গাড়ির হর্ণ বাজানো নিয়ে এসপি হারুনের সঙ্গে রাসেলের দ্বন্দ্ব!

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০১ পিএম, ২০ নভেম্বর ২০১৯ বুধবার

গাড়ির হর্ণ বাজানো নিয়ে এসপি হারুনের সঙ্গে রাসেলের দ্বন্দ্ব!

নারায়ণগঞ্জর আলোচিত পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বদলীর পর তাঁর সঙ্গে পারটেক্স গ্রুপের শওকত আজিজ রাসেলের পূর্ব দ্বন্দ্বের পর গাড়ির হর্ণ বাজানো নিয়ে সবশেষ বিরোধ দেখা দেয়। ১৯ নভেম্বর মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জে দুটি মামলায় জামিননামা প্রদান করেন রাসেল। পরে তাঁর আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খোকন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে এ তথ্য প্রদান করেন।

প্রসঙ্গত গত ১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের গাড়িতে থাকা বডিগার্ড ও চালকের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের পর ধাওয়া করে একটি বিলাশবহুল জিপ গাড়ি আটক করা হয়েছিল। যে গাড়িতে ইয়াবা, গুলি, মদ ও বিয়ার ছিল বলে দাবী পুলিশের। আর ওই গাড়িটি পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক এম এ হাশেমের ছেলে শওকত আজিজ রাসেলের।

২ নভেম্বর বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রেস নোটে এসব তথ্য জানিয়েছিলেন। এ ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় পুলিশ মাদক ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন।

হাইকোর্ট থেকে জামিন নেয়ার পর ১৯ নভেম্বর মঙ্গলবার সকালে নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফয়সাল আতিক বিন কাদেরের আদালতে স্ব শরীরে উপস্থিত হয়ে এই জামিননামা দাখিল করেন।

ওই সময়ে তাঁর আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খোকন জানান, ‘আমরা যতটুকু জানি ঢাকা ক্লাবে যাবার পথে মগবাজার ফ্লাইওভারে গাড়ির হর্ণ বাজানো নিয়ে এসপির সঙ্গে রাসেলের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। পরে গাড়ি ধাওয়া করা হয়। এক পর্যায়ে মিথ্যে মামলা দেওয়া হয় শওকত আজিজ রাসেলের বিরুদ্ধে।’

প্রসঙ্গত পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাশেমের ছেলে ও আম্বার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আজিজ রাসেলের ব্যবহৃত গাড়িটি চালকসহ ঢাকা ক্লাব থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ৩১ অক্টোবর রাতে। পরদিন ১ নভেম্বর মধ্যরাতে গুলশানের বাসা থেকে রাসেলের স্ত্রী ফারাহ রাসেল (৪০) ও তার ছেলে আনাব আজিজকে (১৭) বাসা থেকে তুলে নেয় নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ। পৃথক জায়গা থেকে গাড়ি, এর চালক ও রাসেলের পরিবারের সদস্যদের পুলিশ নিয়ে গেলেও ২ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের তদন্তাদীন এসপি মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ সংবাদ সম্মেলন করে জানান, পুলিশ গাড়িটি আটকের পর এর ভেতর থেকে মাদক ও গুলি উদ্ধার করেছে। তখন গাড়িটিতেই ছিলেন রাসেলের স্ত্রী ও সন্তান। তবে দুইয়ে দুইয়ে চার এখানে মেলাতে পারেননি নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার। তার গল্পের মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় শওকত আজিজ রাসেলের বাসার সিসিটিভি ফুটেজ। তাতেই বিতর্কিত হয়ে পড়েন পুলিশের এই কর্মকর্তা। এরপর ৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করে এসপি হারুনকে ঢাকায় পুলিশ সদর দফতরের টিআর শাখায় বদলি করা হয়।

২ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে হারুন অর রশীদ জানিয়েছিলেন, আগের দিন শুক্রবার (১ নভেম্বর) দিনগত রাত ৩টায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় চৌরঙ্গি ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে একটি গাড়ি জব্দ করা হয়। এর আগে গাড়িটি তল্লাশি করে একটি প্যাকেটে থাকা ২৮ রাউন্ড গুলি, ১২শ’ পিস ইয়াবা, ২৪ বোতল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ, ৪৮ ক্যান বিয়ার ও নগদ ২২ হাজার ৩শ’ টাকা উদ্ধার করা হয়। তখন গাড়িতে শওকত আজিজ রাসেলের স্ত্রী ফারাহ রাসেল ও তার ছেলে আনাব আজিজ ছিলেন। রাতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। পরবর্তীতে স্ত্রী ও সন্তানকে ছেড়ে দেওয়া হলেও শওকত আজিজ রাসেল ও তার গাড়িচালক সুমনকে আসামি করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা হয়েছে। পলাতক শওকত আজিজ রাসেলকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান এসপি মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ।

এদিকে এসপি হারুনের ওই সংবাদ সম্মেলনের পরপরই শওকত আজিজ রাসেলের বাসার সিসিটিভি ফুটেজ চলে আসে গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে। সেখানে দেখা যায়, পহেলা নভেম্বর রাত সাড়ে ১২টার পর বাসায় প্রবেশ করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ ও ডিবির সদস্যরা। রাত ১টার দিকে রাসেলের স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয় তারা। অনুসন্ধান করে গণমাধ্যমকর্মীরা জানতে পারেন, তাদের নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা ডিবি কার্যালয়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে রাসেলের স্ত্রী ও সন্তানকে বাসা থেকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে গুলশান থানা পুলিশ অবহিত ছিল না। এ বিষয়ে কোনও অনুমতিও নেওয়া হয়নি। পরে বিষয়টি অবহিত হয়েই এসপি হারুনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় পুলিশ সদর দফতর।

স¤প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার আগেও গাজীপুরের পুলিশ সুপার থাকা অবস্থায় আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান শওকত আজিজ রাসেলের কাছে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। দাবিকৃত টাকা না দেওয়া হলে আম্বার গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেফতার, হেনস্তা, ব্যবসায়িক ক্ষতিসহ এসব প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন এসপি হারুন।

পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও হুমকির বিষয়ে ২০১৬ সালের ৫ মে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, দুদক চেয়ারম্যান, ডিজিএফআই মহাপরিচালক, এনএসআই মহাপরিচালক, র‌্যাবের মহাপরিচালক ও বিজিএমইএ সভাপতির কাছে অভিযোগ করা হয়।

গত ৫ মে হারুনের বিরুদ্ধে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন শওকত আজিজ রাসেল। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৩ মে এসপি হারুনের পক্ষ থেকে এসআই আজাহারুল ইসলাম আম্বার ডেনিমের স্টোর ম্যানেজার ইয়াহিয়া বাবুর মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বলেন, ‘এসপি হারুন সাহেব এইমাত্র আমাকে ফোন করেছেন। উনি বলেছেন, রাসেলের (চেয়ারম্যান, আম্বার গ্রুপ) লোকজনকে ডাকাও। আমার টাকা লাগবে। তাড়াতাড়ি ৫ কোটি টাকা পাঠাও।’

আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান শওকত আজিজ রাসেল অভিযোগে আরও বলেন, ‘এর আগেও এসপি হারুন আমাকে গুলশান ক্লাবের লামডা হলে ও গুলশানের কাবাব ফ্যাক্টরি রেস্তোরাঁয় ডেকে নিয়ে দুইবারই আমার কাছে ৫ কোটি টাকা দাবি করেন। ওই টাকা ডলারে আমেরিকায় এসপি হারুনের নির্ধারিত ঠিকানায় পাঠাতে বলেন। সে সময় টাকা না পাঠালে তিনি গাজীপুরে আমার ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান আম্বার ডেনিম ধ্বংস করে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেন। ওই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমার কোম্পানি আম্বার ডেনিম ফ্যাক্টরির ৪ জন শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গভীর রাতে গাজীপুর থানায় ধরে নিয়ে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে জেলে পাঠান এসপি হারুন।’

অজ্ঞাত কারণে সেই অভিযোগের তদন্ত শুরু হওয়ার পর থেমে আছে বলে জানান আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান শওকত আজিজ রাসেল। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের বিভিন্ন দফতরে দেওয়া অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছিল। তা পরবর্তী আবার তা বন্ধও হয়ে যায়। আমরা জেনেছি, পুলিশ বাহিনীতে উনার অনেক ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার জোরে তিনি অনেক কিছুই করতে পারেন।’


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও