় ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম কুমিল্লা ও সিলেটের যোগাযোগ।

পরের দিন থেকে আন্দোলনে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। ২ আগস্ট আন্দোলনকারীরা পুনরায় সড়ক অবরোধ না করে সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের বৈধতার কাগজপত্র, ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স চেক করার কাজে নিয়োজিত হয়। এদিন অবৈধ যানবাহন বা লাইসেন্সবিহীন চালকদের গাড়ি জব্দ করে দিনশেষে প্রশাসনের হাতে সেসব গাড়ির চাবি তুলে দেয় শিক্ষার্থীরা। পরবর্তিতে আরো তিনদিন এইভাবেই নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কার্যক্রম চালিয়ে যায় শিক্ষার্থীরা।

নারায়ণগঞ্জের শিক্ষার্থীদের সেই নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ১বছর পূর্ণ হয়েছে। পাঁচদিনের সেই আন্দোলনে কিছু দিনের জন্য সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারলেও বছর না পেরোতেই আবারো আগের মতই নৈরাজ্য অব্যাহত রেখেছে পরিবহন শ্রমিকরা। একই সাথে বেখেয়ালি ভাবে সড়কে চলাচল করছে শিক্ষার্থী সহ সাধারণ পথচারীরা। কোমলমতি সেসব শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ বাংলাদেশের আন্দোলনের ইতিহাসে শুধু নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। এছাড়া সব রয়ে গেছে আগের মত।

৩০ জুলাই সরেজমিনে চাষাঢ়া গোল চত্ত্বরে দেখা গেছে পরিবহন শ্রমিকদের নৈরাজ্য। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দির্ঘদিন পর চাষাঢ়ার বিভিন্ন পয়েন্টে জেব্রা ক্রসিং স্থাপন করা হলেও ট্রাফিক পুলিশের আদেশ অমান্য করে ক্রসিংয়ের উপর গাড়ি থামিয়ে রাখা হচ্ছে। ফলে এসব জেব্রা ক্রসিংয়ের ব্যবহার সাধারণ মানুষ করতে পারছে না।

শুধু পরিবহন শ্রমিক নয়। একই রকম সড়কে খামখেয়ালিপনা দেখা গেছে শিক্ষার্থী সহ সাধারণ পথচারীদের মাঝে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে জেব্রা ক্রসিং থাকলেও অধিকাংশ মানুষ তা ব্যবহার করছেন না। ট্রাফিক পুলিশের সিগনালের অপেক্ষা না করে অনেকে শুধু হাত দেখিয়ে গাড়ি থামিয়ে ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পার হচ্ছেন। যে কারণে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করা সেই ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ এর পরেও বন্ধ হয়নি সড়কে অঝোরে প্রাণ ঝরা।

এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সক্রিয় নেতা ফারহানা মুনা বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ এর মাধ্যমে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি প্রশাসনের যদি সৎ নিয়ত থাকে তাহলে সড়কের নৈরাজ্য বন্ধ করে শৃংখলা ফেরানো সম্ভব। এদিক থেকে আমরা সফল হয়েছি। কিন্তু আমাদের যে দাবিগুলো ছিল সরকার তা মেনে নিলেও তার বাস্তবায়ন আমরা দেখছি না। প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবের কারণে সড়কে নৈরাজ্য বন্ধ হচ্ছে না। বর্তমান বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা বাদ দিয়ে প্রাধান্য দেওয়া হয় মাফিয়া তন্ত্র ও চাঁদাবাজিকে। বর্তমান সড়কে যে নৈরাজ্য এটা হচ্ছে সড়কের মাফিয়া তন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য। যে কারণে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সুফল আমরা পাচ্ছি না। মাফিয়া তন্ত্র ও চাঁদাবাজির জন্য খেয়াল করলে দেখা যাবে দিনদিন সড়কে দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা আরো বাড়ছে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের বড় একটি দাবি ছিল চাষাঢ়ায় ফুটওভার ব্রীজ নির্মাণ। কিন্তু আমরা এখনো চাষাঢ়ায় কোনো ফুটওভার ব্রীজ পেলাম না। সড়কের কিছু কিছু জায়গায় জেব্রা ক্রসিং আঁকা হয়েছে কিন্তু জেব্রা ক্রসিং দিয়ে মানুষ কি করে তা অনেকে জানেন না। যদি নারায়ণগঞ্জের মানুষকে জিজ্ঞেস করা হয় যে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে কি করা হয় তাহলে তাদের অধিকাংশই বলবে এটা সড়কের ডিজাইন। অনেকেরই এসব ব্যবহারের জ্ঞান নাই।

তিনি বলেন, আমাদের যতটুকু জনসচেতনতা দরকার ততটুকু আমাদের মাঝে নাই। কিন্তু মানুষ অনেকটা নিরুপায় হয়েও আইন মানতে পারে না। কারণ সেগুলো মানার মত অবস্থা আমাদের থাকে না। যেমন শহরে যদি ময়লা ফেলার পর্যাপ্ত জায়গা থাকতো তাহলে সবাই হয়তো ময়লা যত্রতত্র ফেলতো না। যেহেতু নির্দিষ্ট জায়গা নেই তাই বাধ্য হয়ে অনেকে যত্রতত্র ময়লা ফেলছে। একই ভাবে জেব্রা ক্রসিংগুলো থাকলেও সেগুলো ব্যবহার বান্ধব কতটুকু তা দেখলেই বুঝা যায়। যদি পর্যাপ্ত সেই ব্যবস্থা থাকতো তাহলে সবাই জেব্রা ক্রসিং দিয়েই সড়ক পার হতো।

তিনি বলেন, সড়কে অকাল মুত্যু ঠেকাতে শুধু চালকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ শুধু চালকের দোষে দুর্ঘটনা ঘটে না। একই সাথে পথচারীদের অসচেতনতাও থাকে। এক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় একজন চালকের যেমন কঠোর শাস্তি দেওয়া দরকার তেমনি সড়কে যে অসচেতন ভাবে চলাচল করবে তাকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে তাহলে সড়কে দুর্ঘটনা কমবে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাসের রেষারেষিতে প্রাণ হারায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী। আহত হয় আরো ১২ জন শিক্ষার্থী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা বাংলাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করে স্কুল-কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও