শীতলক্ষ্যায় আর কত নৌকায় নদী পার মেয়র এমপিদের

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪৩ পিএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

শীতলক্ষ্যায় আর কত নৌকায় নদী পার মেয়র এমপিদের

শীতলক্ষ্যা নদী বলতে যেমন নারায়ণগঞ্জের নাম আসে তেমনি নারায়ণগঞ্জ বললে শীতলক্ষ্যা। এ নদীই বেঁধেছে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন, ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রা। শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে বন্ধনে বেঁধে আছে নারায়ণগঞ্জ। তবে এ নদীকে ঘীরে এখনও চলছে রাজনীতি। নদী কারণে যেমন জীবন যাত্রা এগিয়ে যাচ্ছে না তেমনি প্রতিটা মুহূর্তে দুই পাড়ের মানুষ প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়ছে। মানুষকে পরাপার হতে হয় নৌকায় চড়ে। নদীর পূর্ব পাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি একটি সেতু। আর সেই সেতু করতে জনপ্রতিনিধিরা দিয়ে যাচ্ছেন একের পর এক আশ্বাস। নির্বাচন আসলেই মনে পড়ে শীতলক্ষ্যার পাড়েরর মানুষের জন্য ব্রীজ দরকার। তবে ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ব্রীজ নির্মাণ করে দিবেন। যার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপরও দৃশ্যমান এখনও কিছুই হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে কিছুটা বৈরিতা আছে সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর। অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে তিনজনই প্রায়শই নৌকায় চড়ে নদী পার হন। ভুক্তভোগীরা বলছেন তিনজন একটেবিলে বসে চাইলেই সেতু তো দূরের কথা তার চেয়ে বড় বড় প্রকল্পও বাস্তবায়ন সম্ভব। কিন্তু শুধুমাত্র ব্যক্তিগত রেশারেশিতে থমকে আছে উন্নয়ন।

সম্প্রতি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী এমপি একেএম শামীম ওসমান নৌকা চড়ে শীতলক্ষ্যা নদী পার হন। এর পর থেকে আবারও আলোচনায় আসে শীতলক্ষ্যা নদীর ব্রীজের দাবি। কারণ এর আগেও বিভিন্ন কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানের যোগদান করতে সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নৌকায় চড়ে নদী পার হয়েছেন। শুধু যে আইভী শামীম তা নয় নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনের এমপি সেলিম ওসমানও একাধিকবার নদী পারাপার হয়েছে নৌকায় চড়ে। তবে কবে এমপি ও মেয়রের আশ্বাস দৃশ্যমান হিসেবে দেখবে নগরবাসী? এমন প্রশ্ন সাধারণ মানুষের।

৯ সেপ্টেম্বর সোমবার সকালে সরেজমিনে শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে দেখা গেছে, নবীগঞ্জ খেয়াঘাট, বরফকল খেয়াঘাট, ৫নং খেয়াঘাট, সেন্ট্রাল খেয়াঘাট, বন্দর খেয়াঘাট, কেরোসিন ঘাট, ফায়ার ঘাট সহ ১০টির বেশি খেয়াঘাট রয়েছে। প্রতিটি ঘাট দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কয়েক লাখ লোক নৌকায় পারাপার হয়। এসব নৌকাগুলোও অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে নদী পারাপার করে। এর মধ্যে পোশাক কারখানার শ্রমিক, হোসিয়ারী শ্রমিক, শিক্ষার্থী সহ কর্মজীবী মানুষের সংখ্যাই বেশি। আর এ নদী পারাপার হতে গিয়ে প্রায় সময় দুর্ঘটনার শিকার হন যাত্রীরা। এতে অনেকেই প্রান হারিয়েছেন। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রী কিংবা মানুষের নিরাপত্তায় নেই কোন ব্যবস্থা।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ওয়েব পোর্টাল থেকে জানা যায়, বন্দর উপজেলাটির মোট জনসংখ্যা ৩ লাখ ১২ হাজার ৮৪১। আর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বন্দর এলাকার ৮টি ওয়ার্ডের মোট ভোটার ১ লাখ ১৩ হাজার ২৮৩। সিটি করপোরেশনের ভোটারের বাইরেও প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে নদী পারাপার হন লাখো মানুষ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯১ সাল থেকে সংসদ নির্বাচনগুলোতে নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে আসছেন। সবশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও রাজনৈতিক দলের নেতারা বিভিন্ন উন্নয়নের ইস্যু সামনে আনলেও হালে সেতুর ইস্যুটিই বড় ছিল। নির্বাচিত মেয়র আইভী ও পরাজিত প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান আশ্বাস দিয়েছিলেন সেতু নির্মাণের। পরাজিত হওয়ার পর সিটি করপোরেশনের বিষয়ে কোন বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি সাখাওয়াত হোসেন খানকে। তবে গত জুনে সিটি করপোরেশনের বাজেট অধিবেশনে মেয়র আইভী নতুন করে সেতুর আশ্বাস দেন।

বন্দর এলাকার বাসিন্দা প্রদীপ দাস জানান, তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে বন্দরের সাবদি এলাকায় বসবাস করেন। প্রতিদিন মোটরসাইকেলে শহরের চাষাঢ়ায় আসা যাওয়া করেন।

তিনি বলেন, বাড়ি থেকে খেয়াঘাটে আসতে সময় লাগে ১৫ মিনিট আর মোটরসাইকেল কষ্ট করে নৌকায় তুলে নদী পার হতে সময় লাগে কম করে হলেও আধা ঘণ্টা। যেতেও হয় একই ভাবে। এতে মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়।

বন্দর আমিন এলাকার বাসিন্দা ফেরদাউস ওয়াহিদ বলেন, বন্দরে একটিও ভালো মানের হাসপাতাল নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র যেটা আছে সেটাতেও ভালো ডাক্তার নেই। বিশেষ কিংবা জরুরী প্রয়োজনে দিনে রাতে নদী পারাপার হতে হয়। এতে জীবনের ঝুঁকি থাকে। রাতে বেলায় বড় বড় জাহাজ, বাল্কহেড চলাচল করে। এতে করে যেকোন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এমনকি অনেক ঘটনা ঘটছেও। তাই দ্রুত একটা সেতু করা প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেন, এমপি সাহেব ফেরী দিয়েছেন কিন্তু সেই ফেরী পর্যাপ্ত গাড়ি না হলে ছাড়ে না। জরুরী হলেও শুনে না। তাছাড়া ঝড় থাকলেও চলে না। এছাড়াও ফেরীর জন্য অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হয়। ক্ষনিকের কিছু সুবিধা পেলেও এসব কারণে ফেরী উপকারে আসছে না। সেতু করা জরুরী।

সংশ্লিষ্টদের মতে, হাজীগঞ্জ ও নবীগঞ্জ পয়েন্ট, ৫নং ঘাট ও সেন্ট্রাল ঘাট এলাকাতে সেতু নির্মাণ বেশী প্রয়োজন। কারণ এসব ঘাট ও পয়েন্ট দিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ দুই পারে যাতায়াত করেন। আর এখন যেখানে সেতু হচ্ছে সেটা মূলত পদ্মা সেতুর একটি কানেকটিং সেতু। এতে করে দূরান্তের মানুষের চলাচলে উপকার হবে।

এদিকে সিটি করপোরেশন ও সংসদ নির্বাচনগুলোর আগে এ সেতুকেই প্রধান ইস্যু বানানো হতো বৈতরণী পার হওয়ার জন্য। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সর্বদাই এ সেতুকেই প্রাধান্য দিত জয়ী হওয়ার জন্য। ১৯৯১ সাল থেকে পরের সংসদ নির্বাচনগুলোতে (১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮) নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণায় শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়ে আসছেন। কিন্তু গত ২৫ বছরেও সেই সেতু নির্মাণ হয়নি। সবশেষ গত ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগেও দুই দলের প্রার্থীর কণ্ঠে সেতু নির্মাণের আশ্বাস ছিল অনেক।

নারায়ণগঞ্জের অবহেলিত জনপদ হিসেবে শীতলক্ষ্যার পূর্ব পাড় বন্দরকে বলা হলেও সেখানে রয়েছে শতফুট চওড়া সড়ক। আছে সড়কে স্ট্রিট লাইট, হচ্ছে সড়কের উন্নয়ন। আছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সহ আধুনিক শহরের ছোয়াও। কিন্তু আক্ষেপ ছিল শুধুমাত্র সেতুর জন্য। গত দুই যুগ ধরেই বন্দরবাসীর প্রাণের দাবী ছিল একটি শীতলক্ষ্যা সেতু। এ সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলের নেতারাও ছিল বেশ প্রতিশ্রুতিবিভোর। কিন্তু আশার বাস্তবায়ন ঘটেনি।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও