১৩৯ হত্যার সেই বেদনাবিধুর দিন (ভিডিও)

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০০ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৯ বুধবার

১৩৯ হত্যার সেই বেদনাবিধুর দিন (ভিডিও)

মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে একাত্তরের ২৯ নভেম্বর দিনটি ছিল নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য বেদনাবিধুর দিন। ওই দিন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা থানার দুর্গম চরাঞ্চল বুড়িগঙ্গা নদী বেষ্টিত বক্তাবলীতে হত্যাযজ্ঞ চালায় পাক হানাদার বাহিনী। স্বাধীনতা যুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে একসাথে এত প্রাণের বিয়োগান্ত ঘটনা দ্বিতীয়টি আর নেই। স্বজন হারানো ব্যাথা ও কষ্ট নিয়েও শ্রদ্ধার সাথে প্রতিবছরই পালিত হয় এই দিবসটি। এটি নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য অত্যন্ত অর্থবহ একটি দিন।

এদিকে স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না দেওয়া হয়নি। ফলে সেখানকার বাসিন্দাদের রয়েছে ক্ষোভ। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৩৩ বছর পর ২০০৫ সালের ২৯নভেম্বর বক্তাবলীর কানাইনগর হাই স্কুল মাঠে শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করলেও তাতে নেই শহীদদের নাম ফলক। অযত্ম অবহেলায় স্মৃতিস্তম্ভটির বেহালদশা দেখে হতাশ স্থানীয় মুক্তিযোদ্বাসহ নতুন প্রজন্ম।

জানা গেছে, ২৯ নভেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধাদের উপুর্যপরি আক্রমনের মুখে পাক হানাদাররা পিছু হঠতে শুরু করে। এসময় তারা রাজাকার, আল বদর, শামস বাহিনীর পরামর্শে তারা ১৩৯ জন নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে ধরে এনে লাইন ধরিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। এতে নিহত হয় শাহিদ, ফারুক, অহিদ, মনির, শাহ আলম, রহমতউল্লাহ, শামসুল, আলম, সালামত, খন্দকার, সুফিয়া, আম্বিয়া, খোদেজা সহ ১৩৯ জন। পিছু হটার সময় হানাদার বাহিনী পেট্রোল ও গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেয় বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী পার সংলগ্ন বক্তাবলী পরগনার, রাজাপুর ডিগ্রীর চর, মুক্তাকান্দি, গঙ্গানগর, রাম নগর, গোপাল নগর, রাধানগর সহ ২২ টি গ্রাম। এদিকে স্বাধীনতার পরবর্তি ৪৮ বছর ধরে এখন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জবাসী বক্তাবলী দিবস পালন করে আসছে। একাত্তরের পর থেকে ১৩৯ জন নিহত হওয়া ও ওইদিন পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধের খবর জেনে আসছিল নারায়ণগঞ্জবাসী।

২৯ নভেম্বরের ঘটনার দিন প্রসঙ্গে তৎকালীন ডেপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা তমিজউদ্দিন রিজভী জানান, তারা মুজিব বাহিনীর অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষ করে বক্তাবলী ও এর আশপাশ গ্রামে অবস্থান নেয়। ওই সময়ে বক্তাবলী গ্রামে এক থেকে দেড়শ মুক্তিযোদ্ধা ছিল। নদী বেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় এলাকাটিকে নিরাপদ মনে করতো মুক্তিযোদ্ধারা। বক্তাবলীতে অবস্থান করেই মূলত মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশন করার পরিকল্পনা করতো। ওই এলাকাতে তখন কমান্ডার ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। এছাড়া জেলা আওয়ামীলীগের প্রয়াত যুগ্ম আহবায়ক মফিজুল ইসলাম, বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলার আজহার হোসেন, আবদুর রব, মাহফুজুর রহমান, স ম নুরুল ইসলাম সহ আরো অনেকে তখন বক্তাবলীতে অবস্থান করতো। ঘটনার দিন তথা ২৯ নভেম্বর ছিল প্রচন্ড শীত। সকাল থেকেই ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন ছিল পুরো এলাকা। নদী বেষ্টিত হওয়ায় কুয়াশা ছিল অনেক বেশী। ভোরের দিকে হঠাৎ করেই পাক বাহিনী গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ঁতে থাকে। অপ্রস্তুত মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা জবাব দেয়। উভয় পক্ষের মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুন্সিগঞ্জ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ব্যাটালিয়ন বক্তাবলীতে এসে এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিলে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। পরে তারা একত্রে পাক বাহিনীর সঙ্গে প্রায় চার ঘন্টা একটানা যুদ্ধ চালায়। এসময় মুক্তিযোদ্ধারা মোক্তারকান্দি কবরস্থানের সামনে কয়েকজন রাজাকারকে ধরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের উপুর্যপরি আক্রমনের মুখে পাক হানাদাররা পিছু হঠতে শুরু করে। এসময় তারা রাজাকার, আল বদর, শামস বাহিনীর পরামর্শে তারা ১৩৯ জন নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে ধরে এনে লাইন ধরিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। এতে নিহত হয় শাহিদ, ফারুক, অহিদ, মনির, শাহ আলম, রহমতউল্লাহ, শামসুল, আলম, সালামত, খন্দকার, সুফিয়া, আম্বিয়া, খোদেজা প্রমুখ। পিছু হটার সময় হানাদার বাহিনী একে একে বক্তাবলী পরগনার ২২ গ্রাম পেট্টোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

স্থানীয়দের কয়েকজন জানান, ঘটনার দিন কানাইনগর ছোবহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ফারুক সরকার ডিক্রিরচর থেকে আলীরটেকের দিকে যাওয়ার সময় পাকবাহিনীর হাতে আটক হয় তাকে ধরে নিয়ে যেতে দেখেন তারই আপন সহোদর শহীদউল্লাহ সরকার মসজিদে আশ্রয় নেওয়া শহীদ উল্লাহ সরকার ছোট ভাইকে ছাড়িয়ে আনতে যেয়ে তিনিও আটক হন। পরে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে লাশ ধলেশ্বরী নদীতে ফেলে দেয়।

সেদিন পাকবাহিনীর হাতে থেকে পালিয়ে বেঁচে যাওয়া মজিবর রহমান বলেন, গ্রাম থেকে যাদের ধরে এনেছেন তাদের অনককে মেরে কবরস্থানেই ফেলে রাখা হয়েছিল আমাদেরকে আমাদেরকে বেধে উপুড় করে ফেলে রাখে এর মধ্যে পাকি কমান্ডারের ওয়ারল্যাস বেজে উঠে যাদের বেধে রাখা হয়েছে তাদেরকে খতম করার নির্দেশ এ কথা শুনে যখন আমাদের দুজনকে নদীর পাড়ের দিকে নিয়ে যায় এই সময় আমি উল্টো দিকে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচি।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও