যে কারণে সৃষ্টি হচ্ছে কিশোর গ্যাং

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০০ পিএম, ২৮ অক্টোবর ২০১৯ সোমবার

যে কারণে সৃষ্টি হচ্ছে কিশোর গ্যাং

সারা দেশের মত নারায়ণগঞ্জে কিশোর গ্যাং বেশ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। কিশোর বয়সে পা দেয়া ছেলেরা ধরাকে সরা জ্ঞান করার লক্ষ্যে মূলত গ্যাং সৃষ্টি করে থাকে। যার গ্যাংয়ের সদস্য যত বেশি তার শক্তি তত বেশি। আর সেই শক্তির অপব্যবহার করে চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসীপনা সহ খুনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। এক ঝাক কিশোরের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যে কোন অসাধ্যকে সাধনকে সফল করতে পারে তারা। একারণে কিশোর গ্যাংয়ের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে এক শ্রেণির কিশোররা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সমাজের অবহেলিত, নির্যাতিত, পারিবারিক কলহ থেকে উঠে আসা কিশোর, নেশাগ্রস্ত, বেপরোয়া চলাফেরায় অভ্যস্ত সহ নানা কারণে কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে। এই গ্যাং সৃষ্টির মধ্য দিয়ে কিশোররা নতুন করে জীবনের মাত্রা খুঁজে পায়। ভোগ বিলাস, বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কিশোর গ্যাং ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে উঠে।

নাম না প্রকাশের শর্তে কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্য জানায়, স্থানীয় এলাকার কিছু বখাটে ছেলেরা তার বন্ধুদের সব সময় অবহেলা ও নির্যাতন করতো। সুযোগ পেলেই তাদের নির্যাতন, অপমান, অপদস্ত করতো। এর এক পর্যয়ে বন্ধুরা সবাই একত্রিত হয়ে আশেপাশের এলাকার সমবয়সীদের একত্রিত করে দল তৈরি করি। আর স্থানীয় এলাকার বখাটেদের উচিত শিক্ষা দিয়েছি। এখন তারা উল্টো আমাদেরকে ভয় পায়। এছাড়া অন্য এলাকার যেসব সদস্যরা আমাদের দলের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাদের এলাকায় সমস্যা হলেও আমরা সবাই দলগতভাবে একত্রিত তাদের উচিত শিক্ষা দেই। প্রয়োজনে মারধর করি। তবে কিশোর গ্যাংয়ের ক্ষেত্রে সবাই একত্রিত থাকার ফলে যে কোন কাজ করা যায়। একারণে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এই লাইফটা ইনজয় (উপভোগ) করে। এর ফলে সমাজের অধিকাংশ কিশোররা এই গ্যাংয়ের প্রতি ঝুকে পড়ছে।

এদিকে কিশোর গ্যাংয়ের আরেকটি গ্রুপ জানায়, বড় লোক বন্ধুদের ছত্রছায়ায় থাকলে অনায়াসে বেপরোয়া ও বিলাসবহুল জীবন যাপন করা যায়। যেকারণে একদল কিশোররা বড়লোক বন্ধুদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গ্যাং গুলোতে যোগদান করেন। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া ছেলেরা একটু বড় হয়ে ধর্ণাঢ্যদের স্পর্শে এসে তারা ধীরে ধীরে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

সূত্র বলছে, পরিবারে সদস্যদের নজরদাবির অভাব, পরিবারিক কলহ, অভাব-অনটন সহ পারিবারিক নানা কারণে কিশোর শ্রেণির ছেলেরা নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের অধিনে জড়িয়ে পড়া অন্যতম। তাছাড়া লোভ-লালসা সহ প্রভৃতি কারণে কিশোর গ্যাংয়ের সৃষ্টি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিশোর বয়সে ছেলেরা সাধারণ একটু হই হৈল্লোড় ও আড্ডা দিতে পছন্দ করে। এসময় বন্ধুদের সঙ্গ যদি খারাপ হয় তবে বিগড়ে যাওয়া সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া কিশোর বয়সে অনেক ছোট ছোট বিষয়কে কেন্দ্র মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই বিপর্যস্ত অবস্থা ও অসৎ সঙ্গ থেকে গ্যাং গুলোতে কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে।

জানা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের এক একটি দলে ৩০ থেকে ১০০ জনের অধিক সদস্য রয়েছে। মূলত আধিপত্য বিস্তার সহদ্বরদয়ে জেরে এসব গ্যাং গড়ে ওঠে। নারায়ণগঞ্জের প্রত্যেকটি থানা ও উপজেলায় কয়েক ডজন কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের কারণে সমাজের বিভিন্ন অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে।

কিশোর গ্যাংদের নৃশংস হামলায় অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন আবার অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। গত ৩ অক্টোবর পূর্ব শত্রুতার জের ধরে দুই শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মোবাইল সেট ও গলার চেইন ছিনিয়ে নিয়েছে বন্দরে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা। ৪ আগস্ট বন্দরের অলিপুরা কবরস্থান এলাকায় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে জাহাঙ্গীর হোসেন মানিক নামের এক যুবককে পিটিয়ে ও গলাকেটে হত্যার চেষ্টা করে তিন কিশোর। ২৩ আগস্ট ফতুল্লার বাবুরাইলে সালেমান হোসেন অপু (৩০) নামের যুবককে বাড়ি হতে ডেকে এনে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে আসামী পারভেজ (২৮)।

২৭ জুলাই ফতুল্লার দেওভোগ হাশেম নগর এলাকায় মোটর সাইকেলের লাইটের আলো চোখে পড়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে শাকিলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৩১ জুলাই ফয়সাল (১৯) নামে কিশোর শহরের খানপুর বরফকল এলাকায় বান্ধবীর মোবাইল ফিরিয়ে দিতে গেলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে ৫ কিশোর। ২২ আগস্ট গোলাকান্দাইল এলাকায় সন্ত্রাসীরা জিসান হোসেনকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হলে পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়।

২৪ অক্টোবর র‌্যাব-১১ এর একটি আভিযানিক দল ফতুল্লা থানাধীন উত্তর ইসদাইর গাবতলী এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে নারীদের উত্ত্যক্তকারী গ্যাংস্টার গ্রুপের ৭ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে।

তারা হলো মো. আল আমিন (৩৪), মো. রফিক (৫২), মো. আবির (২৯), ইমরান (৫১), মো. আবির হোসেন (২৮), মো. রুবেল (২৮) ও মোঃ মামুন হোসেন শাওন (৩০)। তাদের দেহ তল্লাশি করে ১টি বিদেশী পিস্তল, ১টি ম্যাগজিন, ৩ রাউন্ড পিস্তলের গুলিসহ ২টি চাপাতি, ১টি চাইনিজ কুড়াল, ২টি চাকু ও ২টি গোলতি উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা নিজেদেরকে গ্যাংস্টার গ্রুপের সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে থাকে।

র‌্যাব-১১ এর এএসপি আলেপউদ্দিন জানান, তারা সবাই গ্যাংস্টার গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। তারা বিভিন্ন ভাবে ওই এলাকার বিভিন্ন বয়সী নারী ও মেয়েদের শ্লীলতাহানি করে আসছে। তাদের এই গ্রুপের নেতৃত্ব দেন গাবতলী নতুন বাজার এলাকার উজ্জল নামের এক সন্ত্রাসী। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানা যায় গ্যাংস্টার গ্রুপের সদস্যরা দীর্ঘদিন যাবৎ নারায়ণগঞ্জের গাবতলী এলাকায় সন্ত্রাসী ও ছিনতাই কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

২০ অক্টোবর ফতুল্লা থানার ইসদাইরের কিশোর গ্যাং লিডার হিসাবে পরিচিত ত্রাস ইভনকে ১ দিনের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছেন আদালত। স্থানীয় কিশোর ফারদিনকে নির্যাতন ও ছুরিকাঘাতে আহত করার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় ১৯ অক্টোবর বিকেলে ইভনকে গ্রেফতার করে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

২৬ অক্টোবর কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সভায় পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, কিছু উঠতি বয়সী পোলাপান স্কুলে না  গিয়ে রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে তারা ইভটিজিং করছে। এসব ছেলেপেলে কিছু সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে তারা মিশে যাচ্ছে এবং মাদক ব্যবসার কাজে ব্যবহার করছে। কিছু ওয়ার্ড কাউন্সিলদের নামও আমাদের কাছে আসে। আমরা জানিনা ওইসব ওয়ার্ড কাউন্সিলররা তারা মাদক ব্যবসা করে কি না। আমি পরিষ্কারভাবে বলবো আমরা কাউকে কিন্তু ছাড় দিচ্ছিনা। কোন ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে আমরা ছাড় দিচ্ছিনা। যদি মনে হয় ওইসব ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারা উঠতি বয়সী ছেলেদের ব্যবহার করছে আপনারা এসব তথ্য আমাদের সাথে সাথে জানান। প্রমাণ পেলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর আর মেম্বার কেন যে যেই পদেই থাকুক না কেন তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশন হবে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও