শীতলক্ষ্যায় নৌযানে চাঁদাবাজির রেট দ্বিগুণ!

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৩৯ পিএম, ২১ নভেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

শীতলক্ষ্যায় নৌযানে চাঁদাবাজির রেট দ্বিগুণ!

নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানাধীন তারাব এলাকায় সুলতানা কামাল ব্রীজের নীচে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চাঁদাবাজ চক্র। ৪ মাস পূর্বে র‌্যাব-১১ এর অভিযানে ওই এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে চাঁদাবাজিকালে নগদ অর্থ ও ২টি ইঞ্জিনচালিত নৌকাসহ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ৬৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাহমুদুল হাসান পলিন ৮ সদস্যকে গ্রেফতারের পরে বেশ কিছু বন্ধ ছিল চাঁদাবাজি। আগে কাউন্সিলর পলিন বাহিনী শীতলক্ষ্যা নদীতে চলাচলরত প্রত্যেক নৌযান হতে শুল্ক আদায়ের নামে জোরপূর্বক ভয়ভীতি দেখিয়ে ৫শ টাকা থেকে ৩৫শ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করতো। তবে সম্প্রতি কাউন্সিলর পলিন বাহিনীর চাঁদাবাজির রেট দ্বিগুন হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নদীতে চলাচলরত নৌযান থেকে শুল্ক বা চাঁদা আদায় সম্পূর্ন বেআইনী হলেও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে কাউন্সিলর পলিন বাহিনী আবারো মেতে উঠেছে অপকর্মে। একেকটি নৌযান থেকে ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে কাউন্সিলর পলিন বাহিনী। অর্থাৎ আগের তুলনায় দ্বিগুন চাঁদা আদায় করছে পলিন বাহিনী।

বুধবার ২০ নভেম্বর সকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে নৌপথে চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই বন্ধ এবং নৌ শ্রমিকদের খোরাকী ফ্রিসহ ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সবুজ শিকদার মাষ্টার বলেন, তারাবো এলাকায় কমিশনার (কাউন্সিলর) পলিন বাহিনী রামরাজত্ব কায়েম করেছে। তারা ইজারার নামে ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছে। কয়েকদিন আগে র‌্যাব এই চাঁদাবাজদের গ্রেফতার করেছিল। আইন অনুযায়ী যেসকল বড় বড় কারখানার জাহাজগুলোর নিজস্ব বার্থিং পয়েন্ট রয়েছে তারা সরকারকে এককালীন বাৎসরিক চার্জ প্রদান করে থাকে। কিন্তু অনেক স্পটে ইজারার নামে ওই সকল প্রতিষ্ঠানের জাহাজ আটকে রেখে বিকাশের মাধ্যমে টাকা আদায় করছে। চাঁদাবাজরা আইন লঙ্ঘন করে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। ১২০টি স্পটে ইজারা দেয়া হচ্ছে কোন যুক্তিতে। একবার লোড বা আনলোডে যেখানে একবারই বার্থিং চার্জ দেয়ার নিয়ম সেখানে অসংখ্যবার বার্থিংচার্জ দিতে হচ্ছে। আমরা যেন কোন মগের মুল্লুকে বাস করছি।

উল্লেখ্য চলতি বছরের ৪ আগস্ট র‌্যাব-১১ রূপগঞ্জ থানাধীন তারাব এলাকায় সুলতানা কামাল ব্রীজের নীচে শীতলক্ষ্যা নদীতে অভিযান পরিচালনা করে নৌপথে চাঁদাবাজিকালে ৮জনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো মো. মেহেদী হাসান (২৫), মোঃ আলমগীর হোসেন (৩১), মোঃ আনোয়ার হোসেন (২৪), মো. মোমিন (৪০), মো. আকতার হোসেন (২০), মো. কাওসার হোসেন (২৯), মোঃ রানা মিয়া (২৩) ও মোঃ জহিরুল ইসলাম (১৯)। এসময় তাদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির নগদ ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, চাঁদাবাজিতে ব্যবহৃত ২টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা জব্দ করা হয়।

র‌্যাব-১১ এর অপারেশন অফিসার জসিম উদ্দীন চৌধুরী এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, গ্রেফতারকৃত আসামী ও নৌ-শ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায় দীর্ঘদিন ধরে উক্ত চাঁদাবাজ চক্র শীতলক্ষ্যা নদীতে চলাচলরত প্রত্যেক নৌযান হতে শুল্ক আদায়ের নামে জোরপূর্বক ভয়ভীতি দেখিয়ে ৫শ টাকা থেকে ৩৫শ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে আসছে।

অনুসন্ধানে র‌্যাব-১১ জানতে পারে, ডেমরা এলাকার কাউন্সিলর মাহমুদুল হাসান পলিন বিআইউব্লিউটিএ থেকে তারাবো ব্রীজ হতে কাঞ্চন ব্রীজ পর্যন্ত শীতলক্ষ্যা নদীর উভয় তীরে মালামাল লোড-আনলোডের শুল্ক আদায়ের ইজারা নিয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক নির্মিত ঘাট বা প্লাটুন ব্যবহার করে কোন মালামাল লোড-আনলোডের জন্য ইজারাদার নির্ধারিত হারে শুল্ক আদায় করার কথা এবং নদীতে চলাচলরত নৌযান থেকে শুল্ক বা চাঁদা আদায় সম্পূর্ন বেআইনী। কিন্তু একটি সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্র ইজারার নামে নদীতে চলাচলরত প্রত্যেক নৌযান থেকে দীর্ঘদিন ধরে জোর পূর্বক চাঁদা আদায় করে আসছে। শীতলক্ষ্যা নদীতে চলাচলরত অধিকাংশ নৌযানের গন্তব্য থাকে নরসিংদী, গাজীপুর ও কিশোরগঞ্জ জেলা। নৌযানগুলো ইজাদারের আওতাধীন এলাকা অর্থাৎ তারাবো ব্রীজ থেকে কাঞ্চন ব্রীজ এলাকার মাঝামাঝি কোথাও থামে না। তারপরও উক্ত চাঁদাবাজ চক্র তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ভয়ভীতি দেখিয়ে নদীতে চলাচলরত অবস্থায় চাঁদা আদায় করে। এমনকি চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে নৌযান শ্রমিকদের মারধর করে থাকে উক্ত চাঁদাবাজ চক্র। নৌপথে চাঁদাবাজি বন্ধে র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

উল্লেখ্য ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট বিকেলে তারাব এলাকার সুলতানা কামাল ব্রীজের নীচে শীতলক্ষ্যা নদীতে র‌্যাব-১১ এর একটি টিম অভিযান চালিয়ে নৌপথে চাঁদাবাজিকালে ৫জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১১। চাঁদাবাজদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অর্থ সহ একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা জব্দ করা হয়।

গ্রেফতারকৃতরা হলো হাটি পাড়া এলাকার মো. নূর আলম ভূইয়া (৪৯), টাটকি এলাকার মন মোহন বিশ্বাস (৩৫), পূর্ব হাটি পাড়া এলাকার ইলিয়াস ফকির (৪৩), মো. তারাব উত্তর পাড়ার সোহানুর রহমান ওরফে সুমন প্রধান (২৫) ও তারাব উত্তর পড়ার মো. ওমর ফারুক (৩৪)। তারা সকলে নারায়ণগঞ্জ জেলার রুপগঞ্জের বাসিন্দা।

এসময় র‌্যাব তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের ৯৮ হাজার ৬শ টাকা এবং ৮টি চাঁদা আদায়ের রশিদ বই উদ্ধার করে। এছাড়া জব্দ করা হয় চাঁদাবাজিতে ব্যবহৃত ইঞ্জিনচালিত নৌকা।

র‌্যাব-১১ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধুচক্র রূপগঞ্জের তারাব এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে চলাচলরত নৌযানগুলোকে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করে জোরপূর্বক থামিয়ে চাঁদা আদায় করে আসছে। র‌্যাব-১১ এর অনুসন্ধানে নৌপথে চাঁদাবাজি সংক্রান্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে চাঁদাবাজি বন্ধ ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনার জন্য এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত নুর আলম ভূইয়া নিজেকে বিআইডব্লিউটিএ’র ইজারাদার দাবী করে একটি শুল্ক আদায়ের অনুমতি পত্র ও ১টি চুক্তিপত্র প্রদর্শন করে। অনুমতি পত্রে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে “নদী পথে চলাচলরত নৌযান হতে কোন প্রকার শুল্ক আদায় করা যাবে না”। এছাড়াও চুক্তিপত্রে উল্লেখ রয়েছে, “বিআইডব্লিউটিআই’র ঘাট বা পল্টুন ব্যবহার করে ৫শত টন পর্যন্ত মালামাল লোড-আনলোড করলে সবোর্চ্চ ২শত টাকা র্চাজ নিতে পারবে”। কিন্তু এই অসাধু চক্র সব নীতিমালা লঙ্ঘন করে দীঘদিন ধরে নৌপথে চাঁদাবাজি করে আসছে। সিলেট থেকে পাথর কয়লা ও বালুবাহী বাল্কহেড গুলো শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে নরসিংদী, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ সহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে থাকে। এই নৌ-যান গুলো অত্র এলাকায় পৌছলে তারা নৌ-শ্রমিকদের ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করে আসছে।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও